«

»

Jul ১১

কুরআন কি ইসহাককে(আ) কুরবাণী করার কথা বলে?

ইব্রাহিম (আ) এর পুত্র বিসর্জন দেয়ার ঘটনা আব্রাহামিস্টদের কাছে খুবই জনপ্রিয়।ইব্রাহিম (আ) শেষ বয়সে তাঁর প্রথম পুত্র লাভ করেন।কিন্তু সেই পুত্র জন্ম নেয়ার কিছু সময় পরে আল্লাহ তাঁকে কুরবাণী দেয়ার আদেশ দেন।পরে ইব্রাহিম (আ) তাঁর পুত্রকে বিসর্জন দিতে হয় না।মূলত এটা ছিল আল্লাহর একটা পরীক্ষা যেখানে পুত্র বিসর্জন দেয়া হয় নি।সেখানে কুরবাণীর সময় ইব্রাহিম (আ) এর পুত্রের স্থানে একটি (হালাল) পশু কুরবাণী হয়ে যায় আল্লাহর ইচ্ছায়।এ পর্যন্ত সকল আব্রাহামিস্ট একমত।কিন্তু যে স্থানে আব্রাহামিস্টদের মধ্যে বিতর্ক দেখা দেয় তা হলো এই পুত্রের পরিচয় সম্পর্কে।সাধারণত খ্রিষ্টানরা এমন দাবী করে থাকে যে ইব্রাহিম (আ) ইসহাক (আ) কে কুরবাণী করার কথা ছিল।তার সাথে তাল মিলিয়ে ইসলাম বিদ্বেষীরা যারা কিনা আব্রাহামিস্টই না তাদেরও এ বিষয় আস্ফালন লক্ষ্য করা যায়।যাই হোক,ইব্রাহিম(আ) যে ইসমাঈল(আ) কেই কুরবাণী করার কথা ছিল এ বিষয়টা প্রমাণ করার জন্যই আমার এ লেখা।আশা করি এ লেখার মাধ্যমে অনেকের সংশয় দূর হবে এবং একটি বড় বিভ্রান্তি থেকে মুক্তি পাবে।

আমি শুধু কুরআনের মাধ্যমে প্রমাণ করব যে ইসমাইল(আ) কেই কুরবাণী দেয়ার কথা ছিল যেহেতু মূল দাবী হচ্ছে যে কুরআনে কোথাও ইসমাঈল(আ) এর কুরবাণীর কথা বলা নেই বরং বলা আছে নাকি ইসহাক(আ) এর কথা।

চলুন দেখি আল্লাহ কি বলেন:

কুরআন,সূরা আস সাফাত,৩৭:১০০-১০২

১০০.হে আমার পরওয়ারদেগার! আমাকে এক সৎপুত্র দান কর।
১০১.সুতরাং আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করলাম।
১০২.অতঃপর সে যখন পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হল, তখন ইব্রাহীম তাকে বললঃ বৎস! আমি স্বপ্নে দেখিযে, তোমাকে যবেহ করছি; এখন তোমার অভিমত কি দেখ। সে বললঃ পিতাঃ! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহ চাহে তো আপনি আমাকে সবরকারী পাবেন।

এখানে কি আসলেই ইসহাক (আ) এর কথা বলা হচ্ছে? আয়াতের সংখ্যা খেয়াল করুন ১০০-১০৩।এবার নিচের আয়াত দেখুন

কুরআন,সূরা আস সাফাত,৩৭:১১১-১১৩

১১১.সে ছিল আমার বিশ্বাসী বান্দাদের একজন।
১১২.আমি তাকে সুসংবাদ দিয়েছি ইসহাকের, সে সৎকর্মীদের মধ্য থেকে একজন নবী।
১১৩.তাকে এবং ইসহাককে আমি বরকত দান করেছি। তাদের বংশধরদের মধ্যে কতক সৎকর্মী এবং কতক নিজেদের উপর স্পষ্ট জুলুমকারী।

এখানে সূরা আস সাফাতের ১০০-১১২ আয়াতের মধ্যে কোথাও ইসমাঈল(আ) এর নাম নেই।বরং আছে ইসহাক(আ) এর নাম।এই সূত্র ধরেই কিছু মানুষ বলে থাকে যে ইসহাক(আ) কেই কুরবাণী করার কথা ছিল।

জবাবঃ

ইসমাঈল(আ) এর নাম নেই এবং ইসহাক(আ) এর নাম আছে এজন্য ইসহাক(আ) কেই কুরবাণী করার কথা ছিল এ কথাটা সম্পূর্ণ অবান্তর।সূরা আস সাফাতের ১০০-১১২ এই ১৩ টি আয়াত আল্লাহ রূপক অর্থ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।কুরআনে এমন বহু আয়াত আছে যা কিনা রূপক অর্থ বহন করে।কিন্তু অনেক মানুষই তা বোঝে না।যারা এমনিতেই কুরআনের সঠিক,বৈজ্ঞানিক,নৈতিক এবং যৌক্তিক আয়াতগুলোকেই বেঠিক,অবৈজ্ঞানিক,অনৈতিক এবং অযৌক্তিক প্রমাণ করার অপচেষ্টা করে তারা কীভাবে কুরআনের রূপক অর্থ বুঝবে? তারা ত বুঝেও না বোঝার ভান করবে।

প্রথমত,সূরা আস সাফাত,৩৭:১০০-১০২ আয়াতে যেখানে ইব্রাহিম (আ) এর পুত্র বিসর্জন/কুরবাণী দেয়ার কথা বলা আছে সেখানে কিন্তু ইসহাক(আ) এর কথা বলা হয় নি।সূরা আস সাফাতের ১০০-১১২ আয়াত পর্যন্ত শুধু কুরবাণী করার ঘটনাই না বরং তার সময়ও ক্রমানুসারে আছে আয়াতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে।অর্থাৎ এখানে প্রত্যেকটি আয়াত ঘটনাটির এক একটি ফ্রেম।

উদাহরণস্বরূপ

১০০. ইব্রাহিম(আ) আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন
১০১. আল্লাহ ইব্রাহিম (আ) কে পুত্রের সু-সংবাদ দিলেন
১০২. ইব্রাহিম(আ) স্বপ্ন দেখলেন……

তাহলে বোঝা যায় যে ১০০ নং আয়াত প্রথমে ঘটেছে তারপর ১০১,তারপর ১০২,এরকম চলবে।ইসহাক(আ) এর নাম এসেছে ১১২ নং আয়াতে।অথচ ইসহাক(আ) এর পূর্বেই ইব্রাহিম (আ) তাঁর অন্য পুত্রের কাছে তাঁর স্বপ্নের কথা বলছে ১০২ নং আয়াতে।যদি সত্যিই ইসহাক(আ) কেই কুরবাণী করার কথা ছিল তবে ত ১১২ নং আয়াতে ইসমাঈল(আ) এর নাম আসত।তাছাড়া ইসহাক(আ) কেই যদি কুরবাণী করা হত তবে ত ১০২ নং আয়াতে ইসহাক(আ) এর নাম আসত ১১২ নং এ না এসে।আবারও যেহেতু ঘটনা অনুসারে ৩৭:১০০-১১২ ইসহাক(আ) কুরবাণীর ঘটনার পরে জন্ম নিয়েছেন।

প্রশ্ন আসতে পারে “আল্লাহ কেন সরাসরি ইসমাঈল(আ) এর নাম উল্লেখ করলেন না? যদি রূপক অর্থ বহন করে তবে কি সেটা প্রমাণ করা যায় যে ইসমাঈল(আ) কেই কুরবাণী করার কথা ছিল এবং ইসহাক(আ) না?”

জবাবঃ

কুরআন হচ্ছে সবচেয়ে সুন্দর Literature।পৃথিবীর এমন কোন লেখক নেই(আল্লাহ ব্যতীত) যে কি না এমন একটি গ্রন্থ,এমনকি একটি সূরা,একটি আয়াত পর্যন্ত রচনা করতে সক্ষম।এই সর্বশ্রেষ্ট গ্রন্থের মধ্যে সুন্দর Literature লক্ষ্য করা যায় এর মধ্যে বহু রূপক আয়াত দেখে।আল্লাহ কুরআনে বহু আয়াত ব্যবহার করেছে যা কি না রূপক।এর মাধ্যমে কুরআনের সুন্দর Literature লক্ষ্য করা যায়।মূলত ইসমাঈল(আ) কে এখানে সরাসরি না উল্লেখ করে রূপক অর্থে ব্যবহার করাও সর্বশক্তিমান আল্লাহর কুরআনে ব্যবহৃত উক্ত রূপক আয়াতগুলির একটি

এবার দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাবে আসিঃ

ইব্রাহিম(আ) এর দুইজন পুত্র ছিল।ইসমাঈল(আ) ও ইসহাক(আ)

এবার আসুন সূরা আস সাফাত ৩৭:১০০-১১২ এর আয়াতগুলো খেয়াল করি-

১০০.”হে আমার পরওয়ারদেগার! আমাকে এক সৎপুত্র দান কর।”

১০০ নং আয়াতে ইব্রাহিম(আ) একজন সৎপুত্রের জন্য প্রার্থনা করলেন।

১০১.”সুতরাং আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করলাম।”

১০১ নং আয়াতে আল্লাহ ইব্রাহিম(আ) কে একজন সহনশীল পুত্র দান করলেন। ইব্রাহিম(আ) একজন সৎপুত্রের কামনা করলেন অতঃপর আল্লাহ তাঁকে দান করলেন একজন সহনশীল পুত্র।

এবার দেখুন

“১০২.অতঃপর সে যখন পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হল, তখন ইব্রাহীম তাকে বললঃ বৎস! আমি স্বপ্নে দেখিযে, তোমাকে যবেহ করছি; এখন তোমার অভিমত কি দেখ। সে বললঃ পিতাঃ! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহ চাহে তো আপনি আমাকে সবরকারী পাবেন।
১০৩.যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইব্রাহীম তাকে যবেহ করার জন্যে শায়িত করল।
১০৪.তখন আমি তাকে ডেকে বললামঃ হে ইব্রাহীম
১০৫.তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে! আমি এভাবেই সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি।”

আল্লাহ ইব্রাহিম(আ) কে একজন সহনশীল পুত্র দান করলেন।সহনশীল পুত্রও সহনশীলতা দেখাল(১০২ আয়াত)।সহনশীল পুত্রকে কুরবাণীর পরীক্ষা দেয়া হল।এখন কে এই সহনশীল পুত্র?

এবার পরের আয়াত দেখা যাক

১১২.”আমি তাকে সুসংবাদ দিয়েছি ইসহাকের, সে সৎকর্মীদের মধ্য থেকে একজন নবী। “

সুতরাং ইসহাক(আ) হলেন সৎকর্মী নবীদের মধ্যে একজন।ইসহাক(আ) হলেন ইব্রাহিম (আ) এর সৎকর্মী পুত্র

বিষয়টা আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য নিচে পয়েণ্ট আকারে তুলে ধরলাম

•ইব্রাহিম (আ) এর দুইজন পুত্র-ইসহাক(আ) ও ইসমাঈল(আ)

•ইব্রাহিম(আ) প্রার্থনা করেছিলেন একজন সৎকর্মী পুত্রের জন্য

• আল্লাহ একজন সহনশীল
পুত্র দান করল

•সহনশীল পুত্র সহনশীলতা দেখাল

•সহনশীল পুত্রকে কুরবাণী করার সিদ্ধান্ত হল

•আল্লাহ ইব্রাহিম(আ) কে একজন সৎকর্মী পুত্র দান করল

এবার-

ইসহাক (আ) = সৎকর্মী পুত্র

সৎকর্মী পুত্র = কুরবাণী করার কথা ছিল না

কুরবাণী করার কথা ছিল = সহনশীল পুত্র

দুই পুত্র = সৎকর্মী এবং সহনশীল পুত্র = ইসমাঈল(আ) এবং ইসহাক (আ)

ইসহাক(আ) = সৎকর্মী পুত্র

সুতরাং, সহনশীল পুত্র = ইসমাঈল(আ)

সোজা হিসাব,

সৎকর্মী পুত্র = ইসহাক(আ) = কুরবাণী করার কথা না

সহনশীল পুত্র = ইসমাঈল(আ) =কুরবাণী করার কথা

তাছাড়া ইসমাঈল(আ) ই যে সহনশীল পুত্র এ কথা পরিষ্কাভাবে বলা আছে কুরআনে-

“এবং ইসমাঈল, ই’দ্রীস ও যুলকিফলের কথা স্মরণ করুন, তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন সবরকারী।”(সূরা আম্বিয়া,২১:৮৫)

বিঃদ্রঃ ইসমাঈল(আ) সহনশীল পুত্র বলে ইসহাক(আ) সহনশীল না এবং ইসহাক(আ) সৎকর্মী পুত্র বলে ইসমাঈল(আ) সৎকর্মী না-বিষয়টা কিন্তু এরকম না।ইসমাঈল(আ) সহনশীলতার জন্য পরিচিত বলেই তাঁকে সহনশীল পুত্র বলা হয়েছে। মনে রাখা ভাল যে দুজনেই(ইসমাঈল ও ইসহাক) (আ) ছিল সৎকর্মী ও সহনশীল(চারিত্রিক গুনাবলীর দিক দিয়ে)

১ comment

  1. 1
    Monowar Bin Zahid

    যদিও নজরুল ভাই এই ব্যাপারে অসাধারন একটি ব্লগ লিখেছিলেন তবে আপনি যেহেতু আল-ক্বুরআন থেকে কিছু কথা তুলে ধরেছেন তাই এটার পূর্বেরটার সম্পূরক হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.