«

»

Jun ২৯

আর্জেণ্টিনা-ব্রাজিল ফুটবল দ্বন্দ্ব

এই প্রবন্ধের বিভাগসমূহ

১। এক নজরে
২। পেলে নাকি ম্যারাডোনা?
৩। আর্জেণ্টিনার সমালোচনা এবং পর্যালোচনা
৪। ব্রাজিলের এবং সমর্থকদের আস্ফালন
৫। শেষ কথা

 

১। এক নজরে

 আর্জেণ্টিনা আর ব্রাজিল।দক্ষিণ আমেরিকার দুইটি দেশ।দুইটি আলাদা দ্বীপের মত দেশ দুইটি আলাদা হয়ে আছে।আর দুইটি দেশেরই একটি জনপ্রিয় খেলা ফুটবল।যা কিনা নিছক খেলা আর নেই।অন্তত এই দুইটি দেশ কিংবা এর সমর্থকদের মধ্যে ত একদমই না।এমনকি দুইটি দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ খেলাগুলোও একটি বড় মাপের খেলা হিসেবে দেখা হয়।FIFA একে "ফুটবল দ্বন্দ্বের আরক/Essence of Football Rivalry" হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।ESPN FC একে জাতীয় খেলার মধ্যে সর্বোচ্চ দ্বন্দ্বের স্থানে রেখেছে।আরেজণ্টিনা এবং ব্রাজিল উভয়ই সর্বশ্রেষ্ঠ দশটি দলের মধ্যে নিজেদের নাম করে রেখেছে।

আর্জেণ্টিনা আর ব্রাজিলের ফুটবল জীবন শুরুই হয়েছে আর্জেণ্টিনার জয়ে।একটি বন্ধুত্বপূর্ণ খেলা ছিল বুয়েরনোস এইরসে।সেপ্টেমবার,১৯১৪।আর্জেণ্টিনা ৩-০ গোলে বিজয় লাভ করে।কোনো গোল না করেই ব্রাজিলকে মাঠ ছাড়তে হয়।সর্বশ্রেষ্ঠ জয়েও আর্জেণ্টিনার নাম।ঠিক একই জায়গায় বুয়েরনোস এইরসে রোকা কাপে ব্রাজিলকে ৬-১ গোলে বিজয় লাভ করে আর্জেণ্টিনা।খেলাটি হয়েছিল ৫ মার্চ,১৯৪০ সালে।কিন্তু হ্যাঁ এটা ঠিক যে দুইটি দলের মধ্যে আর্জেণ্টিনার চেয়ে ব্রাজিলের জয় বেশি।কিন্তু মাত্র দুইটি জয় এগিয়ে ব্রাজিল।১০২ টি খেলার মধ্যে।

wp_ss_20160628_0001Image-Summary Statistics

সর্বমোট খেলাগুলোর মধ্যে আর্জেণ্টিনা ৩৭ বার জিতে আর ব্রাজিল ৩৯ বার।ড্র হয় ২৬ টা।কিন্তু আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে দুই দলই ১৫৯ টি গোল করেছে।

wp_ss_20160628_0002Image-Overall statistics

আবার প্রধান চ্যাম্পিয়নশিপ খেতাবে আর্জেণ্টিনা ব্রাজিলের চেয়ে এগিয়ে

wp_ss_20160628_0003Image-Main Championship Title Statistics

যদিও ছোটখাটো যোগ্যতা খেলাগুলোতে ব্রাজিল বেশ ভালোভাবেই আর্জেণ্টিনার চেয়ে এগিয়ে আছে।

wp_ss_20160628_0004Image-Minor and Tournament Qualification statistics

 

 

২। পেলে নাকি ম্যারাডোনা?

অনেকের মতে এই বিষয়ে বিতর্কে লিপ্ত হওয়াটাই অযৌক্তিক যেখানে পেলে আর ম্যারাডোনা দুই খেলোয়াড় আলাদা সময়ে খেলেছে।কিন্তু তবুও অনেক সমর্থক পেলে আর ম্যারাডোনাকে নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়।পেলে নেইমারকে এবং ম্যারাডোনা মেসিকে নিজের উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করেছে।

আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি পেলেকে "শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড়/Athlete of the century" হিসেবে ঘোষণা করেছে।১৯৯৯ সালে Time ম্যাগাজিন পেলেকে ২০ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১০ জনের মধ্যে একজন হিসেবে ঘোষণা করেছে।তাছাড়া পেলের সর্বমোট ১,২৮১ টা গোল FIFA এর মতে একজন নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ গোল।এ ছাড়াও আরও অনেক পুরস্কার আর সম্মাননা পান পেলে।

কিন্তু পেলের সব সম্মাননা এবং পুরস্কার পিছনে ফেলে ম্যারাডোনা মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয়।২০০০ সালে FIFA এর আয়োজিত ইণ্টারনেট ভোটে ম্যারাডোনাকে শতাব্দীর খেলোয়াড় হিসেবে ভূষিত করে সাধারণ মানুষ যেখানে ৫৩.৬% ভোটে জয়ী হয় ম্যারাডোনা ১৮.৫৩% পেলের বিরুদ্ধে।কিন্তু FIFA এই ভোট পরে বাতিল করে দেয় এবং দ্বিতীয় আরেকটি ভোট শুরু করে "Football Family" নামে যেখানে ফুটবলের কিছু সাংবাদিকদের নিয়ে গঠিত হয় এবং সেখানে তারা নিজেরাই পেলেকে শতাব্দীর খেলোয়াড় হিসেবে ঘোষণা করে।২০০২ সালে আরেকটি ইণ্টারনেট ভোট আয়োজন করা হয় যেখানে ম্যারাডোনা আরও একটি পুরস্কার পায় FIFA থেকে যেহেতু তার একটি গোল "শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ গোল" হিসেবে স্বীকৃতি পায়।পেলের স্থান হয় তৃতীয়তে।

পেলে আর ম্যারাডোনার খেলার একটি তুলনামূলক চিত্র

wp_ss_20160628_0005Image-Pele and Maradona Achievements

 



৩। আর্জেণ্টিনার সমালোচনা এবং পর্যালোচনা

আর্জেণ্টিনা ২ বার বিশ্বকাপ জিতেছে।মূলত ব্রাজিলের সমর্থকরা একটি অদ্ভূত যুক্তি দেয় যেহেতু আর্জেণ্টিনা ২ বার বিশ্বকাপ জিতেছে তাই আর্জেণ্টিনা ভালো দল না।কিন্তু বিশ্বকাপই কি দলের গুণ বিচার করার একটি মাত্র উপায়? মোটেই না।Team Performance,Individual Performance,Average Grade point আরও অনেকে Factor আছে একটি দলের ভালো মন্দ যাচাই করার।শুধু বিশ্বকাপ দিয়েই যদি যাচাই করা যেত তবে বিশ্বকাপ ছাড়া আর কোনো খেলাই থাকত না ফুটবলে।আমরা আবারও ১ম বিভাগের পরিসংখ্যানগুলো লক্ষ্য করি।

যাদের ফুটবল সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই তারাও জানে যে ম্যারাডোনা হাত দিয়ে গোল করেছে যা মূলত Hand of the God হিসেবে পরিচিত।১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মূলত হাত এবং মাথার ব্যবহার করে গোল দেয় যার কারণে আর্জেণ্টিনা বিশ্বকাপ জিতে নেয়।ম্যারাডোনা এই গোলের প্রতিউত্তরে বলে

,"গোলটি করেছি কিছুটা আমার মাথা দিয়ে আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত দিয়

এটা ঠিক যে গোলটা আসলেই হাত দিয়ে করা হয়েছিল।কিন্তু এখানে মূল দোষই হচ্ছে রেফারির।রেফারির মতানুযায়ী সে কিছুই দেখেনি।অনেকে এই নিয়েও আবার সমালোচনা করবেন।কিন্তু ব্রাজিলের একটি খেলাতেও রেফারির অজ্ঞতার দরুণ ব্রাজিলের গোল মেনে নেয়া হয় এবং অবশেষে ব্রাজিল জয়ী হয়।এর পরের বিভাগে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে।

ম্যারাডোনা মাদকাসক্ত।খেলার ভিতরে আর্জেণ্টিনার যখন আর সমালোচনা হয় না তখন খেলার বাহিরের বিষয়গুলো নিয়ে আসে ব্রাজিলের উগ্রপন্থী সমর্থকরা।প্রথমত মাদক সত্যিই একটি ঘৃণ্য বস্তু।এবং এটির সেবন কখনোই সমর্থনযোগ্য না যদি না তা রোগ বালাই বা জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।কিন্তু বিষয় হচ্ছে খেলা নিয়ে।খেলায় কে বেশি সেরা এ নিয়ে হচ্ছে মূল বিতর্ক।এখানে নৈতকতার বিষয় কেন আসবে? এবং ড্রাগই যদি খেলা যাচাইয়ের একটি অংশ হয়ে থাকে তাহলে বলা বাহুল্য যে কোনো খেলাই প্রকৃত অর্থে খেলা না।কারণ অধিকাংশ খেলোয়াড়রাই কম বেশি ড্রাগ সেবন করে।টিভিতে বা স্টেডিয়ামে খেলা দেখা যতটা না সহজ,খেলা ততটা সহজ নয়।এত বড় মাঠে খেলা হাতের মোয়া নয়।অনেক শক্তির প্রয়োজন হয়।এই শক্তি পাওয়ার জন্য অনেক খেলোয়ার কম-বেশি ড্রাগ সেবন করে।

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Doping_in_sport

 

৪। ব্রাজিলের  এবং সমর্থকদের আস্ফালন

আমাদের এই বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার সাথে পূর্ব বাংলার আকাশ-পাতাল তফাত।ব্রিটিশদের আগমনের আগে আমাদের এই বাংলাদেশ ছিল ইউরোপের দেশগুলোর চেয়েও ধনী।বিশখ্যাত মসলিন কাপড় ছিল বাংলার শাসকদের বিলাসের বস্তু।রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক এবং উন্নতির দিক দিয়ে আমাদের এই বাংলা ছিল সকল দেশের সেরার তালিকায়।কিন্তু এখন আমাদের দেশের কি অবস্থা এটা লেখারও দরকার নেই।ব্রাজিলেরও হয়েছে একই অবস্থা।সেই পাঁচবার বিশ্বকাপ যে জিতল সেই পাঁচবারই জিতল।এই ত ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে জার্মানির সাথে ৭ গোল খেয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে।অথচ সেই একই বিশ্বকাপে আর্জেণ্টিনা শেষ পর্যন্ত গিয়ে জার্মানির সাথে ১-০ গোলের ব্যবধানে হেরেছে।এবার ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকাতেও পেরুর সাথে হেরে ব্রাজিল বিদায় নিয়েছে অথচ আর্জেণ্টিনা শেষ পর্যন্ত গিয়েছে।তবুও ব্রাজিলের উগ্রপন্থী সমর্থকরা আর্জেণ্টিনার সমালোচনা করেই যাচ্ছে।এই হল বর্তমান দুই দলের অবস্থা এবং ব্রাজিলের উগ্রপন্থী সমর্থকদের অবস্থা।অস্ট্রেলিয়াও ত পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতেছে।তাহলে চলুন অস্ট্রেলিয়াকেই সমর্থন করি।কারণ যুক্তি ত একই।

"হাত দিয়ে গোল মেরে ম্যারাডোনা(আর্জেণ্টিনা) বিশ্বকাপ জিতেছে……"

।এটি একটি সাধারণ উক্তিতে পরিণত হয়েছে যে ম্যারাডোনা হাত দিয়ে গোল(Hand of the God) করে বিশ্বকাপ জিতেছে।এটা সত্যি যে ম্যারাডোনা হাত ব্যবহার করেছে কিন্তু খেলায় নিয়মভঙ্গ কম-বেশি সব খেলোয়াড়রাই করে।এজন্যই খেলাতে Foul,Penalty,Throw in,Red/Yellow card ইত্যাদি আছে।এখানেও কোনো ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটে নি।রেফারির অজ্ঞতার কারণেই এটা ঘটেছে।এতে ম্যারাডোনার উপর ক্ষোভ না করে সেই রেফারির উপর ক্ষোভ করা উচিৎ।তাছাড়া ব্রাজিলও এমন একটি ঘটনা ঘটিয়েছে।যেই ঘটনাটা অনেকেই জানে না।১৭ জুলাই,১৯৯৫ সাল।কোপা আমেরিকার শেষ খেলা।উরুগুয়ে তে খেলাটা হয়েছিল আর্জেণ্টিনার সাথে।ব্রাজিলিয়ান তুলিও ৫ মিনিটের ইকুয়ালাইজার দেরীতে গোল করে নিজের বাম হাত দিয়ে বলকে নিয়ন্ত্রণ করে।এর কারণেই তিনি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেন।এই নিশ্চিত Foul হওয়া সত্ত্বেও রেফারি সেই ফাউল দেখেনি বলে মন্তব্য করে এবং যার কারণে গোলটা হয় এবং ২-২ ব্যবধানের পর Penalty এর মাধ্যমে ব্রাজিল জয় লাভ করে।আর্জেণ্টিনার গণমাধ্যম এই গোলটিকে "Hand of the devil/শয়তানের হাত" হিসেবে কুখ্যায়িত করে।

 

৫। শেষ কথা

খেলা হচ্ছে বিনোদনের মাধ্যম।খেলা ততক্ষণই খেলা থাকে যতক্ষণ তা মাঠের এবং সাধারণ আলোচনার মধ্যে থাকে।কিন্তু বর্তমানে কিছু গণমাধ্যম নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য খেলাকে একটি গম্ভীর পর্যায় নিয়ে যাচ্ছে এবং অনেক মানুষ এটা নিয়ে মাত্রাতিক বাড়াবাড়ি করছে যা মোটেই কাম্য নয়।সেই খেলা ক্রিকেট,ফুটবল আর যেই খেলাই হোক।খেলার মধ্যে উগ্রপন্থা আনলে সেটা আর বিনোদন বা মজা থাকে না।সুতরাং এ ধরণের উগ্রপন্থা পরিহার করুন।

C__Data_Users_DefApps_AppData_INTERNETEXPLORER_Temp_Saved Images_1280px-TorcIMAGE-Extremism in Sports

তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া,২৯ জুন ২০১৬
https://en.wikipedia.org/wiki/Argentina%E2%80%93Brazil_football_rivalry

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.