«

»

Dec ০৫

মাদকাসক্ত ভূত

২০১৫ সাল।জেএসএসি হতে আর ২/৩ মাস বাকি খুব সম্ভবত।অতটা মনে পড়ছে না।বার্ষিক পরীক্ষা শেষ।এখন দুইটা মডেল টেস্ট তারপর সোজা জেএসসি।ড্রয়িং কোচিং করতাম তখন।কারণ ড্রয়িং ৮ম শ্রেণীতে বাধ্যতামূলক।ক্লাসের এক সহপাঠীর মাধ্যমে কোচিংটার সন্ধান পাই।প্রান্ত স্যার।খুবই সাদামাটা একজন মানুষ।ম্যাডামও বেশ সাদামাটা।তাদের ব্যবহার আমাকে এখনও মুগ্ধ করে।শুধু একটাই কষ্ট আমার।তাদেরকে পরোক্ষভাবে অনেক কষ্ট দিয়েছি।এই অনুতপ্তবোধ হয়তবা আমার সারাজীবনেও শেষ হবে না।ড্রয়িং কোচিং যতসম্ভব না মিস দেয়ার চেষ্টা করতাম।খুব ভালো লাগত আমার।মূলত ৭ম শ্রেণী থেকেই কোচিংটায় আমার যাত্রা শুরু।সীমান্ত,সিয়াম,আমি আর ভাষা।আমরা চার বন্ধু।যদিও সীমান্ত আমাদের তেমন কাছের বন্ধু ছিল না।কিন্তু আমরা বাকি তিনজনকে একসাথে ভাই বললেও হয়ত কম হয়।আরও নির্দিষ্টভাবে "হত" শব্দটাই এখানে যথার্থ।কারণ যান্ত্রিক শহুরে পরিবেশে সত্যিই আমরা "ইটের উপর ইট,মধ্যে মানুষ কীট"।এই ত জেএসসির পর যে তিনজন আলাদা হয়ে গেলাম আর কোনো খবর নেই বললেই চলে।কষ্ট লাগে।অনেক কষ্ট লাগে।এই কষ্ট কান্না বা আর্তনাদের মাধ্যমে প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব না।গুরুজনদের দেখি ছোটবেলার বন্ধুত্ব এখনও টীকে আছে কিন্তু আমাদের?

ভাষা ৮ম শ্রেণীতে এসেছিল।আমি ৭ম শ্রেণীতে।সিয়াম আর সীমান্ত ৬ষ্ঠ।আমাদের আরেক সহপাঠী বন্ধু ফারদিন কিছুদিনের জন্য এসে আর আসে নি।কোচিংটা মিরপুর ১০ এ।আগে বাসায় কোচিং করা হত কিন্তু এখন আলাদা কোচিং সেণ্টার খুলেছে স্যার আর ম্যাডাম মিলে।একদিন ফারদিন আমাদের জানালো "চাঁদমহল" নামের একটি বাড়ি আছে কোচিং থেকে একটু দূরে।রিকসা ভাড়া বোধহয় ১০ টাকাও হবে না।৫ মিনিট লাগবে সর্বোচ্চ।বাড়িটি অনেক বছর ধরে পরিত্যাক্ত।কবে থেকে তা নির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না।দেখে ত মনে হয় ১০/২০ বছর ধরে খালি পড়ে আছে।তিনতলা ভবন।আধুনিকও বলা যাচ্ছে না আবার আগের যুগের বাড়িও বলা যাচ্ছে না।বেশ অদ্ভূত কাঠামো।অদ্ভূত বললাম কারণ মিলাতে পারছি না।একটি বাড়ির কাঠামো দেখে বোঝা যায় এটা স্কুল,ফ্ল্যাট,অফিস,প্রাসাদ ইত্যাদি।কিন্তু এ বাড়িটি দেখে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।যদিও একটি বাংলো ধরে নিয়েছিলাম।ভিতরে বিদ্যুতের সংযোগ একেবারেই নেই।প্রত্যেক তলাতেই বারান্দা আছে যা বাইরে থেকে দেখা যায়।প্রবেশের পথটা বেশ সরু।বাড়িটা সম্পর্কে অন্যান্য তথ্য জানার ইচ্ছা ছিল।কিন্তু সময়ের অভাব আর ঝামেলা হবে ভেবে আর তথ্য নেয়া হয় নি।ফটকের উপর লেখা "CHANDMOHAL"(চাঁদ মহল)।আমার স্মৃতিশক্তি খুব একটা তীক্ষ্ণ না।তাই ফারদিনের কাছ থেকে জানতে পারি নাকি অন্য কেউ সেটা নির্দিষ্টভাবে বলতে পারছি না।প্রথম চাঁদমহলে যাই আমি,ফারদিন আর সিয়াম মিলে।হালকা বৃষ্টি ছিল।আসরের সময়।সেদিনই বাড়িটির মধ্যে প্রবেশ করব ভেবেছিলাম কিন্তু সন্ধ্যার সময় বলে আর যাই নি।তাছাড়া আমাদের আলোর ব্যবস্থা একটা ফ্ল্যাশওয়ালা মোবাইল ছাড়া কিছু ছিল না।সবমিলে সেদিন যাওয়াটা নিজেদের কাছে বোকামি মনে হচ্ছিল।ফারদিন কয়েকটা ছবি তুলে ফেসবুকে দিয়ে দিল।যথারীতি আমাদের সহপাঠীদের মাঝে বিষয়টি জনপ্রিয় হয়ে গেলো।জনপ্রিয় বলতে কিরকম জনপ্রিয় সেটাও জানানো দরকার।প্রথমেই এক মেয়ে আমাকে ফেসবুকে ম্যাসেজ দিয়ে সেই বাড়ির ঠিকানা জানতে চায়।তার কয়েকদিন পর সেই মেয়ে আর তার অন্যান্য বান্ধুবীরা মিলে সেই বাড়ির সামনে ছবি তুলে ফেসবুকে দেয়।মানে ভূতের বাড়িকে দর্শনীয় স্থান বানিয়ে ফেলেছে।

 শুরু হয়ে যায় মডেল টেস্ট।ভূতের বাড়ি কি আর দাদার বাড়ি কি সব এখন "দূরে গিয়া মর"।পড়াশোনা ফুল দমে।ভেবেছিলাম সর্বকালের সবচেয়ে নিকৃষ্ট পরীক্ষা দিয়েছি।সবাইকে বললামও তাই।রেজাল্ট যদিও অন্য কথা বলেছিল।শেষ পরীক্ষার দিন আমি,নোবেল,ফয়সাল,হাসান আর সিয়াম মিলে ঘুরলাম।ওই শুধু হাঁটাহাঁটি।এক সময় বিরক্ত হয়ে গেলাম হাঁটতে হাঁটতে।ভাবলাম আজকে না হয় যাওয়াই হোক চাঁদ মহলে।মানুষও কম নেই।দ্বিপ্রহরের সময়।সূর্য মাথার উপরে।বেশ গরম।ভয় নেই বললেই চলে।ঠিক করলাম যে আজ ঢুকবই ঢুকব।যদিও এ সময় ভূত থাকবে কিনা সন্দেহ ছিল।নোবেল,হাসান আর আমি।তিনজনের তিনটা মোবাইল।আমারটা চায়না।নোবেলেরটা এন্ড্রয়েড।ভিডিও হবে ওর মোবাইল দিয়েই।সিদ্ধান্ত নিলাম।আমি,সিয়াম আর নোবেল যাবো।আমার চায়না মোবাইলে ফ্ল্যাশ ছিল।নোবেলের মোবাইলে ভিডিও ফ্ল্যাশ।সিয়ামের কিছু নেই।তবুও একট লাঠি নিল।কেন নিল সেটা আর বললাম না।সিয়ামের হাতে নোবেলের মোবাইল।ভিডিও হচ্ছে,ফ্ল্যাশ চালু।মাঝখানে নোবেল।পিছনে আমি।বাহিরে হাসান আর ফয়সাল।আমার ফ্ল্যাশটা চালু করলাম।ফটকে তালা দেয়া।পাশে দেয়াল।যে কেউ টপকাতে পারবে।খুবই নিচু।সরু পথ।পাশপাশি তিনজন দাঁড়ালে হয়ত জায়গা হবে না।সামনে দরজা।কিন্তু ভাঙা।ভিতরে দেখা যাচ্ছে না।হয়তবা পিছনে দেয়ালই।ভাঙা দরজা সেখানে রাখা হয়েছে।এতো ঘাটঘাটি করি নি।বাম পাশে জানালার অবকাঠামো।রেইল স্টেশনের টিকিট কাউণ্টারের জানালার আয়তন হবে।কিন্তু কখনোই সেখানে জানালা ছিল না।চ্যালেঞ্জ করতে পারি।মনে হচ্ছিল ঢোকার এই একটাই পথ।কোনো মতে নিচু হয়ে বসে ঢুকল সিয়াম,তারপর নোবেল,পিছনে আমি।ঢোকার সাথে সাথেই মনে হলো নতুন এক জগতে আসলাম।বাহিরে এতো আলো,শব্দ অথচ ভিতরে এর বিন্দুমাত্র প্রভাব নেই।খুব অসহায় মনে হচ্ছিল নিজেদের।মাত্র নিচতলায়।সামনে বারান্দায় গেলাম।সেখান থেকে বাহিরে হাসানকে হাত দেখালাম।তারপর আবার বারান্দার পাশে একটা রুম।যদিও বারান্দার আগে আরেকটা করিডরের মতো জায়গা পড়ে।সেখান দিয়ে ঘুরে বারন্দার পাশের রুম দিয়ে পুনরায় বারান্দায় আসা যায়।তবুও বারান্দার পাশের রুমেই গেলাম।কিছু নেই।খালি।আলো থাকা সত্ত্বেও যথেষ্ট ছিল না।ভিডিওতে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না।এমন সময় রুম থেকে বের হয়ে করিডরে আসলাম।বাম পাশে সেই প্রথম ঘর।বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথেই যে ঘরটি।আর ডান দিকে সূর্যের আলো দেখলাম একটু।স্বস্তি পেলাম।একটি কুয়া আছে।সেদিকে আর যাওয়া হয় নি।

 এমন সময় একটি ইঁদুর পায়ের কাছে ঘেষে চলে গেলো।ভয় পেলাম না এতে তেমন।সামনে উপরে যাওয়ার সিড়ি আর ডানে কুয়ার একটু আগে আরেকটা রুম।প্রচুর পাতা।পাতার স্তূপ।কবর দিলে যেমন মাটি উঁচু হয়ে থাকে ঠিক তেমন।কিন্তু দৈর্ঘ্যে বেশ লম্বা।সেই রুমে আর যাই নি।সিড়ি দিয়ে উপরে উঠলাম।উপরের তলা নিচের তলার মতোই।শুধু ডানে কুয়া নেই।তাছাড়া সব একই।আমরা দুই তলার বারান্দায় আসলাম।হাসানকে হাত দেখালাম।এবার দুই তলার বারন্দার পাশে্র রুমটায় গেলাম।রুমটিতে একটি চেয়ার ছাড়া কিছু নেই।তিনতলায় উঠার সিড়ি ধরলাম।কিন্তু এবার আর যেতে পারলাম না।উঠে দেখি তিনতলার একটি গেট আছে।গেটে তালা।আর বাহির দেখে বোঝা যাচ্ছে যে নিচ বা দুই তলার মতো না তিনতলাটি।যদিও খুব কম দেখতে পেয়েছিলাম।এত দূর আসার পর ফিরে যেতে ইচ্ছা হলো না।যদিও আর উপায় ছিল না।বের হয়ে গেলাম।গুড বাই "চাঁদ মহল"।

বের হওয়ার পর দেখলাম হাসান একা।ফয়সাল নাই।পাশে একজন বুড়ো ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছে।আশা করেছিলাম ভৌতিক কিছু অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হবো কিন্তু সে ইচ্ছা ছিল না।ইচ্ছাই সত্যে পরিণত হলো।কিছুই পাই নি বা দেখি নি।একটা শব্দও শুনিনি।সেই ভদ্রলোক বলল এখানে সন্ধ্যায় ছেলেরা এসে নেশা করে।বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথেই যে ঘরটি সেখানে কোনায় একটি ছেঁড়া ম্যাট্রেস।নিচে সিরিঞ্জ পড়ে আছে।ঔষধের কাগজও পেয়েছিলাম।গ্লাসও পেয়েছিলাম একটি।সব প্রথম ঘরে।খারাপ লাগল মানুষের পাশাপাশি ভূতও মাদকাসক্ত।কিন্তু নিচতলায় কুয়ার আগের রুমটায় যে পাতার স্তূপ তার নিচে কি ছিল? আরও পাতা হয়ত বা মদের বোতল বা কিছু।কিন্তু কথা হচ্ছে এতো পাতা এই বাড়িটিতে এনে এতো সুন্দরভাবে স্তূপ করে রাখার মানে কি? অবাক করেছে সিরিঞ্জ,গ্লাস,ঔষধ যা কিনা পুরো নতুন একেবারে সামনে পড়ে আছে।নেশা করলে দুই তলায় করার কথা।ইদানিং অপরাধীদেরও সাধারণ জ্ঞান কমে গেছে।অবশ্য মাদক সেবন করলে কতটাই বা সাধারণ জ্ঞান থাকে?

২ comments

  1. 1
    মাহফুজ

    লেখার চেষ্টা করার জন্য প্রথমেই শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। লেখার বিষয়টা মাদক নিয়ে, তারপরও এ বিষয়ে আপনার মটিভটি পরিষ্কার হয়নি। যদিও প্রথম প্রথম এমন হতেই পারে। তাছাড়া আপনার বয়সটাও তো কম। তাপরপরও এতবড় একটা লেখা লিখেছেন- তার জন্য সাধাুবাদ জানাই।
    শুভাকাঙ্খি হিসেবে আপাতত অল্প কিছু বলতে চাই। আশাকরি মনে রাখার চেষ্টা করবেন-
    *প্রতিটি বাক্যের শেষে দাড়ি বা কমার পর স্পেস দিতে হয়।
    * গল্প/ প্রবন্ধের বিষয়বস্তু নির্বাচন করে পাঠকের সামনে সেই অনুসারেে আপনার মতামত প্রকাশের চেষ্টা করবেন যেন আপনার লেখার উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট হয়।
    এ বিষয়ে নিচের লিংকে আমার একটি লেখা (মাদক-মুক্ত সমাজ চাই) পড়ার জন্য আমন্ত্রণ রইল-
    https://sites.google.com/site/everlastingheavenlylight/middle-way-is-the-best-madhyapantha-i-uttama/18-we-want-intoxicant-free-society-madaka-mukta-samaja-ca-i

    1. 1.1
      সরকার সানজিদ আদভান

      লেখাটা পড়ার জন্য ধন্যবাদ।আসলে আমার লেখার মূল লক্ষ্য হচ্ছে নিজের অভিজ্ঞতাটা সবার সাথে শেয়ার করা।পাশাপাশি বাড়িটার সত্যতা সম্পর্কে মানুষকে জানানো।পাশাপাশি এ লেখার মাধ্যমে যদি ঐ বাড়ির প্রতি সচেতনতা তৈরী করে এগুলো বন্ধ করা যায় তবে ত কোনো কথাই নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.