«

»

Apr ২৩

ডারউইনের বিবর্তনবাদঃ কিছু পর্যবেক্ষণ-৮

[পর্ব-১][পর্ব-২][পর্ব-৩][পর্ব-৪][পর্ব-৫][পর্ব-৬][পর্ব-৭]
মৌলবাদী ধার্মিকদের কথা শোনা যায় অহরহ, কিন্তু মৌলবাদী নাস্তিক! বিজ্ঞানের অনুসারীরা যুক্তিবাদী হতে পারে কিন্তু কোনো ব্যাপারে গোঁড়া হতে পারে না। বিজ্ঞানকে মূলমন্ত্র ধরলে, গোঁড়ামির স্হান ওখানে থাকার কথা না। কারণ, পরিবর্তনশীল বিজ্ঞান গোঁড়ামিকে সমর্থন করতে পারে না। কিন্তু বিজ্ঞান ঠিকাদারদের বেলায় এটা খাটছে না। গুরুর উপদেশ বলে কথা। তাদের বর্তমান গুরু ডকিন্স নাস্তিকদের যুদ্বাংদেহী হবার পরামর্শ দেন। নাস্তিকদের, ধর্মের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগে উৎসাহদানকারী ফরাসী বিপ্লবের সেই জল্লাদদের কথাই মনে করিয়ে দেয়। প্রয়োজনে হিটলারের পদাঙ্ক অনুসরণ করাটাও এই গুরু সঠিক বলে মনে করেন:

It’s an undeniable fact that to own up to being an atheist is tantamount to introducing yourself as Mr. Hitler or Miss Beelzebub

ভেবে দেখুন কি আশা করা যায় তার অনুসারীদের কাছে থেকে। আজ যারা নাস্তিকদের সাথে হিটলার, স্টালিন, লেলিন, পলপটদের মিলিয়ে ফেলেন তারা কতটুকু ভুল করেন! তাদের মধ্যে হিটলারের নাম একটা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আর ডকিন্সের হিটলারকে অনুসরণ করতে উপদেশ দেয়াটা নিছক কাকতলীয় নয়। কারণ ডারউইনের তত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত চরম বর্ণবাদী ইউজেনিক্স (Eugenics) এর ব্যাপক প্রয়োগকারী হলেন এই হিটলার, যার রেশ এখনও বিদ্যমান বিভিন্ন আবরণে। যদিও বর্তমানের ডারউইনিয়ান বিবর্তনবাদীরা এই ইউজেনিক্স নাম শুনলেই একে দূরে ঠেলে দেয় এটা বিজ্ঞানের কাজ নয় বলে। অথচ এই ইউজেনিক্স এর প্রসার ঘটেছিল বিজ্ঞানের দ্বারাই। ডারউইনিয়ান বিবর্তনবাদীদের এই ঘোল গেলার যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। কারণ, প্রতিটা আবিষ্কারের সাথে একটি দর্শন জড়িত থাকে। আজকের প্রচলিত বিবর্তনবাদের দর্শনে ছিল সাম্রাজ্যবাদ ও বর্ণবাদ। তবে হিটলার বাড়াবাড়িটা বেশীই করে ফেলেছিলেন! তবে তিনি যে ডারউইনের বিবর্তনবাদের দর্শনকেই প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ডারউইনের বিবর্তনবাদের দর্শনটা পুরোপুরি অনৈতিক আর বিজ্ঞানও নৈতিকতা শেখায় না। প্রফেসর জিভস এর কথায় তা ধবনিত হয়ঃ বিজ্ঞান আসলে কোনো নৈতিকতা শিক্ষা দেয় না আর এটা বিজ্ঞানের কাজও নয়। এটা বিদ্যমান জিনষকেই ব্যাখ্যা করে মাত্র। তাহলে ডকিন্স সাহেবরা কোথা থেকে পেলেন নৈতিকতা। ডকিন্সদের নৈতিকতা কি তাহলে শুধুই মেকি! কেনই হবে না যেখানে গুরু ডকিন্স অনুসারীদের বলছেনঃ যেহেতু স্রষ্টা বলতে কিছু নেই, দুচিন্তা বাদ দাও ও জীবণকে উপভোগ কর :

There’s probably no God. So stop worrying and enjoy your life

ভোগবাদের চরম পরাকাষ্ঠ দেখিয়েছেন তিনি! ভোগবাদে ভোগের শেষ নেই, সেখানে কি ধরণের নৈতিকতার বালাই থাকবে তা সহজেই অনুমেয়! আর পশু থেকে বিবর্তিত মানুষের নৈতিকতা নিয়ে উচ্চবাচ্যও মানায় না! তাদের নৈতিকতা ভোগবাদর সমার্থক! আজ নাস্তিক মানেই প্রকারান্তরে ভোগবাদী! বামপন্থী নাস্তিক ও ভোগবাদী নাস্তিকদের মধ্যে আজ সুরের ঐক্যতান! হারিয়ে গেছে বামপন্থাদের সেই সাম্যবাদ! ভোগবাদ আজ তাদের উভয়েরই পুঁজি, আর কারণটাও সহজ! আমজনতার কাছে যদি অনেকগুলো অপশন দেয়া হয় নির্বাচন করার জন্য যার মধ্যে ভোগও একটি, এবং তাকে বুঝান হয় যে অতি অল্প এই আয়ুষ্কালটা উদ্দেশ্যহীন, তাহলে সে চোখ বুঁজে ভোগকেই নির্বাচন করবে, আর সেটাই স্বাভাবিক! কে শুধু শুধু কষ্ট করবে, ত্যাগকে করবে আদর্শ, যেখানে মৃত্যুতেই সব শেষ! এক খুন আর হাজার খুনের জন্য যখন একই দাওয়া-কেন সে অন্য অপশনের কথা দ্বিতীয়বার ভাববে! গুরু ডকিন্সের প্রচারণা কি তাকে সে পথেই উৎসাহিত করে না:

The universe that we observe has precisely the properties we should expect if there is, at bottom, no design, no purpose, no evil and no good, nothing but blind, pitiless indifference

অবশ্য ডকিন্সসহ নাস্তিকরা বিবর্তনবাদকে যেভাবে ব্যবহার করছে তার প্রতিবাদে শামিল হচ্ছে নামকরা বিজ্ঞানীরা। তারা মনে করেন এর দ্বারা ডকিন্স তত্ত্বটি নিজেকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। ডকিন্স ও তার কিছু সাঙ্গপাঙ্গের অপব্যবহারের জন্য বিবর্তনবাদের বিরুদ্ধে মানুষের সমর্থন দিন দিন বাড়ছে। আর প্রফেসর রেইসতো ডকিন্সকে শ্রেনীকক্ষে শিক্ষাদানের অযোগ্য বলেই মনে করেন:

I don’t think that Richard Dawkins would probably at the moment be an ideal teacher for teaching classrooms where a high proportion of the children come from families that hold creationism beliefs.

উল্লেখ্য রেইসকে রয়েল সোসাইটি থেকে বাধ্যতমূলকভাবে অপসারণ করা হয় বিবর্তনবাদ নিয়ে সংশয় পোষণ করার কারণে। তিনি বিদ্যালয়ে ডারউইনবাদের সাথে সাথে ‘সৃষ্টিতত্ত্ব’ পড়ানোর ব্যাপারে তার মতামত দিয়েছিলেন। আর তাতেই তার উপর নেমে আসে এই খড়গ! এসব ঈঙ্গিত দেয়, কি ধরণের বাকস্বাধীনতায় ডকিন্সরা বিশ্বাসী!

নাসার গোড্ডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টার এর মহাকাশপদার্থবিদ ড: জেনিফার ওয়াইজম্যানও বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে স্হায়ীভাবে একটা সংঘর্ষ জিইয়ে রাখাকে ভাল চোখে দেখছেন না। এটা আদতে বিজ্ঞানের ক্ষতিই করছে। কারণ সাধারণ মানুষ বিজ্ঞান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
খ্যাতনামা ডারউইনিয়ান দার্শনিক মিখায়েল রিউস যিনি নিজেও সংশয়বাদী, মত দিয়েছেন যে, এই ‘ডকিন্স’ এবং আরেক ডারউইনবাদী ‘ডেনেট’ দুজনেই নৈতিক ও আইনী উভয় দৃষ্টিতেই বিপদজনক:

Dawkins and Dennett are really dangerous, both at a moral and a legal level.

বিজ্ঞানের সাথে ধর্ম মিলানোর ফলে যে ডারউইনবাদী নাস্তিকরা ধার্মিকদের উপর খাপ্পা তারাই আবার বিজ্ঞানকে ব্যবহার করছে নাস্তিকতার প্রচারে। স্পষ্ট দ্বিচারিতা! ডারউইন নিজেও ছিলেন এর বিরুদ্ধে! এই বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য করে রিউস আমেরিকার সংবিধানের উল্লেখিত ধর্ম ও রাষ্ট্রকে পৃথক রাখার তার প্রতি ইংগিত দেন। যুক্তি মানলেতো ডারউইনবাদও স্কুলগুলোতে পড়ানো উচিত নয়:

If Darwinism equals atheism then it can’t be taught in US schools because of the constitutional separation of church and state. It gives the creationists a legal case. Dawkins and Dennett are handing these people a major tool.

এই অসততার ফল পাওয়া যাচ্ছে খুব দ্রুত। যে বিবর্তনবাদ গত শতাব্দী যাবৎ একচ্ছত্র রাজত্ব করে যাচ্ছিল তাতে ভাটা পড়েছে। (চলবে…..)

নোটঃ লেখাটি প্রথম প্রকাশের সময়কাল ১৩ নভেম্বর ২০১০।

১ comment

  1. 1
    সরোয়ার

    বিবর্তনবাদের বর্তমান গুরুকে নিয়ে সাবধানে কথাবার্তা বইলেন, কেননা তার চরমপন্থী অনুসারীরা তেড়ে আসার সম্ভাবনা আছে! আল কায়েদার কর্মীরা যেমন তাদের গুরুকে ভক্তি করে, তেমনিভাবে নাস্তিক মৌলবাদীরা (মুক্তমনারা)ডকিন্সকে অনুসরণ করে!

Leave a Reply

Your email address will not be published.