«

»

Sep ১৭

বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত আমাদের এই পৃথিবী- উদ্দেশ্যহীন নয়তো! – ৪

নতুন নতুন মহাকাশ গবেষণার ফল আপাতদৃষ্টিতে পৃথিবীর গুরুত্বকে যতটা গুরুত্বহীন করেছে বলে প্রতীয়মান হয় বাস্তবে কিন্তু ততটা নয়। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে আরেকটি ‘বাসযোগ্য পৃথিবী’কে এমন কিছু বৈশিষ্ঠ্যকে ধারণ করতে হবে যা তার পাবার সম্ভবনাকেই বরং প্রশ্নবিদ্ধ করে। বলে নেয়া ভাল আলোচ্য ‘বাসযোগ্য পৃথিবী’ বলতে জটিল প্রাণের বসবাসোপযোগী গ্রহকেই বুঝান হয়েছে। নীচের প্যারাগুলোতে বাসযোগ্য পৃথিবীর এরকমই কিছু ফ্যাক্টের প্রতি দৃষ্টি দেয়া হবে।

প্রথমেই ধরা যাক পানির কথা। আগেই বলা হয়েছে যে প্রাণের অস্তিত্বের ব্যাপারে এখনও পানির উপস্হিতিই প্রধান। পানির রাসায়নিক ও পানিতে বিদ্যমান ধাতুর গুনাবলী অন্য যেকোন পদার্থ থেকে স্বতন্ত্র। পানির রাসায়নিক ধর্ম কার্বন-ভিত্তিক প্রাণের জন্য খুব উপযোগী। এর যেমন রয়েছে সূর্য থেকে তাপ শোষণের অসাধারণ ক্ষমতা, তেমনি এটি ভূমির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে খুব কার্যকরী। এটা পৃথিবীর শিলার গলনান্ককে কমিয়ে দেয়, শিলাকে নাটকীয়ভাবে দূর্বল করে গলতে সাহায্য করে।

অন্যন্য গ্রহের তুলনায় পৃথিবী যে তুলনামূলকভাবে একটি স্হির অবস্হানে বিরাজমান আর তার একটা কারণ হল এর কক্ষপথ। পৃথিবীর কক্ষপথ স্বতন্ত্র প্রায় বৃত্তাকার বলা যায়। প্রায় বৃত্তাকার একারণে যে সূর্য থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের ও দূরের অবস্হানের দূরত্ব খুব কম। কিন্তু অন্যান্য গ্রহের ক্ষেত্রে দেখা গেছে নক্ষত্রের চারপাশে তাদের ঘূর্ণায়মান কক্ষপথ বৃত্তাকার নয়, ডিম্বাকৃতির। যেমন ধরা যাক বৃহষ্পতির কক্ষপথ, এটি পুরোপুরি ডিম্বাকৃতির ন্যায়।

কেমন হতো যদি আমাদের পৃথিবীর প্রায় চারগুণ ছোট উপগ্রহ চাঁদ না থাকত! মোদ্দা কথা হল এই চাঁদ ছাড়া পৃথিবীতে প্রাণের উপস্হিতি প্রায় অসম্ভব। চাঁদের আকর্ষণ জোয়ার-ভাটার জন্য দায়ী। আবার তা পৃথিবীর আবর্তনের কক্ষকে ধরে রাখে প্রায় ২৩.৫ ডিগ্রিতে, যাতে করে পৃথিবীতে ঋতুর পরিবর্তন ঘটে এবং জীববৈচিত্রের ব্যাপ্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত হয়।

ধরা যাক মহাশুন্যে আমাদের পৃথিবীর অবস্হানকে। গ্যালাক্সির ভিতরের অংশ যা মূলত কেন্দ্রের নিকটবর্তী তা খুব বিপদজনক এলাকা, কারণ এতে বিরাজ করে ‘কৃষ্ণগহ্বর’ সহ নানারকম ক্ষতিকর উপাদান। অপরদিকে গ্যালক্সির শেষ প্রান্তে থাকে অনেক গ্যাসের প্রাচুর্য যা জীবণ ধারণের জন্য অনুপযোগী। দেখা গেছে গ্যালক্সির মোটামুটি মাঝামাঝি অবস্হানে বাসযোগ্যতা সবচেয়ে বেশী। গ্যালাক্সিতে আমাদের অবস্হান এই ‘বাসযোগ্য স্হানে’ যা ‘গলডিলক্স জোন (Goldilocks Zone)’ ‘জীবণ বলয়’, ‘কমফোর্ট বলয়’ ইত্যাদি নামে পরিচিত। এই স্হানটি না গরম না উষ্ণ, সহজ করে বললে ‘একদম সঠিক পরিমাণে’। কারণ যদি খুব গরম হয় তাহলে গ্রহে বিদ্যমান পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে আবার খুব ঠান্ডা হলে এটা বরফ হয়ে যাবে। তাছাড়া নক্ষত্রের চারপাশে বাসযোগ্য এলাকার ব্যাপ্তি খুব কম। পৃথীবী আজ যে অবস্হানে আছে তা যদি কেবল ৫ ভাগ কাছে থাকে তাহলে তার অবস্হা হত শুক্রের মত। আর পৃথিবী যদি সূর্য থেকে ২০ ভাগ দূরে থাকত তাহলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড এর মেঘ আমাদের চারপাশে ঢেকে ফেলত যার কারণে পৃথিবী ঢাকা পড়ত বরফের আচ্ছাদনে।

আমাদের এই সৌরমন্ডল প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে তৈরী হয় ধুলি ও বিভিন্ন গ্যাসের সমন্বয়ে যা নেবুলা নামে পরিচিত। উল্লেখ্য, এই নেবুলার উপাদানগুলো আমাদের বর্তমান সূর্যের মতই। সূর্যের উপাদানের উপর গবেষণা করে দেখা গেছে এতে হালকা উপাদান প্রধানত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম বিরাজমান। এসব উপাদন সূর্যের মোট উপাদানের প্রায় ৯৮-৯৯%। সূর্যে বিদ্যামন অন্যান্য উপাদান হলো কার্বন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন সব মিলে প্রায় ১-২%। তাছাড়া এতে সিলিকন, ম্যাগনেসিয়াম আয়রন ইত্যাদি ভারী উপাদান আছে প্রায় ০.১-০.৩% এর মতো। অপারদিকে সৃষ্টির প্রাথমিক অবস্হায একটি অপেক্ষাকৃত অস্হির অবস্হা থেকে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আমাদের পৃথিবী অনেকটাই স্হির। এর উপাদানের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় এটি মূলত ভারী উপাদানের সমারোহ। আয়রন, অক্সিজেন, ম্যাগনেসিয়াম, সব মিলিয়ে আছে ৯০-৯৫%, নিকেল, ক্যালসিয়াম, আলুমিনিয়াম, সালফারের পরিমাণ ৫-৭%। অবশ্য এতে প্রাণের জন্য অত্যাবশকীয় হাইড্রোজেন, কার্বন ও নাইট্রোজেন আছে মাত্র ০.১% বা তার থেকে কম। এই অত্যাবশকীয় হালকা উপাদনগুলো যদি পৃথিবীর সর্বত্র (ভিতরে ও বাইরে) সমান অনুপাতে বিস্তৃত থাকত তাহলে হয়ত এতে প্রাণের বিকাশ ঘটা অসম্ভব হয়ে পড়ত। তবে খুব অবাক করা ব্যাপার হল এই সব হালকা কিন্তু প্রাণের জন্য অত্যবশকীয় উপাদানগুলোর সবচেয়ে বেশী প্রাচুর্য পৃথিবীর ভুমিতেই।

১. Origin of life, Dr. Norman Horwitz, California Institute of Technology

Leave a Reply

Your email address will not be published.