«

»

Jun ২৫

কোনপন্থায় বামপন্থা-৫

[পর্ব-১][পর্ব-২][পর্ব-৩][পর্ব-৪]
বামপন্থীরা নদীসঙ্গমের মতো ভোগবাদী নাস্তিকদের কাছে নিজেদের সমর্পণ করে। ব্যাপারটি দৃষ্টিকটু। প্রগতিশীলতা ও বৈজ্ঞনিক সমাজের কথা বামপন্থীরা সবসময়ই বলত। মজার ব্যাপার হল, আমাদের দেশের প্রতিথযশা অনেক বামপন্থী নাস্তিকই ‘সাহিত্য’ আর ‘কলা’র ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে এই বৈজ্ঞনিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিত! এই আন্দোলনের করুণ দশা নিয়ে কে সন্দেহ করতে পারে! এই সর্বহারা বামপন্থী ও ভোগবাদী নাস্তিকদের মিলনস্হল ‘নাস্তিকতা’, এটাই যেন বামপন্থীদের শেষ পরিচয়। তাদের মিলনে অনূঘটক হিসাবে কাজ করে বর্ণবাদী ডারউইনবাদ। অথচ কয়েক দশক আগেও এরকম ছিল না।

প্রাথমিক অবস্হায় বামপন্থীরা ডারউইনবাদের বদলে ল্যামার্কিজমকেই গ্রহণ করে। রুশ বিজ্ঞানীদের মধ্যে ডারউইনবাদের চেয়ে ল্যামার্ক এর প্রতি আনুগত্য ছিল সবচেয়ে বেশী। ল্যামার্কের মতো তারাও মনে করত ‘ব্যক্তির অর্জিত গুণাবলী বংশানুক্রমে সঞ্চারিত হয়’। কে.এ. তিমিরিয়াজেভ (১৮৪৩-১৯২০), আই. আই. মেচনিকফ (১৮৪৫-১৯১৬), পি.এ. ক্রপটকিন (১৮৪২-১৯২১), ভি.ও. কোভালেভ (১৮৪২-১৮৮৩), এ.ও. কোভালেভস্কি (১৮৪০-১৯০১) প্রমূখদের লেখা পড়লে দেখা যায় তারাও ডারউইনবাদকে পুরোপুরিভাবে মানতে পারেননি। ডারউইনবাদকে তারা ইংল্যান্ডের ধনতান্ত্রিক সমাজের প্রতিফলন হিসাবে দেখেছেন। অবশ্য এটা অস্বীকার করারও উপায় নেই। কারণ ডারউইন ও তার পরিবার ইংল্যান্ডের অভিজাত ভিক্টোরিয়ান সমাজের গণ্ডি থেকে বের হয়ে আসতে পারেননি, উল্টো একে লালন করেছেন স্বযত্নে। রুশ বিজ্ঞানীরা ডারউইনবাদের ‘অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’কে সমাজের জন্য নেতিবাচক হিসেবেই দেখেছেন। যে সাম্যবাদের বুলি সমাজতান্ত্রিকরা আওড়াত, তার সাথে ডারউইনবাদের হিংস্রতা, অমানবিকতা ও মর্মমূলে প্রোথিত বর্ণবাদকে মিলাতে পারত না।

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব চের্নিশেভস্কিও একহাত নিয়েছিলেন ডারউইনের উপর। তিনি মনে করতেন ডারউইনের তত্ত্ব যদি সঠিকই হত তাহলে জীবজগতে বিরাজ করত চরম বিশৃঙ্খলাতা, আদতে যা সেরকমভাবে দেখা যায় না এবং আর কামড়াকামড়িতে অগ্রগতি সম্ভব ছিল না। প্রতিযোগীতাই নয়, সহযোগিতাই শেষ কথা, তিনিও সেরকমই মনে করতেন। তাছাড়া রুশবিজ্ঞানী ক্রপটিকনও মনে করতেন প্রাণীদের অস্তিত্বরক্ষার চাবিকাঠি হল তাদের সামাজিক জীবণ-যাপন ও সহযোগিতার মনোভাব। উদাহরণ হিসাবে টেনে এনেছেন নেকড়ে, সিংহ, ইঁদুর, বাঁদুর ইত্যাদিকে। চরমপন্হী নেতা নিকোলাই নঝিনও ডারউইনবাদের প্রজাতির প্রতিটি সদস্য প্রয়োজনে একে অপরের সাথে রক্তাক্ত সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়াকে মানতে পারেননি। অনেকটা দ্বিধা-দ্বন্দের মধ্য থেকে তিনি অবশেষে ডারউইনকে অভিহিত করেছেন একজন ‘বুর্জোয়া-প্রকৃতিবিদ’ হিসাবে।

তবে ব্যতিক্রমও ছিল। কিছু প্রতিথযশা সমাজতান্ত্রিকও ছিলেন যারা ডারউইনবাদ প্রচারে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। অবাক করা ব্যাপার হল সমাতান্ত্রিক ঘরণার প্রতিথযশা বৃটিশ সাহিত্যিক জর্জ বার্ণাড ‘শ তাদের একজন, যিনি বর্ণবাদী ইউজেনিক্সকে প্রকাশ্যে সমর্থন করতেন। তাছাড়া জার্মানীর নাৎসী বাহিনী অধীনস্হ মেডিসিন এর ইতিহাসবিদ রোবার্ট প্রক্টর এর মতে ১৯৩১ সালে জার্মানীর কম্যুনিস্ট পার্টি বিশেষ অবস্হায় মানসিকভাবে অসুস্হদের জন্য জন্মশুদ্ধিকরণের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন….১৯৩১ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত জার্মান ও সৌভিয়েত ইউনিয়ন মস্কোতে প্রতিষ্ঠিত একটি রেসিয়াল জীববিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানে একসাথে কাজ করত, যার উদ্যোক্তা ছিল জার্মান ইউজেনিস্ট লুডউইগ অ্যাশকফ এবং ওসকার ভগ (Robert N. Proctor, Racial Hygine: Medicine Under the Nazis, Harvard University Press, P23)। অথবা ধরা যাক যুক্তরাষ্ট্রের সমাজতান্ত্রিক নেতা উইলিয়াম জে. ফস্টার এর কথা। (চলবে…….)

৮ comments

Skip to comment form

  1. 4
    সাদাত

    অনেক বামপন্থীকে শেষকালে বেশ কড়া ধার্মিক হতে দেখেছি। মানে একেবারে বাম থেকে একেবারে ডানে চলে এসেছ।

    1. 4.1
      শামস

      @সাদাত:
      তা ঠিক বলেছেন।
      আমি যেসব বামপন্থী রাজনীতিকদের বাস্তবজীবণে দেখেছি, তাদের দেখেছি ধর্মের ব্যাপারে একধরণের পাশ কাটানোর স্বভাব বা একধরণের গতানুগতিক উত্তর যেমন, ধর্মকে ব্যাক্তিজীবণের বাইরে আনা উচিত না। কিন্তু ইন্টারনেটে ধর্ম নিয়ে (বিশেষত ইসলাম নিয়ে) তাদের ভিতরের বিকৃ্ত মানসিক আচরণ সহজে চোখ এড়াবে না।

  2. 3
    শামস

    আপনাকেও ধন্যবাদ।
     

  3. 2
    শাহবাজ নজরুল

    মজার ব্যাপার হল, আমাদের দেশের প্রতিথযশা অনেক বামপন্থী নাস্তিকই ‘সাহিত্য’ আর ‘কলা’র ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে এই বৈজ্ঞনিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিত! এই আন্দোলনের করুণ দশা নিয়ে কে সন্দেহ করতে পারে!

    হ্যাঁ অভিজিৎও তা স্বীকার করেছিলেন এক সাক্ষাতকারে। দূঃখের ব্যপার এই যে, অভিজিৎ নিজে তার ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ (a.k.a. নাস্তিকতা) থেকে মুক্তি পাননি। ঐ ভাইরাস তাকে এমন কাবু করে রেখেছে যে, তিনি কবীর চৌধুরীদের মতো কলা অনুষদের লোকরাই (অবশ্যই নাস্তিকমনা হতে হবে) বিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষকদের পথ দেখাবেন বলে বিশ্বাস করেন। আর বুয়েট ও ঢাবির বিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষকরা কেন ধর্মভীরু সেজন্যে তিনি তাদের বিজ্ঞানের বলয় থেকেই বের করে দিতে চান। বিজ্ঞানকে তিনি কলুষমুক্ত (ধর্মভীরুতা থেকে) করতে অঙ্গিকারবদ্ধ।

    --শাহবাজ

    1. 2.1
      শামস

      আমাদের সমাজ বিজ্ঞানের এক শিক্ষককে দেখতাম বৈজ্ঞনিক সমাজতন্ত্রে জন্য নিবেদিতপ্রাণ। সমাজবিজ্ঞানে আধুনিক বিজ্ঞানের যাবতীয় সব পেয়ে তিনি হয়ত বৈজ্ঞনিক সমাজতন্ত্রের (!) কথা বলতেন!!

      অফটপিকঃ এখানে কোন বিষয়কে হেয় করা হচ্ছে না। কলা বিভাগের বিষয় হিসাবে সমাজবিজ্ঞান অসাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কিছু মানুষের নীচ দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতি অঙ্গুলিনির্দেশ করা হয়েছে।

    2. 2.2
      সরোয়ার

      অভিজিত সাহেবের গুরুরা বুয়েটকে তো মাদ্রাসার সাথে তুলনা করেছিল! আর সেই মাদ্রাসার ছাত্র অভিজিতরা ইসলামের খেদমতে নিয়োজিত রয়েছে!!  

      শামস, আপনার লেখা খুব ভাল হচ্ছে যা ভবিষ্যতের প্রজন্মের অনেক কাজে লাগবে। আপনার সাথে সবসময় আছি। ধন্যবাদ।

  4. 1
    এস. এম. রায়হান

    পর্বগুলো অসম্ভব রকম ভাল হচ্ছে, লেখার মধ্যে কোন বাহুল্যতাও নেই। আশা করি সিরিজটি শেষ পর্যন্ত চলবে।

    1. 1.1
      শামস

      ধন্যবাদ রায়হান ভাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.