«

»

Mar ০৯

ডারউইনের বিবর্তনবাদ- কিছু পর্যবেক্ষণ-১

ডারউইনের বিবর্তনবাদ বিজ্ঞানের অন্যতম আলোচিত একটি শাখা। এই মতবাদটা লাইমলাইটে আসার একটি কারণ এর ডগমাটিক বৈশিষ্ট্য যাতে তার কিছু অতি-উৎসাহী অনুসারীর বিশেষ অবদান আছে। ডারউইনবাদের মত ‘বাদ’ বা ‘ইজম’ জিনিষটা বিজ্ঞানের আর কোনো শাখায় সাধারণত দেখা যায় না। তাছাড়া দর্শনের সাথে এর নিবিড় যোগসূত্রও আরেকটা কারণ। বিজ্ঞানের সাথে দর্শনের এক ধরণের যোগসূত্র থাকে, আর এটাই স্বাভাবিক। বর্তমান যুগে প্রতিদিনকার নতুন নতুন আবিষ্কারের জন্য এটা কতটুকু খাটে এটা নিয়ে তর্ক হতে পারে তবে গত শতাব্দী পর্যন্ত পুরাতন আবিষ্কারগুলোর দিকে তাকালে এব্যাপারে একটা ধারণা পাওয়া যায়। ডারউইনের বিবর্তনবাদ ক্ষেত্রে তা বিশেষভাবে প্রযোজ্য। ডারউইন আক্ষরিক অর্থে দার্শনিক না হলেও তার জীবিতাবস্হায়ই তাকে দার্শনিক নামে অভিহিত করা হত [5]। তার মতবাদের দার্শনিক অংশটাকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করা হয় মূলত বিতর্ক এড়ানোর জন্য, যা এই তত্ত্বের উপর কালিমা হয়ে আছে। ডারউইনের তার নিজের বায়োগ্রাফীতেও এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ডারউইন যে তার শিক্ষাগুরু স্যার জে. হার্শেলের প্রাকৃতিক দর্শন দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত ছিলেন তা নিজেই স্বীকার করেছেন:

During my last year at Cambridge, I read with care and profound interest Humboldt’s Personal Narrative. This work, and Sir J. Herschel’s Introduction to the Study of Natural Philosophy,[4] stirred up in me a burning zeal to add even the most humble contribution to the noble structure of Natural Science. No one or a dozen other books influenced me nearly so much as these two.

হার্শেলই ডারউইনকে তার জীববিজ্ঞানের গবেষণার দার্শনিক ভিত্তিটা দেন। নাম উল্লেখ না করলেও অরিজিন অব স্পেসিস এর প্রথম সূচনা পাতায় ডারউইন যে দার্শনিক এর কথা বলেছেন সে যে হার্শেল তা সহজেই অনুমেয়। তার নিজের ভাষায়:

The facts seemed to me to throw some light on the origin of species- that mystery of mysteries as it has been called by one of our greatest philosophers.

দার্শনিক হার্বার্ট স্পেনসার ডারউইনের অরিজিন অব স্পেসিস প্রকাশের পাচ বছরের মাথায় ডারউইনের বিবর্তনবাদের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা ‘সোসাল ডারউইনিজম’ নামে অমানবিক এক মতবাদ প্রকাশ করেন। যদিও কেউ কেউ ডারউইন ও স্পেনসারের কাজকে স্বতন্ত্র বলে মনে করেন। কিন্তু ডারউইনের ব্যক্তি, পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিকতাকে পর্যালোচনা করলে তাদের সে দাবীকে সঠিক বলে মনে হয় না। আর সোসাল ডারউইনিজম এর প্রায়োগিক দিকটা হল চরম বর্ণবাদী ইউজেনিক্স (Eugenics)। ইউজেনিক্স মতবাদ অনুযায়ী ‘সাদা’রাই বিবর্তনের সবচেয়ে উপরের স্তরে। অন্যদিকে কালো ও এশিয়ানরা নীচের দিকে। এই মতবাদটা বর্তমানে আর চালু নেই বলে দাবী করা হয়। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির দিকে তাকালে ইউজেনিক্স এর ছায়াকেই যেন দেখা যায়! ডারউইন নিজে ছাড়াও তার বংশধর ও ঘনিষ্ট পারিবারিক বন্ধুদের মধ্যেও বর্ণবাদী ইউজেনিক্স এর প্রভাব প্রকটভাবে লক্ষ্য করা যায়, সেখানে ডারউইনকে কৌশলে এর প্রভাবমুক্ত রাখতে চাওয়াটাই বরং বেমানান বলে মনে হয়। আজকাল আবার কেউ কেউ ডারউইনকে একজন দাস-দরদী হিসাবে অভিহিত করে, অথচ লক্ষ্য করে না যে তার প্রতিষ্ঠিত মতবাদ সমাজে শ্রেণীবিভাজনের ধারণা থেকে উদ্ভূত এবং তিনি ও তার পরিবার এই ধারণাকে রক্ষা করতে সদাসচেষ্ট ছিলেন। উল্লেখ্য, সমাজতান্ত্রিক সৌভিয়েত ইউনিয়ন ডারউইনের মতবাদকে প্রাথমিক দিকে গ্রহণ করতে অপরাগ ছিল। মতবাদটিকে তৎকালীন ইংল্যান্ডের সাম্রাজ্যবাদ প্রসারের একটি উপকরণ হিসাবে দেখা হত। তাছাড়া মতবাদটির বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গীটাও একটা কারণ ছিল।

ডারউইনের কাজিন ফ্রান্সিস গাল্টনই হল বর্ণবাদী ইউজেনিক্স (Eugenics) এর প্রতিষ্ঠাতা। তার দুই ছেলে জর্জ এবং লিওনার্ড ইউজেনিক্স মতবাদ প্রচারে নিবেদিত ছিলেন এর মধ্যে লিওনার্ড গ্রেট ব্রিটেন এর প্রধান ইউজেনিক্স গ্রুপ ‘বৃটিশ ইউজেনিক্স সোসাইটি’ এর চেয়ারম্যান এর পদ গ্রহন করেন। লিওনার্ড ১৯১১ থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত এর চেয়ারম্যান ছিলেন। আত্নীয়দের মধ্যে বিয়ের অসুবিধার ব্যাপারে ডারউইন জানতে পারেন তার কাজিন ফ্রান্সিস গাল্টন এর কাছ থেকেই। (যদিও পরে গবেষণায় দেখা গেছে কাজিনদের মধ্যে বিয়ের ব্যাপারে সেসময়ে যে ধারণা তিনি পেয়েছিলেন, যেমন যতটুকু ক্ষতিকারক মনে করেছিলেন আসলে ততটুকু নয়)। অথচ তারপরও বৃটেনের তৎকালীন উচ্চশ্রেণীর (ভিক্টোরিয়ান সমাজের) প্রথা মেনেই ডারউইন বিয়ে করেন ইমা ওয়েজউড নামে তার এক কাজিনকে। তিনি তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে বেশ চিন্তিত থাকতেন। তিনি তার এক বন্ধুকে এও লিখেছেন, “Once he even wrote to a friend that, “We are a wretched family & ought to be exterminated.” তার সবচেয়ে ছোট সন্তান মারা যায় বাচ্চা অবস্হায় যা ডারউইনের বিবাহজনিত কারণে নাকি তার বংশে বাহিত রোগের কারণে তা নিয়ে মতপার্থক্য আছে। আত্নীয়দের মধ্যে বিয়ের অসুবিধা জানা সত্বেও তার ছেলে লিওনার্ডও (বৃটিশ ইউজেনিক্স সোসাইটির চেয়ারম্যান) উচ্চশ্রেণীর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কাজিনকেই বিয়ে করেন। অবশ্য ডারউইনের নিজেরও ছিল ভয়ানক রকম অসুস্হতা যা তিনি তার পুরোজীবন ধরে বয়ে বেড়ান। কারো মতে তার ছিল হাইপোকন্ড্রিয়া বা পেনিক ডিসঅর্ডার (hypochondria or panic disorder). অপরদিকে অস্ট্রেলিয়ান বিজ্ঞানী প্রফেসর জন হেইমেন ব্রিটিশ মেডিকেল অনলাইন জার্নালে ডারউইনের বমি, নউসিয়া, পাকস্হলী ও চামড়ার সমস্যা ছিল বলে উল্লেখ করেন। কখনো রোগে পড়লে তাতে কয়েক সপ্তাহ তাকে সোফাতেই কাটাতে হতো। এর জন্য অনেক চিকিৎসা-ই তিনি নিয়েছিলেন, কিন্তু কোনো কাজে আসেনি। উল্লেখ্য ডারউইনের মা সুসান্নাহ ও এই তলপেটের ব্যাথায় মারা যায় যখন ডারউইনের বয়স ছিল মাত্র ৮। রোগটা জেনেটিক যা মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ (Mitochondrial DNA) এর MTTL1 জিনে মিউটেশনের দ্বারা ঘটে থাকে। বর্তমান যুগে তার দেয়া ‘বিবর্তনবাদ’কে এই জিনতত্ত্ব দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, কাকতালীয় বৈকি! (চলবে…)

Leave a Reply

Your email address will not be published.