«

»

Jan ১৩

প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার প্রতীক নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংস: একটি নিরপেক্ষধর্মী বিশ্লেষণ

Photobucketবারট্রান্ড রাসেলের মতে মানুষ যেদিন পশুপাখিকে বশ মানাতে শিখল আসলে সেদিন থেকেই সে তার স্বজাতিকেও বশ মানাতে শিখল, আর তার দাস মনোবৃত্তির গোড়াপত্তন তখন থেকেই। শুধু জীবিকা নয়, আত্মরক্ষার তাগিদ, কর্তৃত্বের আকাঙ্খা, যুদ্ধের যতোসব নিয়ামক। যেকোন যুদ্ধেরই শেষ ফলাফল ধ্বংস। এজন্যই বলা হয়ে থাকে যুদ্ধে আসলে কেউ জিতে না। কিন্তু তারপরও মানুষ যুদ্ধ করে, ধ্বংস করে, ধ্বংস হয়। এসব নিয়ে ইতিহাস রচনা হয়, আর তাতে বিজেতাই থাকে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ভিলেন। তবে ব্যতিক্রমও হয়! ইতিহাসবিদ তার বুদ্ধি, প্রজ্ঞা ও দৃষ্টির সীমাকে সবসময় অতিক্রম করতে পারে না। ফলে তার বর্ণনাকৃত কাহিনী অনেক সময় শুদ্ধতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হিমশিম খায়। তবে ইতিহাসের বর্ণনা একজায়গায় থেমেও থাকে না। বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের সুবিধার্থে একে পরিমার্জন করে উপস্থাপন করে, আবার আমজনতাও অনেক সময় গোগ্রাসে গিলেও ফেলে। তথ্যের এই অবাধ প্রবাহেও যাচাই-বাছাই এর কাজটা সবসময় করা হয়ে উঠে না।নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসযজ্ঞের বর্ণনা নিয়েও যেন একধরণের ধোয়াটে ভাব লক্ষ্য করা যায়। অন্তর্জালে অনেকেই এ নিয়ে লিখছে, যার যার অবস্থান থেকে। যারা লিখছে তাদের সবাইকে সেই পরিমার্জনের দোষে দুষ্ট বলাটা হয়ত ঠিক না, হয়ত পরিস্থিতির স্বীকার! কিন্তু কিছু সুযোগ-সন্ধানীর উদ্দেশ্যকে বুঝতে হলে নালন্দার ইতিহাসের দিকে আর একটু চোখ বুলাতে হবে। সেই আর একটু অনুসন্ধান করাই এই লেখার উদ্দেশ্য।

কথিত যে বিখ্যাত মৌর্য সম্রাট অশোক খৃষ্টপূর্ব ৩০০তে নালন্দাতে প্রথম বৌদ্ধ উপাসনালয় গড়েন যা পরে বৌদ্ধ গবেষণার ভিত গড়ে, যদিও এ নিয়ে মতবিরোধ আছে। তবে এব্যাপারে বেশীরভাগ ঐতিহাসিকই একমত যে রাজা কুমারগুপ্তের সময়ে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দ্বারা মাগ্ধাতে ৪২৭ খৃষ্টাব্দে নালন্দা প্রতিষ্ঠা পায়। গুপ্ত রাজারা সবসময়ই বৌদ্ধদের প্রতি ছিলেন উদার ও এর পৃষ্ঠপোষক। গুপ্ত বংশের রাজা নরসীমাগুপ্ত একসময় রাজ্য ছেড়ে ভিক্ষুও হন।

নালন্দাকে নিয়ে গর্ব করার অনেক কিছুই ছিল। সেই সময়ে ওখানে ছিল ছাত্রহল, শ্রেণীকক্ষ, নয়নাভিরাম খাল ও আরো অনেক সুবিধাদী। ২০০০ শিক্ষক ও ১০,০০০ এর মত ছাত্র ছিল। তবে এ সংখ্যা নিয়ে মতবিরোধ আছে। সারাবিশ্ব থেকেই ছাত্ররা এখানে পড়তে আসত, তার মধ্যে ছিল কোরিয়া, জাপান, চীন, তিব্বত, ইন্দোনেশিয়া, পার্শিয়া এবং তুরস্ক। নালন্দা মূলত বৌদ্ধ ধর্মের গবেষণা ও ধর্মচর্চার জন্য নির্মিত হলেও ওখানে পড়ানো হতো হিন্দু দর্শন, বেদ, ধর্মতত্ত্ব, যুক্তিবিদ্যা, ব্যকরণ, ভাষাতত্ত্ব, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের আরো অনেক বিষয়।
Photobucket
নালন্দা বেশ কয়েকবার বহিঃশত্রুর দ্বারা আক্রমণের মুখে পড়ে। যতদূর জানা যায় সেই সংখ্যাটা মোট তিনবার। প্রথমবার স্কন্দগুপ্তের সময়ে (৪৫৫-৪৬৭ খৃষ্টাব্দে) মিহিরাকুলার নেতৃত্বে মধ্য এশিয়ার যুদ্ধবাজ হানদের দ্বারা। উল্লেখ্য মিহিরকুলার নেতৃত্ব হানরা ছিল প্রচণ্ড রকমের বৌদ্ধ-বিদ্বেষী। বৌদ্ধ ছাত্র ও ধর্মগুরুদের হত্যা করা হয় নির্মমভাবে। স্কন্দগুপ্ত ও তার পরবর্তী বংশধরেরা একে পূণর্গঠন করেন। প্রায় দেড় শতাব্দী পরে আবার ধ্বংসের মুখে পড়ে। আর তা হয় বাংলার শাসক শশাঙ্কের দ্বারা। শশাঙ্ক ছিলেন বাংলার অন্তর্গত গৌড়'র রাজা। তার রাজধানী ছিল আজকের মুর্শিদাবাদ। রাজা হর্ষবর্ধনের সাথে তার বিরোধ ও ধর্মবিশ্বাস এই ধ্বংসযজ্ঞে প্রভাব বিস্তার করে। রাজা হর্ষবধন প্রথমদিকে শৈব (শিবকে সর্বোচ্চ দেবতা মানা) ধর্মের অনুসারী হলেও বৌদ্ধ ধর্মের একজন পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হন। কথিত আছে, তিনি সেই সময়ে ধীরে ধীরে গজিয়ে উঠা ব্রাহ্মণদের বিদ্রোহও নিষ্ঠুরভাবে দমন করেছিলেন। অন্যদিকে রাজা শশাঙ্ক ছিলেন ব্রাহ্মণ্য ধর্মের একজন শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষক ও এর একান্ত অনুরাগী। উল্লেখ্য রাজা শশাঙ্কের সাথে বুদ্ধের অনুরুক্ত রাজা হর্ষবর্ধনের সবসময় শত্রুতা বিরাজমান ছিল এবং খুব বড় একটি যুদ্ধও হয়েছিল। রাজা শশাঙ্ক যখন মাগ্ধায় প্রবেশ করেন তখন বৌদ্ধদের পবিত্র স্থানগুলোকে ধ্বংস করেন, খণ্ড-বিখণ্ড করেন বুদ্ধের ‘পদচিহ্ন’কে। বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি তার বিদ্বেষ এত গভীরে যে তিনি বৌদ্ধদের ধর্মীয় স্থান ছাড়াও, বুদ্ধগয়াকে এমনভাবে ধ্বংস করেন যাতে এর আর কিছু অবশিষ্ট না থাকে । হিউয়েন সাঙ এভাবে বর্ণনা করেছেন (চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ৬২৩ সালে গুপ্ত রাজাদের শাসনামলয়ে নালন্দা ভ্রমণ করেন):

Sasanka-raja,being a believer in heresy, slandered the religion of Buddha and through envy destroyed the convents and cut down the Bodhi tree (at Buddha Gaya), digging it up to the very springs of the earth; but yet be did not get to the bottom of the roots. Then he burnt it with fire and sprinkled it with the juice of sugar-cane, desiring to destroy them entirely, and not leave a trace of it behind. Such was Sasanka's hatred towards Buddhism. [6]

হর্ষবর্ধন পরে রাজা শশাঙ্কের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করেন ও শেষপর্যন্ত বাংলার কিয়দংশ করায়ত্ত করেন। তিনি নালন্দাকে পূনর্গঠনে বিশেষভাবে ভূমিকা রাখেন।

তৃ্তীয়বার নালন্দা ধ্বংস হয় তূর্কী যোদ্ধা বখতিয়ার খিলজী দ্বারা ১১৯৩ খৃষ্টাব্দে। বখতিয়ার খিলজীর সময়ে নালন্দার অনেক ক্ষতিসাধন হয়। অনেক ভিক্ষু নিহত হন, আর যারা বেঁচে থাকেন তাদের অধিকাংশই পালিয়ে যান। ক্ষয়ীষ্ণু বৌদ্ধধর্ম খিলজীদের কাছে কোন চ্যালেঞ্জ হিসাবে আসেনি, তারপরও খিলজী নির্মমভাবে অনেক ভিক্ষুকে হত্যা ও নালন্দাকে ধ্বংস করেন!

 

(২)

বখতিয়ার খিলজির বিহার অভিযানের কাহিনী পাওয়ার একমাত্র উৎস হল ঐতিহাসিক মিনহাজ এর ‘তাব্বাকাত-ই-নাসিরি’ বই। তৎকালীন আর কোন ঐতিহাসিকের লেখায় খিলজী দ্বারা নালন্দার ধ্বংসের কাহিনী স্থান পায়নি! খুব অবাক ব্যাপার বৈ কি! নালন্দার ধ্বংসযজ্ঞের প্রতি তৎকালীন ঐতিহাসিকদের এ অবহেলা ঘটনাটিকে গুরুত্বহীন বলেই প্রতীয়মান করে। অবশ্য এর কারণও ছিল। রাজাদের মধ্যে অন্তর্কলহ, শত্রুতা, হত্যা ও উপসনালয় ধ্বংস সেসময় খুব অস্বাভাবিক কিছু একটা ছিল না। মিনহাজের ‘তাব্বাকাত-ই-নাসিরি’র মতে নালন্দাতে কোন কার্যকর সামরিক শক্তির উপস্থিতি ছিল না। চারপাশ ঘেরা প্রাচীরের অভ্যন্তরেই বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত ছিল, আর এর প্রতিরক্ষায় যেসব অস্ত্রধারী ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেছিল তাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল “মুন্ডিত-মস্তক” শ্রমন (বৌদ্ধ সন্ন্যাসী), কিন্তু খিলজীর সৈন্যরা তাদের হত্যা করেছিল ভুলবশতঃ, ব্রাহ্মণ রাজপূত মনে করে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন ৭০০ খৃষ্টাব্দের পরপরই ভারত ছোট ছোট রাজ্যে ভাগ হয়ে যায়, আর এগুলোর নেতৃত্ব ধীরে চলে যায় ব্রাহ্মণ রাজপূতদের কাছে। রাজপূতদের এই শাসনকালকে অনেক ঐতিহাসিকই ভারতবর্ষের অন্ধকার যুগ বলেই অভিহিত করেন- সতীদাহ, বর্ণপ্রথা, অন্যান্য ধর্ম বিশেষ করে বৌদ্ধদের প্রতি নির্মম অত্যাচার ইত্যাদির যথেচ্ছাচার প্রয়োগের কারণে। খিলজীদের ভারত আক্রমণে এই রাজপূতরাই প্রতিরোধের ভূমিকা নেয়। আর ভারতবর্ষের সমাজ, সংস্কৃতি সম্পর্কে তূর্কী খিলজীদের অজ্ঞতা নিরপরাধ ভিক্ষু হত্যার মধ্য দিয়ে শেষ হয়। খিলজীরা আরেকটা ভুল করেছিল, তা হল, তারা ভেবেছিল চারপাশ দিয়ে ঘেরা নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় একটি দূর্গ।

নালন্দার লাইব্রেরীটির ধ্বংস সভ্যতার জন্য ক্ষতিই বলতে হবে। তবে, পৃথিবীর ইতিহাসে লাইব্রেরী ধ্বংসের দিক থেকে নালন্দা প্রথম বা একমাত্র নয়। খৃষ্টের জন্মের আগে আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরী ধবংস হয় বিখ্যাত রোমান সম্রাট জুলিয়াস সীজার দ্বারা, মোঙ্গল দখলদারদের দ্বারা ধবংস হয় বাগদাদের বিখ্যাত সেই লাইব্রেরী ‘হাউস অব উইসডম’। মধ্যযুগে অন্ধকার ইউরোপে আলোকবর্তীতা হয়ে থাকা গ্রানাডার বিখ্যাত লাইব্রেরীটি ধ্বংস হয় কার্ডিন্যাল সিসনেরস এর নেতৃত্বাধীন স্প্যানিশ খৃষ্টান বাহিনী দ্বারা। এর বাইরেও আছে আরো অনেক উদাহরণ।

তবে নালন্দা পুরোপুরি ধ্বংস করা হয় বলে যে দাবী করা হয় তা সঠিক নয়, নালন্দার একটি বড় অংশকে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। কারণ ১২৩৪ সালে তিব্বতীয় ভিক্ষু ধর্মাসভামিন নালন্দাতে যখন ভ্রমণ করেন তখন সেখানে কিছু পণ্ডিত ও ভিক্ষু মহাপাণ্ডিত রাহুলাস্রিভাদ্রার তত্ত্বাবধানে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। পনেরশ শতকের দিকে এটি প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। প্রথম দুইবার নালন্দাকে পুনরুদ্ধার করলেও তৃতীয়বার আর তাকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কারণ গুপ্ত বা পাল রাজাদের মতো সেইরকম আর কোন শাসক অবশিষ্ট ছিল না যারা বিশ্ববিদ্যালয়টিকে আবার পুনর্গঠন করবেন। তাছাড়া ছিল বর্ণহিন্দু (ব্রাহ্মণ) ও তাদের পৃষ্ঠপোষক রাজাদের বৌদ্ধদের প্রতি নির্মম অত্যাচার ও এর ফলে ভারতবর্ষ থেকে তাদের ব্যাপক হারে দেশত্যাগ।

নালন্দার অধঃপতনে আরেকটি কারণ হল এর আমলাতান্ত্রিকতা, দূর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা। ভারতীয় পার্লামেন্টের সংসদ শশী থারুর হিন্দু অনলাইনে লেখা তার আর্টিকলে সে সময়ের বাস্তব চিত্রই এঁকেছেন:

This time there was to be no reconstruction: not only were there no equivalent of the Gupta kings or Harsha to rebuild it, but the university had already been decayed from within by the cancer of corruption on the part of its administrators and by declining enthusiasm for Buddhist-led learning. If we are to rebuild it 800 years later, we will need not just money but the will to excellence, not just a physical plant but a determined spirit.

রাজাদের আনুকূল্যের অভাব, ব্রাহ্মণদের অত্যাচার, দূর্নীতি, আমলাতান্ত্রিকতা ও অব্যবস্থাপনা সব মিলিয়ে মোটামুটি একটা খুব প্রতিকূল পরিবেশে ছিল বৌদ্ধরা। তাছাড়া বৌদ্ধরা জ্ঞানার্জনের পরিবর্তে ধীরে ধীরে তান্ত্রিকতার দিকে ঝুঁকে পড়তে থাকে। রাজনীতি থেকে দূরে থাকায়, তাদের রাজনৈতিক জ্ঞান ছিল খুব কম। ফলে পরিবর্তিত পরিস্থিতীতে নিজেদের রক্ষা করতে তারা অক্ষম হয়ে পড়ে। হিন্দুদের মতো তাদের কোন যোদ্ধাদল ছিল না, ফলে শাসকশ্রেণীর কাছে তারা তাদের গুরুত্ব ধীরে ধীরে হারাতে থাকে। আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্যণীয়, নালন্দার আশেপাশের বাসিন্দারাও বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিল না। কিন্তু এর খরচ বহন করা হত আশেপাশের জনগণের খাজনা দ্বারা। যেমন, রাজা হর্ষবর্ধন সে সময়ে ১০০ গ্রাম থেকে যে খাজনা পেতেন তা নালন্দাতে দান করতেন। ফলে সাধারণ অধিবাসীদের এই নালন্দা থেকে উপকৃত হবারও কোন উপায় ছিল না।

হরপ্পান সভ্যতার সময় থেকেই খৃষ্টপূর্ব ২৫০০ সাল থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সূচনা হয়। তবে খৃষ্টপূর্ব ৬০০ সাল থেকেই এর প্রসার ঘটতে থাকে বিশেষত ময়ূরা সাম্রাজ্যের সময় থেকেই। পশ্চিম ও দূরপ্রাচ্য থেকে ব্যাবসার নিমিত্তে বিভিন্ন দল আসতে থাকে। রোমান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার পর খৃষ্টপূর্ব ৩১ সাল থেকে ভারত ও রোমের মাঝে ব্যবসার প্রসার ঘটে ব্যাপকভাবে। পৌত্তলিক আরবদের সাথে ভারতবর্ষের ব্যবসায়ীক যোগাযোগ ছিল বলে জানা যায়। আরবদের সাথে ব্যবসার প্রসার ঘটে মূলত নৌপথে। ইসলাম পরবর্তী সময়েও আরবদের সাথে ভারতবর্ষের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের কথা জানা যায়। তবে আরবদের দ্বারা ভারতবর্ষে প্রথম অভিযান চালনা করা হয় সিন্ধে। রাজা দাহির মুসলিম মহিলা ও শিশুকে বন্দী করেন, যাদেরকে ছাড়ানোর অনুরোধ উপেক্ষা করায় মুহম্মদ বিন কাশিম রাজা দাহিরের বিরুদ্ধে অভিযান চালান, তাকে পরাজিত ও নিহত করেন (৭১১-৭১২ খৃষ্টাব্দ)। দাহিরের মৃত্যুর পর তার বউ রাণী লাদীকে বিয়েও করেন। এরপর প্রথমবারের মতো সিন্ধ উমাইয়াদ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হয়। আরব মুসলিমরা সিন্ধ দখল করার পর সে অঞ্চলে ইসলামেরও ব্যাপক প্রসার ঘটে। আরব মুসলিমদের অভিযানের পরও ১০০০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিকই ছিল। তবে ১০০০ সালের পর যাযাবর তূর্ক-আফগানদের ভারতবর্ষ আক্রমণের সাথে সাথে পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। আরবদের সাথে তুলনা করলে তূর্ক-আফগানদের ভারতবর্ষ আক্রমণ তুলনামূলকভাবে আক্রমণাত্নক বলেই মনে হবে। আরবরা যেখানে স্থানীয়দের প্রতি সহাবস্থান ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছে, সেখানে তূর্ক-আফগানরা ছিল ব্যতিক্রম।

আরবরা ইরানের সাসানিয়ানদের পরাজিত করার পর মধ্য এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। মোঙ্গল ও অন্যান্য বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে ইসলামী সাম্রাজ্যকে নিরাপত্তা দিতে তারা মধ্য এশিয়ার স্থানীয় অধিবাসীদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেয়। নতুন এই ধর্মান্তরিত যোদ্ধারাই পরে ইসলামী সাম্রাজ্যকে আরো পূর্বে প্রসারিত করতে ভূমিকা রাখে। এমনই একজন তূর্ক আফগান সম্রাট হলেন গজনীর মাহমুদ। তিনি ভারতীয়দের বিশাল সেনাবাহিনীর বিপক্ষে ঝটিকা আক্রমণ বেশী চালাতেন। তিনি রাজপূতদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযান পরিচালনা করেন যার প্রধান লক্ষ্য ছিল তার নিজের সাম্রাজ্যকে সুরক্ষা করা। তার শাসনামলে রাজ্যবিস্তারের প্রতি সামান্যই আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়, আর ধর্মবিস্তারকে উপলক্ষ্য ধরাটা যৌক্তিক মনে না হওয়াটাই স্বাভাবিক হবে। অবশ্য পরে গজনীর আরেক শাসক মাহমুদ ঘোরী তার রাজ্যের সীমানা বাড়াতে মনস্থ করেন ও পৃথ্বীরাজের রাজপূত সাম্রাজ্যকে পরাজিত করেন। বখতিয়ার খিলজী ছিলেন সম্রাট মাহমুদ ঘোরীর একজন সেনাপতি।

ইসলামে ধর্মান্তরিত করার ব্যাপারে মুসলিমরা অগ্রগামী হওয়া সত্ত্বেও সেসময় ভারতে ধর্মান্তরিত হওয়া প্রায় সবই সিন্ধ এর, যার শাসক ছিল আরব মুসলিম। প্রথম দিকে তুর্ক-আফগানরা ধর্মান্তরিতকরণে কোন ভূমিকা রেখেছেন বলে জানা যায় না। তুর্ক-আফগানরা ইসলাম গ্রহণ করলেও নতুন এই ধর্মের ব্যাপারে তাদের বোঝার ক্ষমতা প্রথমদিকে ছিল সীমিত। আরবরা ধর্মীয় কারণে তুলনামূলকভাবে ছিল বেশী ন্যায়পরায়ণ, তাছাড়া ব্যবসায়িক যোগাযোগের কারণে এ উপমহাদেশের সংস্কৃতির প্রতি ছিল শ্রদ্ধাশীল ও এক ধরণের সহাবস্থানের নীতি অনুসরণ করতো। সেখানে তূর্ক-আফগানরা ছিল তুলনামূলকভাবে উদ্ধত ও ধ্বংসাত্নক। অবশ্য প্রথম দিকের এই বৈরী দৃষ্টিভংগী তারা অনেকটাই ধীরে ধীরে পরিবর্তন করে ফেলে।

উপসংহারঃ

নালন্দার ধ্বংস হয় সর্বোমোট তিনবার, এর মধ্যে প্রথমবার মধ্য এশিয়ার যুদ্ধবাজ হানদের দ্বারা, দ্বিতীয়বার ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অনুসারী বাংলার শাসক শশাঙ্ক দ্বারা ও শেষবার তূর্কীযোদ্ধা বখতিয়ার খিলজী দ্বারা। নালন্দাকে প্রথম দুইবার ধ্বংসস্তুপ থেকে দাঁড় করানো গেলেও তৃতীয়বার সম্ভব হয়নি গুপ্ত ও পাল রাজাদের মতো পৃষ্ঠপোষক না থাকায়। দূর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, বর্ণহিন্দু ব্রাহ্মণদের অত্যাচারের ফলে ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধদের ব্যাপকহারে দেশত্যাগ ও বৌদ্ধদের জ্ঞানার্জনের চেয়ে তান্ত্রিকতার প্রসারও এর জন্য দায়ী। তূর্কী সেনাপতি খিলজী ভারতবর্ষ আক্রমণের কারণ রাজ্য জয়, ধর্ম নয় এবং প্রথম দিকে ধর্মের প্রসারে তারা কোন ভূমিকাই রাখেনি। তাছাড়া, তূর্ক-আফগানরা যে কেবল হিন্দুদের সাথে যুদ্ধ করেছে তাই না, সে একই রকম ব্যবহার করেছে অন্যান্য মুসলিম শাসকদের সাথেও। খিলজীর নালন্দা আক্রমণের লক্ষ্য প্রতিরোধকারী ব্রাহ্মণ রাজপূতেরা, ক্ষয়িষ্ণু বৌদ্ধ ধর্মের ভিক্ষুরা নয়। কিন্তু খিলজী দূর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের অনেককেই নির্মমভাবে হত্যা করেন ভুলবশতঃ, ব্রাহ্মণ মনে করে। মিনহাজের ‘তাব্বাকাত-ই-নাসিরি’ ছাড়া, প্রথম দিকের তূর্ক-আফগানদের এই অভিযানকে সমালোচনা করে লেখা ভারতীয়দের ইতিহাসে পাওয়া যায় না। কারণ সেসময়ে হিন্দুদের নিজেদের বিভিন্ন গোত্র ও রাজাদের মধ্যে বিবাদেও হত্যা ও মন্দির ধ্বংস ছিল স্বাভাবিক ঘটনা, যেখানে খিলজীর নালন্দা ধ্বংস আলাদা গুরুত্ব বহন করেনি।

শেষ কথাঃ

মজার ব্যাপার হল তৎকালীন ভারতীয় ইতিহাসবিদদের কাছে নালন্দার ধ্বংস বিশেষ কোন গুরুত্ব বহন না করলেও এখন তারা পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে শেষ করে যাচ্ছে। এদের সাথে যুক্ত হয়েছে নাস্তিকতার ভেক ধরে থাকা কিছু বর্ণহিন্দু ও মস্তক বিক্রি করে দেয়া কিছু মুসলিম নামধারী সুশীল। আর এর কল্যাণেই ব্লগে ব্লগে চলছে বিদ্বেষের বিষ। আজ যেন তাদের সব দরদ নালন্দা ও সেই সাথে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের প্রতি। ফলাও করেই তারা প্রচার করে থাকে নালন্দার ধ্বংস মানেই বখতিয়ার খিলজী নামের এক মুসলিম সেনাপতি, কিন্তু বেমালুম চেপে যায়, প্রথম দুইবারের ধ্বংসের কথা, যাদের মধ্যে একজন বাঙলার বর্ণবাদী ব্রাহ্মণ্য ধর্মের শাসক রাজা শশাঙ্ক। তারা চেপে যায়, সপ্তম শতাব্দী থেকে ব্রাহ্মণ রাজপূতদের ক্ষমতায় আসার পর বৌদ্ধদের প্রতি অবর্ণনীয় অত্যাচারের ফলে তাদের ঢালাওভাবে দেশত্যাগের কথা।

সূত্রঃ
[১] India Condensed, 5000 Years of History & Culture, Anjana Motihar Chandra
[২] Education in Ancient India, Scharfe, Hartmut; Publisher: Brill Academic Publishers
[৩] India: The Ancient Past, A history of the Indian sub-continent from 7000 BC to 1200 AD
[৪] Glimpses of World History: Jawaharlal Nehru, Oxford University Press
[৫] ভারতে মুসলিম শাসনের বুনিয়াদ; মূলঃ এবিএম হাবিবুল্লাহ, ভাষান্তরঃ লতিফুর রহমান, বাংলা একাডেমী ঢাকা,
[৬] http://www.ehow.com/about_5272488_history-nalanda-university.html
[৭] http://www.berzinarchives.com/web/en/archives/e- books/unpublished_manuscripts/historical_interaction/pt3/history_cultures_20.html
[৮] http://ccbs.ntu.edu.tw/FULLTEXT/JR-ENG/heras.htm
[৯] http://en.wikipedia.org/wiki/List_of_destroyed_libraries,_archives_and_museums
[১০] বাংলাপিডিয়া
[১১] http://tharoor.in/articles/reconstructing-nalanda
[১২] http://www.hindu.com/thehindu/mag/2002/01/20/stories/2002012000510800.htm
[১৩] http://www.nytimes.com/2006/12/09/opinion/09garten.html?pagewanted=all
[১৪] http://www.hinduonnet.com/mag/2006/12/24/stories/2006122400060300.htm

৪২ comments

১ ping

Skip to comment form

  1. 22
    হাসান

    নালন্দার সাথে বখতিয়ারের কোনো সম্পর্ক নেই। তাবাকাত ই নাসিরি তে যে বিহারের কথা আছে তা উদয়পুর বিহার।এখানে পড়ুন http://www.muldharabd.com/?p=698

  2. 21
    এম_আহমদ

    বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, ‘যত দোষ নন্দ ঘোষ’। এক শ্রেণীর ইসলাম বিদ্বেষী হিন্দুরা ভারতে মুসলিম শাসন ও ভারতে মুসলিমদের উপস্থিতিকে অত্যন্ত নোংরা দৃষ্টিতে দেখে। এদেশের সাহিত্য সংস্কৃতিতে এদের প্রভাব ও রাজনৈতিক কৌশলী কর্মকাণ্ডের ফলে   এক শ্রেণীর মুসলিম নামধারীও তাদের ভাষা মুখস্থ করেছেন। মুসলিমরা মন্দির ভেঙ্গেছে, নারী ধর্ষণ করেছে, মুসলিমরা বিদেশি ইত্যাদি এদের মুখস্থ প্রোপাগান্ডা।

    আজ একটি লেখা  নজরে পড়ল তাই এটি এখানে লিঙ্ক করছি। লেখাটি কোন মুসলমানের নয় তাই কিছু পাঠক এতে সহজে নিরপেক্ষতা আশা করতে পারেন।

    লিঙ্ক: হিন্দু রাজাদের হাতে ভারতের মন্দির ধ্বংসের অজানা ইতিহাস

    Pinaki Bhattacharya·Sunday, 24 April 2016

     

    এই ব্লগে আমার আরও দুটি মন্তব্য রয়েছে কেউ চাইলে দেখে নিতে পারেন।

    বৌদ্ধ পণ্ডিতদের কলহ ও লক্ষণ সেনের চক্রান্তে বৌদ্ধ বিহারে আক্রমণ

    বখতিয়ারের সৈন্যদলে ‘double agent’ রাও ছিল।

  3. 20
    Rafi

    অসাধারন!

  4. 19
    শাফিউর রহমান ফারাবী

    অনেক অনেক ভাল হয়েছে লেখাটা। নালন্দা যে আগে আরো ২ বার ধ্বংস হয়েছে এটা আমি আজ প্রথম জানলাম। 

  5. 18
    শামস

    নিউজটা দেখেছি। পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

  6. 17
    Ovi Majumder

    আজকে প্রথম আলো ফ্রন্ট পেজে ‘৮০০ বছর পর আবার খুলছে নালন্দা’ নিউসটা দেখে আপনার লেখাটা পড়লাম ।ভালো লাগলো

  7. 16
    সরোয়ার

    নালন্দার ধ্বংস হয় সর্বোমোট তিনবার, এর মধ্যে প্রথমবার মধ্য এশিয়ার যুদ্ধবাজ হানদের দ্বারা, দ্বিতীয়বার ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অনুসারী বাংলার শাসক শশাঙ্ক দ্বারা ও শেষবার তূর্কীযোদ্ধা বখতিয়ার খিলজী দ্বারা।

    নালন্দাকে প্রথম দুইবার ধ্বংসস্তুপ থেকে দাঁড় করানো গেলেও তৃতীয়বার সম্ভব হয়নি গুপ্ত ও পাল রাজাদের মতো পৃষ্ঠপোষক না থাকায়। দূর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, বর্ণহিন্দু ব্রাহ্মণদের অত্যাচারের ফলে ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধদের ব্যাপকহারে দেশত্যাগ ও বৌদ্ধদের জ্ঞানার্জনের চেয়ে তান্ত্রিকতার প্রসারও এর জন্য দায়ী।

    তূর্কী সেনাপতি খিলজী ভারতবর্ষ আক্রমণের কারণ রাজ্য জয়, ধর্ম নয় এবং প্রথম দিকে ধর্মের প্রসারে তারা কোন ভূমিকাই রাখেনি। তাছাড়া, তূর্ক-আফগানরা যে কেবল হিন্দুদের সাথে যুদ্ধ করেছে তাই না, সে একই রকম ব্যবহার করেছে অন্যান্য মুসলিম শাসকদের সাথেও।

    ইতিহাসের এই অংশটি সম্পর্কে আমার তেমন কোন ধারণা ছিল না। আমাদের অজ্ঞতা ও ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে সবকিছুকে ইসলামের উপর চাপিয়ে দেয়া মুক্তমনাদের মজ্জাগত অভ্যাস।  আপনার এই নিরপেক্ষধর্মী লেখাটি অত্যন্ত তথ্যপূর্ণ, যা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। হাটস অফ শামস সাহেবকে।   

    1. 16.1
      শামস

      @সরোয়ার,
      আপনার অনুপ্রেরণার জন্য ধন্যবাদ।
       

  8. 15
    এস. এম. রায়হান

    বখতিয়ার খিলজির বিহার অভিযানের কাহিনী পাওয়ার একমাত্র উৎস হল ঐতিহাসিক মিনহাজ এর তাব্বাকাত-ই-নাসিরি বই। তৎকালীন আর কোন ঐতিহাসিকের লেখায় খিলজী দ্বারা নালন্দার ধ্বংসের কাহিনী স্থান পায়নি! খুব অবাক ব্যাপার বৈ কি! নালন্দার ধ্বংসযজ্ঞের প্রতি তৎকালীন ঐতিহাসিকদের এ অবহেলা ঘটনাটিকে গুরুত্বহীন বলেই প্রতীয়মান করে।

    এমনও তো হতে পারে এই বইটির নামে যা বলা হচ্ছে তাও এই বইয়ে নেই! কিংবা থাকলেও ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রচার করা হচ্ছে। এটি যাচাই করার উপায় কী। এটি খুবই অবাক করা ব্যাপার যে একজন বিদেশি এই ঘটনা প্রত্যক্ষ (?) করেছে অথচ ভারতবর্ষের কেউই তা প্রত্যক্ষ করেনি!

    1. 15.1
      শামস

      @এস.এম.রায়হান,

      এমনও তো হতে পারে এই বইটির নামে যা বলা হচ্ছে তাও এই বইয়ে নেই! কিংবা থাকলেও ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রচার করা হচ্ছে। এটি যাচাই করার উপায় কী। এটি খুবই অবাক করা ব্যাপার যে একজন বিদেশি এই ঘটনা প্রত্যক্ষ (?) করেছে অথচ ভারতবর্ষের কেউই তা প্রত্যক্ষ করেনি!

      গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন! 'তাব্বাকাত-ই-নাসিরী'র লেখক মিনহাজ পার্সীয়ান, আর তার বর্ণনা প্রত্যক্ষ্যদর্শীদের উপর ভিত্তি করে কিনা সেটাও একটা প্রশ্ন! যা ঘটে তা কিছু না কিছু বটে। খিলজীদের ধ্বংসের দায় থেকে কেউ মুক্তি দিচ্ছে না, এখানেও সে চেষ্টা করা হয়নি। কিন্তু খিলজীরা বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ থেকে যে ধ্বংস করেনি সেটা স্পষ্ট। তাদের শত্রু ছিল রাজপূত ব্রান্মণরা। আর নালন্দার পুরোপুরি নিঃশেষ হবার জন্য খিলজী ছাড়াও আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল। তাছাড়া, খিলজী যদি নালন্দার প্রতি বিদ্বেষ থেকেই তাকে ধ্বংস করত তাহলে তাদের বিজিত দেশে নালন্দা আর ফাংশনাল থাকত না। কিন্তু দেখা যায় নালন্দা তারপরও ফাংশনাল ছিল। খিলজীর ধ্বংসের প্রায় তিনশো বছর পরে এটি পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে, যার বেশকয়েকটি কারণও বলা হয়েছে।

      ধন্যবাদ।

  9. 14
    ইবনে বতুতা

    আমাদের ভারতবাসীদের দূর্ভাগ্য যে আমাদের মধ্যযুগে মুসলিম ইতিহাসবিদদের রচনাগুলো তা আরবি ভাষায় হোক বা ফারসি ভাষায় লেখা হয়েছিল সেগুলো আমরা নিজেরা অনুবাদ করতে পারিনাই। আমরা যে সব রেফারেন্স দেই এবং যাদের রেফারেন্স নিয়ে ইতিহাস চর্চা জারী রেখেছি তা সব ইউরোপীয়দের অনুবাদ করা। ঐ সব বিজয়ী ইউরোপীয়রা ভালবেসে জ্ঞান চর্চার নেক মকসুদে তা অনুবাদ করে নাই। তারা ফাঁক-ফোকর খুঁজতে চেয়েছেন কেমন করে ইসলাম এবং মুসলিমদেরকে হেয় করা যায়। আর তা করতে গিয়ে এই সব ঘাটাঘাটি করেছিল। আর অনুবাদের সময় তিলকে তাল করেছে মনের মাধুরী মিশিয়ে। তাবকাতে নাসিরীতে তা যে হয় নাই কেমন করে বলা যাবে?

    এই যুগের নব্য ইতিহাসবিদরাও তার চর্চা জারী রেখেছেন, তাদের পছন্দের ব্যক্তিকে মহাপুরুষ এবং অপছন্দের ব্যক্তিকে মহা অসুর বানাতে যার যার মন মত ইতিহাস টেম্পারিং করে আসছেন।

    কাজেই মতলববাজ ইতিহাসবিদরা তাদের মত করে ইতিহাস অনুবাদ করে। সাধারণ বুঝেই আসে নালান্দা বিদ্যালয় যদি সাধারণ বিদ্যালয় হত তাহলে এত টাকা খরচ করে সেখানে দূর্গ প্রাচীর তৈরির কোন দরকার ছিলনা। ভারতের ইতিহাসে পাই যে বর্ণবাদী শাসকশ্রেণী সাধারণ মানুষ ও বিদেশী শক্তির চোখকে ধোঁকা দেবার জন্য মন্দিরকে রত্ন ভাণ্ডার অস্ত্র ভাণ্ডার হিসাবে ব্যবহার করে এসেছে। কাজেই কায়েমি স্বার্থ ভেঙ্গে দিতে কিংবা প্রতিরক্ষার কারণে ঐ সব মন্দিরে কোন কোন মুসলিম শাসককে আক্রমণ করতে হয়েছিল।

    হযরত উমারের বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা অভিযোগ আছে যে, তার আদেশে আমর ইবনুল আস আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরীর লাখ লাখ বই আগুন লাগিয়ে ধ্বংস করেন। এই কাহিনীটি সঠিক নয়। কারণ আমর আলেকজান্দ্রিয়া ৬৪২ খৃঃ দখল করেন। তখন ঐ সময়ের পূর্বে লাইব্রেরীটির অস্তিত্বই ছিলনা। এর আগেই অন্যরা তা ধ্বংস করে দিয়েছিল। (দেখুন- Mackensen ও Ruth Stelhhom এর লেখা)। এ নিয়ে মিঃ গীবন বলেছেন-

    আরবরা বিধর্মীদের গ্রন্থাদি নষ্ট করা পছন্দ করতেন না। তাদের ধর্মীয় নীতি এটা সমর্থন করেনা। (গ্রন্থাগারের ইতিহাস-মধ্যযুগ শামসুল হক)

    এই প্রসঙ্গে মিঃ হিট্টি বলেন-

    ওটা কিংবদন্তি হতে পারে তবে ইতিহাস হিসাবে বর্জনযোগ্য। (History of the Arab)

    1. 14.1
      শামস

      @ইবনে বতুতা,

      হযরত উমারের বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা অভিযোগ আছে যে, তার আদেশে আমর ইবনুল আস আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরীর লাখ লাখ বই আগুন লাগিয়ে ধ্বংস করেন। এই কাহিনীটি সঠিক নয়। কারণ আমর আলেকজান্দ্রিয়া ৬৪২ খৃঃ দখল করেন। তখন ঐ সময়ের পূর্বে লাইব্রেরীটির অস্থিত্বই ছিলনা। এর আগেই অন্যরা তা ধ্বংস করে দিয়েছিল। (দেখুন Mackensen ও Ruth Stelhhom এর লেখা) । এই নিয়ে মিঃ গীবন বলেছেন- ‘আরবরা বিধর্মীদের গ্রন্থাদি নষ্ট করা পছন্দ করতেন না। তাদের ধর্মীয় নীতি এটা সমর্থন করেনা’। (গ্রন্থগারের ইতিহাস-মধ্যযুগ শামসুল হক)

      এ নিয়ে কি একটা লেখা দেয়া যায়?

       

    2. 14.2
      শামস

      @ইবনে বতুতা,

      ভারতের ইতিহাসে পাই যে বর্ন বাদি শাসক শ্রেণী সাধারণ মানুষ ও বিদেশী শক্তির চোখকে ধোকা দেবার জন্য মন্দিরকে রত্ন ভান্ডার অস্ত্র ভান্ডার হিসাবে ব্যবহার করে এসেছে। কাজেই কায়েমি স্বার্থ ভেংগে দিতে কিংবা প্রতিরক্ষার কারণে ঐ সব মন্দিরে কোন কোন মুসলিম শাসককে আক্রমণ করতে হয়েছিল।

      তাই মন্দির ধ্বংসের ঘটনাটা ছিল খুব স্বাভাবিক। হিন্দু রাজারাও একে অপরের মন্দির ধ্বংস ও লুট করত।  অথচ এখন, ঐসব মন্দির ধ্বংসের জন্য ইসলাম-বিদ্বেষীরা ঢালাওভাবে মুসলিমদের দায়ী করে থাকে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ঐসব মুসলিম-বিদ্বেষী লেখালেখির জন্য অঢেল টাকাও ঢালা হয়। তাই হয়ত নেটে মুসলিমদের দায়ী করে এসব লেখালেখির প্রাচূর্য!

  10. 13
    কিংশুক

    আপনার লেখাটা খুব কাজে আসলো। অনেক কিছু পরিস্কার হলো। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস ইসলামবিদ্ধেষীদের খুবই প্রিয় বিষয়। বাংলার ব্লগগুলোতে যেমন এটার প্রয়োগ দেখা যায় তেমনি মুক্তমনার এইসব চরম ইসলামবিদ্ধেসী-বর্নহিন্দু  সুজিত দাস গং অষ্ট্রেলিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা ভিত্তিক বিভিন্ন ইসলাম বিরোধী সাইটেও মুখরোচক ভাবে এসব পরিবেশন করে এর বিপরীতে হিন্দু রাজাদের দেবতাতুল্য রিষি সাজিয়ে নিজেদের ধর্মের প্রসার ঘটাতে চেষ্টা করছে । অথচ ইসলামের প্রথম শতাব্দি হতে বিংশ শতক পর্যন্ত উমাইয়া, আব্বাসিয়া, ফাতিমিদ, মাশরিক, মাগরিব, অটোমান ফিলাফতের অধীন উপমহাদেশসহ আফ্রিকা, ইউরোপের অনেক দেশ শাসিত হবার পরও ইউরোপে কত ভাগ অমুসলিম রয়েছে কিংবা ভারতে, আফ্রিকায় কতভাগ অমুসলিম রয়েছে তা তাদের বিশ্লেষনের বাইরে থাকে।

    তথ্যপূর্ন লেখার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি এবং যারা "কানাকে হাইকোর্ট" দেখানোর মতো করে ইসলামের ইতিহাসকে বিকৃত করে  এবং এর বিপরীতে অন্যান ধর্ম / মতবাদের অন্ধকার অধ্যায়সমূহ গোপন রেখে নিজেদের মনের মতো করে সাজিয়ে  পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে দিয়ে ঘৃনাবাদের প্রসার ঘটাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে আপনার লেখনী অব্যাহত থাকুক এই কামনা করছি।

    1. 13.1
      শামস

      @কিংশুক,
      আপনার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। দুইনম্বর মুক্তমনারা মুসলিমদের পক্ষে কিছু যাবে আর সত্য কথা বলবে এতটা আশা করা ঠিক না। আমু ও মুক্তমনা দুই সাইটেই লেখাটি পড়ি। যেহেতু কোন মুক্তমনা লেখছে, ধরেই নিয়েছি ওখানে মুসলিমদের হেয় করা হবে এবং তথ্য অপূর্ণ ও টুইস্টে ভরা থাকবে। তবে যখন আমুতে একজন লেখাটি দিল ও সেও ঐ বিদ্বেষ দ্বারা প্রভাবিত তখন সত্যিই খারাপ লাগল। আমুর লেখককে আমার ইসলাম-বিদ্বেষী মনে হয় নাই, জাস্ট পরিস্থিতির স্বীকার। কারণ তথ্যের উৎস ঘুরে ফিরে প্রায় একই থাকছে, কেউ আর একটু গভীরে যাবার চেষ্টা করছে না। আমুর লেখাকে কেন্দ্র করে ইসলাম-বিদ্বেষীদের সাথে সাথে আরো কিছু বিভ্রান্ত লোকও (যাদের আমি মুসলিম-বিদ্বেষী মনে করি না) তাকে সমর্থন করছে। কিন্তু সময় সুযোগ হয়নি, আর তাছাড়া বেশ কিছু বই পড়ার দরকার ছিল। তবে দেরিতে হলেও দিতে পারলাম, ভাল লাগছে।
      ভবিষ্যতে নালন্দা নিয়ে লেখায় এখান থেকে কিছু সাহায্য পেতে পারেন। আর কেউ যদি আরো তথ্য দ্বারা একে সমৃদ্ধ করতে পারেন তার জন্য শুভকামনা রইল।

  11. 12
    ফুয়াদ দীনহীন

    দরকারী একটি বিষয় নিয়ে হাত দিয়েছেন, যারা কমেন্ট করেছেন, তাদের কমেন্ট ধরে রাখার মত| রেফারেন্সের ভার হয়েছে কিন্তু এধরনের লেখার রেফারেন্স অনেক প্রয়োজনীয়|

    যারা কমেন্ট করেছেন তাদের আইডিয়া গুলিকে কিভাবে ধরে রাখা যায় সেই চিন্তা করছি. আশা করি আপনার পরবর্তী লেখায় যতদূর সম্ভব সকল তত্ত্ব ক্লিয়ার করবেন|
    ভাল লিখেছেন| লেখায় ৫ তারা|
     
    yes   yes

    1. 12.1
      শামস

      @ফুয়াদ,
      মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।
       

  12. 11
    এস. এম. রায়হান

    মিহিরকুলা সম্পর্কে এই সূত্রে লিখা আছে-

    The latter's king Mihirakula, whose capital seems  to have  been  somewhere  in  Malwa, issued a decree  during Narasimha  Gupta's  reign, by which he declared  his purpose  "to destroy all the (Buddhist) priests through the five Indies, to overthrow the law of Buddha, and leave nothing remaining."

    বর্ণ হিন্দুরা না হয় চেপে গেল কিন্তু বৌদ্ধরাও এই তথ্য উইকিতে চেপে গেছে!

    1. 11.1
      শামস

      @এস. এম. রায়হান,

      বর্ণ হিন্দুরা না হয় চেপে গেল কিন্তু বৌদ্ধরাও এই তথ্য উইকিতে চেপে গেছে!

      মনে হয় বৌদ্ধদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। তারা এসবে কম এক্টিভ বলে মনে হয়, বিশেষত প্রপাগান্ডায়।

      1. 11.1.1
        এস. এম. রায়হান

        এটা ঠিক যে বৌদ্ধরা বর্ণ হিন্দুদের মতো নয় তথাপি তাদের মধ্যেও মিনমিনে প্রপাগান্ডিস্ট আছে। অন্য একটি ব্লগে বুদ্ধের অহিংসা বাণী ও যুদ্ধ প্রসঙ্গে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে ইসলামের নবীকে টেনে নিয়ে এসে এক বৌদ্ধ কী বলে দেখুন-

        বুদ্ধের অহিংসা বাণী যুদ্ধ রোধ করার জন্যে নাকি যুদ্ধ বাধানোর জন্যে সেটা এখানে বোধয় প্রাসঙ্গিক নয়। বুদ্ধের শিক্ষা হলো সব সময় যুদ্ধের বিপক্ষে। প্রাণী (মানুষসহ) হত্যার বিপক্ষে। তারপরও ইতিহাসে অনেক যুদ্ধের ইতিহাস আছে। তবে বৌদ্ধ হিসেবে বুক ফুলিয়ে বলতে পারি, সিদ্ধার্থ গৌতম ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হযরত মুহাম্মদের মত কোন যুদ্ধে নেতৃত্ব দেননি।

        যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে এরকম কাউকে সে এই উপমহাদেশে খুঁজে পায়নি! তালে কিন্তু ঠিক আছে। সে কী বুঝাতে চেয়েছে বুঝতেই পারছেন। যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া খারাপ কিছু! বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে মনে হয় খুব খারাপ কাজ করেছেন! তার মাথায় এতটুকু ঘিলু নাই যে মানব জাতির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত একেবারে হাতে গোনা কিছু মানুষ যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, বাদবাকী সবাই যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়নি বা যুদ্ধও করেনি। তাহলে বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ যারা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়নি তাদের সাথে বুদ্ধের পার্থক্য কোথায়! বুদ্ধকে এখানে আলাদাভাবে দেখা হচ্ছে কেন!

  13. 10
    শামস

    নালন্দায় আরো দুইবার হামলার কথা আমার দেয়া এই সূত্রতে পাবেনঃ

    http://ccbs.ntu.edu.tw/FULLTEXT/JR-ENG/heras.htm

    আর মিহিরকুলার ধর্মবিশ্বাস নিয়ে মিশ্র ধারণা পেলাম। কোন কোন ঐতিহাসিকদের মতে সে হিন্দু আবার অনেকের মতে সে মূর্তিপূজক প্যাগান। আমার তাকে প্যাগান বলেই মনে হয়েছে, কারণ সে সময়ে মধ্য এশিয়ায় এরকম প্যাগান ছিল। উল্লেখ্য মধ্য এশিয়া থেকে আসা চেঙ্গিস খান ও তার ট্রাইবরাও প্যাগান।

  14. 9
    এস. এম. রায়হান

    আপনার লেখা থেকে জানা যাচ্ছে মিহিরাকুলার নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো নালন্দা আক্রমণ করা হয়। মিহিরাকুলা একজন হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী ছিল। নালন্দা দ্বিতীয়বার আক্রমণের শিকার হয় রাজা শশাঙ্কের দ্বারা। রাজা শশাঙ্কও একজন ব্রাহ্মণ হিন্দু ছিল। অথচ নালন্দা নিয়ে উইকিতে এই দুই তথ্য পুরোপুরি চেপে যেয়ে [মিহিরাকুলা বা শশাঙ্ক নাম পর্যন্ত নেই!] একেবারে শুরুর দিকে লিখা হয়েছে-

    Nalanda was ransacked and destroyed by Turkic Muslim invaders under Bakhtiyar Khilji in 1193.

    বৌদ্ধদের এ কেমন অসততা? লক্ষণীয় যে, বখতিয়ার খিলজীর নামের আগে 'মুসলিম' লেবেল দিয়ে দেয়া হয়েছে।

  15. 8
    এস. এম. রায়হান

    নালন্দা বেশ কয়েকবার বহিঃশত্রুর দ্বারা আক্রমণের মুখে পড়ে। যতদূর জানা যায় সেই সংখ্যাটা মোট তিনবার। প্রথমবার স্কন্দগুপ্তের সময়ে (৪৫৫-৪৬৭ খৃষ্টাব্দে) মিহিরাকুলার নেতৃত্বে মধ্য এশিয়ার যুদ্ধবাজ হানদের দ্বারা। উল্লেখ্য মিহিরকুলার নেতৃত্ব হানরা ছিল প্রচণ্ড রকমের বৌদ্ধ-বিদ্বেষী।

    মিহিরাকুলা সম্পর্কে উইকিতে লিখা আছে-

    Mihirakula is remembered in contemporary Indian and Chinese histories for his cruelty and his destruction of temples and monasteries, with particular hostility towards Buddhism. He claimed to be a worshipper of Shiva.

    তার মানে মিহিরাকুলা হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী ছিল।

  16. 7
    শামস

    শাহবাজ ভাই,
    ধন্যবাদ তথ্যপূর্ণ আলোচনার জন্য।
    দেখুন তাদের কৌশল, বেছে বেছে মুসলিমদের দ্বারা ধ্বংসযজ্ঞকে নিয়ে কেবল মাতামাতি। মুসলিমদের প্রতি কালিমা লেপন করার যত উপায় আছে সবগুলোই করার চেষ্টা করে। মধ্যযুগের মুসলিম বিজ্ঞানীদের আগে মুসলিম নাম শুনলে সাম্প্রদায়িক ট্যাগ লাগায়, আবার তারাই মুসলিম বিজ্ঞানীরা যে মুসলিম না নাস্তিক তা জোরেশোরে প্রচার করে। এর প্রতি কিছু মুসলিমও অবিবেচকের মত তাদের প্রতি সমর্থন করে অথবা বড়জোর নীরব থাকে।

    প্রাচীণ বাংলার বেশীরভাগ হিন্দু রাজাদের বৌদ্ধদের উপর নির্মম অত্যাচার আর গণহত্যার ইতিহাস এদের কাছে কখনো শুনতে পাবেন না।

    বর্ণবাদী ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধদের উপর যে অত্যাচার করেছে তা ভয়াবহ। একসময়ে যে বৌদ্ধরা ছিল রাজা মহারাজা অবর্ণনীয় অত্যাচারের ফলে তাদের ব্যাপক দেশত্যাগ হয়। এখন সেই বৌদ্ধদের পরিমাণ ভারতে খুব কম। শেষপর্যন্ত বৌদ্ধদের ধর্মকেও ছিনতাই করার চেষ্টা করেছে এবং এখনও করছে। গৌতম বুদ্ধকে তারা হিন্দুদের একজন দেবতা বানিয়ে দিয়েছে এবং বৌদ্ধ ধর্মকে হিন্দু ধর্মের অংশ বলেই এখনও প্রচার করে। এই প্রপাগান্ডায় এগিয়ে বর্ণবাদী ব্রাহ্মণরা। আমার নিজের দেখামতে, আজ নাস্তিকতার নামে যেসব ব্রাহ্মণ ইন্টারনেটে সক্রিয় তাদের বেশীরভাগকেই সেই বর্ণবাদী গ্রুপের বলে মনে হয়েছে।  আশেপাশের দু'একটা ব্লগের হিন্দু নামধারীদের দিকে তাকালেই দেখতে পাবেন।

    আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরীও ওমরের (রা) আক্রমণের আগে আরো ২ বার ধ্বংস হয় বলে জানা যায়, আর সেই ইতিহাস গুলো অনেক সুপ্রতিষ্ঠিত; একবার রোমান আক্রমনে আর একবার খৃষ্টান আক্রমনে।

    মুসলিরা করে নাই বলে ঐ বিদ্বেষীরা হয়ত আফসোস করে!

    ঐদিকে দেখেন বাংলার সুশীলরা অবশ্য কখনো যেটা করেনা সেটা হলো হুলাগুর আক্রমণে বাগদাদের লাইব্রেরী কীভাবে ধ্বংস হয় তার বর্ণনা দেয়া কিংবা ওখানে জ্ঞান-বিজ্ঞান হারিয়ে যাবার জন্যে কোনো অনুতাপ করা।

    বাগদাদের ঐ লাইব্রেরী ধ্বংস আসলেই যে কি পরিমাণ ক্ষতি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাগদাদ ছিল জ্ঞানহ-বিজ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র। সমগ্র বিশ্ব থেকে জ্ঞান আহরণের জন্য মেধাবী লোকেরা বাগদাদে আসত, আজ যেমন ইউরোপ ও আমেরিকায় যায়। ভাগ্য ভাল হালাকু খানকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ মানব বানায় নাই!!! অবশ্য তা করতে কয়েকবার ভাববে, কারণ তার পরবর্তী বংশধরেরা ইসলাম গ্রহণ করে ইসলামী সভ্যতা বিকাশে বিরাট অবদান রাখেন।

  17. 6
    শাহবাজ নজরুল

    নতুন আলোকে ইতিহাস পর্যালোচনা করার হিড়িক আছে বাংলা ব্লগের নানা বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে; তবে এসব সুশীল বুদ্ধিজীবিরা অনির্ভরযোগ্য/অনিশ্চিত সুত্রের আলোকে একপেশে ইতিহাস লেখেন; আবার কখনো কখনো সুলিপিবদ্ধ ইতিহাস পুরোপুরি সুবিধামতো ভুলে যান। বাংলার এই সুশীল গোষ্ঠীর এক অতীব প্রিয় বিষয় হচ্ছে ‘নালন্দা ধ্বংসের ইতিহাস।’ তাদের লেখাতে তিনবার যে নালন্দা ধ্বংস হয় এর আগের ২ বারের কথা বেমালুম চেপে যাওয়া হয়; বিশেষত বাংলার ব্রাহ্মণ রাজা শশাঙ্কের আক্রমণের ইতিহাস খানা। ওইদিকে আবার ওরাই বখতিয়ারের আক্রমণের কথা নিয়ে পারলে ট্রাজেডির মহাকাব্য রচনা করে। নতুন আলোকে বাংলার ইতিহাস লেখার প্রয়াস চালানো হয় ইসলামকে বাইরের সংস্কৃতি বলে চালিয়ে দিতে। প্রাচীণ বাংলার বেশীরভাগ হিন্দু রাজাদের বৌদ্ধদের উপর নির্মম অত্যাচার আর গণহত্যার ইতিহাস এদের কাছে কখনো শুনতে পাবেন না।

    বখতিয়ার কতৃক নালন্দা ধংসের ইতিহাস কেবল মিনহাজ-ই-সিরাজের তাবাক্বাত ই নাসিরি তে পাওয়া যায় বলে জানি। অন্য সুত্র থেকে এই ধ্বংসের ইতিহাস জানা যায় কিনা একটু জানাবেন। আমার আগের একটা লেখাতে বখতিয়ারের নালন্দার ধ্বংসের ইতিহাসের উপর কিছুটা আলোকপাত করেছিলাম। ওখানে Johan Elverskog  এর লেখা Buddhism and Islam on the Silk Road বইয়ের কথা বলেছি। তিনি লিখেছেন, “For example, not only did local Buddhist rulers make deals with the new Muslim overlords and thus stay in power, but Nalanda also continued as a functioning institution of buddhist education well into the thirtheenth century. One Indian master, for example, was trained and ordained at Nalanda before he traveled to the court of Khubilai Khan. We also know that Chinease monks continued to travel to India and obtain Buddhist texts in the late fourteenth century.”
     
    অর্থাৎ, নালন্দার তথাকথিত ধ্বংসের পরেও এটা কার্যকরী সংস্থা হিসেবে কাজ করছিল, অন্তত আরো প্রায় ১০০-১৫০ বছর পর্যন্ত। সেজন্যে আমাদের দেখার সময় এসেছে, তাবাক্বাতের বাইরের অন্য কোনো সুত্র থাকলে ওখানে ইতিহাসটিকে কীভাবে দেখানো হয়েছে, তা জানার চেষ্টা করা। কিন্তু সচরাচরের মতো বাংলার নব্য রিভিশানিস্ট ঐতিহাসিকরা প্রামাণ্য শশাঙ্কের আক্রমণের কথা বলেনা মোটেই, বলেনা তথাকথিত বখতিয়ারের ধ্বংসের পরও সচল  নালন্দার কথা, ওরা কেবল বলে মিনহাজ কীভাবে সেই নির্মম রাতের বর্ণনা লিখেছেন তার কথা।
     
    বাংলার সুশীল ‘মনা’ গোষ্ঠীর আরেকটা প্রিয় বিষয় হচ্ছে আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরী ধ্বংসের ইতিহাস। কথিত হয়, আমর ইবন আল আস যখন মিসর করায়ত্ত করেন তখন তিনি খলিফা ওমর (রাঃ) কে খবর পাঠান যে লাইব্রেরীতে অনেক বই আছে। জবাবে কথিত হয় ওমর জানান “বইগুলো পুড়িয়ে ফেল, কেননা হয় তারা কোরানকে কন্ট্রাডিক্ট করবে আর ফলে তা ক্ষতির কারণ হবে; আর নাহয় তারা কোরানের সাথে সমার্থক হবে, সেক্ষেত্রে বইগুলো প্রয়োজনোতিরিক্ত।

    মুক্তমনা(?) অভিজিত সহ বাংলা সুশীল গোষ্ঠী এই তথ্য এক বাক্যে মেনে নেন ও সময়ে অসময়ে তা বারংবার তোতা পাখির বুলির মতো আওড়াতে থাকেন। কিছুটা গবেষণায় দেখা যায়, যে ওমর (রাঃ) এর এই ইতিহাস সামসাময়িক অন্য আর কোনো রেফারেন্স থেকে জানা যায়না, আর বলে রাখা ভালো খলিফা ওমরের জীবনী ততকালীন অনেক গ্রন্থেই লিপিবদ্ধ আছে আর ভালোভাবেই আছে। প্রায় রিফর্মিস্ট গোছের এই আজব ইতিহাস পাওয়া যায় ঘটনা ঘটার আরো ৬০০ বছর পরে প্রথম বারের মতো আবির্ভাব হওয়া আব্দুল লতিফের বয়ানে। যিনি নিজেই বলেছেন তার লেখা তথাকথিত ইতিহাস মূলত শোনা ভিত্তিহীন উড়ো খবরের উপর ভত্তি করে লেখা হয়েছে। অথচ ভণ্ডমনা-রা লতিফের নিজের স্বীকারোক্তির বাইরে গিয়ে একে এমন ভাবে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস বানায় যেন এটাই আসল ইতিহাস; আর বাকী চাটুকার বাহিনী স্বর মিলিয়ে বলে, “অনেক কিছু জানলাম।”
     
    আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরীও ওমরের (রা) আক্রমণের আগে আরো ২ বার ধ্বংস হয় বলে জানা যায়, আর সেই ইতিহাস গুলো অনেক সুপ্রতিষ্ঠিত; একবার রোমান আক্রমনে আর একবার খৃষ্টান আক্রমনে। অথচ, প্রামাণ্য এসব ইতিহাস ‘মনা’-দের অভিধাণে মোটেই পাবেন না; পাবেন লেখকের নিজের স্বীকারোক্তিতে বলা উড়ো খবরের ভিত্তিতে লেখা “নতুন ভাবে জানার ইতিহাস।”
     
    ঐদিকে দেখেন বাংলার সুশীলরা অবশ্য কখনো যেটা করেনা সেটা হলো হুলাগুর আক্রমণে বাগদাদের লাইব্রেরী কীভাবে ধ্বংস হয় তার বর্ণনা দেয়া কিংবা ওখানে জ্ঞান-বিজ্ঞান হারিয়ে যাবার জন্যে কোনো অনুতাপ করা। অথচ বাগদাদের লাইব্রেরী যে ধ্বংস হয়েছিল তা হাজার হাজার প্রামাণ্য ইতিহাস থেকে জানা যায়। এই সুশীল গোষ্ঠী বড়ই ‘আজব চিড়িয়া।’

  18. 5
    ডিউরডান্ট ডি শিমুল

    বেশ কিছু তথ্য জানা গেল। ইতিহাস বিষয়ে আমার আগ্রহ কিছুটা কম তবে ভারতবর্ষের ইতিহাস সত্যি খুব রোমাঞ্চকর। অদ্ভুত অদ্ভুত সব কাহিনী এখানে। একেকজন একেকভাবে ইতিহাসকে বর্ণনা করেন।
     
    ধন্যবাদ।

    1. 5.1
      শামস

      @শিমুল,
      পড়া ও মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।
       

  19. 4
    আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

    পড়লাম। পরের পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম। 

    1. 4.1
      শামস

      @আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন,
      পড়ার জন্য আপনাকেও ধন্যবাদ।
       

  20. 3
    এম_আহমদ

    ভাল কাজ শুরু করেছেন। দক্ষিণ বিহারের উদন্তপুরের বিহার (এখানে মন্দির/শিক্ষাপীঠ) আক্রমণের ব্যাপারে অনেকের অনেক কথা আছে। দেখতে চাচ্ছি আপনি কীভাবে আনেন। তবে ২/১ উদ্ধৃতি দিতে ইচ্ছে করছে, হয়ত তা relevant হতে পারে।

    বখতিয়ার উদ্দীন দক্ষিণ বিহারের উদন্তপুর বিহার ব্যতীত অন্য কোন ধর্মীয় স্থান কখনো আক্রমণ করেননি। তবে কথা হল উদন্তপুর কেন? যদিও সেখানে ভিক্ষুদের হত্যা করা হয়, কিন্তু বখতিয়ার সে নির্দেশ দেননি। এর কারণ কি?

    তিব্বতি এক সন্ন্যাসী (ভিক্ষু) পণ্ডিত কুলাচার্য জ্ঞানানশ্রী (Kulacharya Yanansri) তার ‘ভাদ্র কল্পদ্রুম’ (Bhadra Kalpadrum) –এ বলেন যে ‘সেদিন বৌদ্ধভিক্ষু ও পণ্ডিতগণের মধ্যে কলহ ও বিবাদ এতই উত্তেজনার শিখরে ওঠে যে তাদের এক পক্ষ [লক্ষণ সেনের রাজত্বকালে] তুর্কীর মুসলিম আক্রমণকারীদেরকে তাদের ওখানে আক্রমণ চালাতে  প্রতিনিধি পাঠায়। লক্ষণ সেনের রাজত্ব কালে এই প্রেরিত প্রতিনিধিত্ব লক্ষণ সেনের ইচ্ছার প্রকাশ ঘটায়। তিনি চেয়েছিলেন, বুদ্ধদের ক্ষমতা সেখানে ভেঙ্গে পড়ুক। এই উদ্দেশ্যে তিনি ভিক্ষুদের মধ্যে বিবাদের সূত্র লালন করেন ও দুই বিবাদীর এক পক্ষকে বিদেশিদের সাহায্য নিতে উৎসাহ দান করেন। ফলত সে [বখতিয়ার] বোকার মত লাফ দিয়ে পড়ে এবং ধ্বংসের মাধ্যমে ফায়দা নিতে আসে।’ [১]

    বিহার আক্রমণ প্রতিহত করতে কর্তৃপক্ষের লোকজন ও ভিক্ষুরা বাধা দিলে সৈন্যরা তাদেরকে হত্যা করে। মিনহাজের বিবরণে স্পষ্ট হয় বখতিয়ার জানতেন না যে উদন্তপুর ছিল বুদ্ধদের একটি শিক্ষাপীঠ। কিন্তু সেখানে সারিবদ্ধ পুস্তক শ্রেণি দেখে অনুসন্ধান করে জানেন যে সেটি কোন সৈন্যদূর্গ ছিলনা। তাহলে কি মুসলিম সৈন্যবাহিনীকে ইচ্ছাকৃত ভাবে ভুল পথে চালিয়ে সেখানে নেয়া হয়? এ দৃষ্টিতে  কুলাচার্য জ্ঞানানশ্রীর বর্ণনাকে অগ্রাহ্য করা যায় না। [২]

    Ref:
    ______
    [১] Cited in Chowdhury, M,A,M. (2008). The Rise and Fall of Buddhism in South Asia. London: London Institute of South Asia. P.261-62
    [২] Chowdhury, M,A,M. (2008). The Rise and Fall of Buddhism in South Asia. London: London Institute of South Asia. P.263

    1. 3.1
      এস. এম. রায়হান

      মিনহাজের বিবরণে স্পষ্ট হয় বখতিয়ার জানতেন না যে উদন্তপুর ছিল বুদ্ধদের একটি শিক্ষাপীঠ। কিন্তু সেখানে সারিবদ্ধ পুস্তক শ্রেণি দেখে অনুসন্ধান করে জানেন যে সেটি কোন সৈন্যদূর্গ ছিলনা। তাহলে কি মুসলিম সৈন্যবাহিনীকে ইচ্ছাকৃত ভাবে ভুল পথে চালিয়ে সেখানে নেয়া হয়? এ দৃষ্টিতে কুলাচার্য জ্ঞানানশ্রীর বর্ণনাকে অগ্রাহ্য করা যায় না। [২]

      গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে কিন্তু সৈন্যদূর্গের মতই মনে হয়। বাহির থেকে [বিশেষ করে বিদেশিদের কাছে] সৈন্যদূর্গ বলে ভ্রম হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

    2. 3.2
      শামস

      @এম_আহমদ,
      আপনার দুইটা পয়েন্টের ব্যাপারে বলতে হয়, বৌদ্ধদের মধ্যে অব্যবস্থাপনা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ব্যাপক আকার ধারণ করে। তাছাড়া জ্ঞানার্জনের চেয়ে তারা আধ্যাতিকতার প্রতি ঝুকে পড়ে। তবে তুর্কীর মুসলিম শাসকদের যে হামলা করতে আমন্ত্রণ পাঠায় তা জানা ছিল না, হতেও পারে, অস্বাভাবিক না। কারণ এই ধরণের আমন্ত্রণ এ যুগেও দেখে থাকবেন। সামনেই উদাহরণ আছে লিবিয়া। নালন্দাতে প্রহরী ভিক্ষুরা ছিল, তারা বাধা দেয়, তাতো দিবেই। কিন্তু খিলজীরা ভুল করে দূর্গ ভেবেই। আর বাকী অংশটা পরের পর্বের জন্যই থাক।
      আপনার মতামতের জন্য ধন্যবাদ।

      1. 3.2.1
        এম_আহমদ

        তবে তুর্কীর মুসলিম শাসকদের যে হামলা করতে আমন্ত্রণ পাঠায় তা জানা ছিল না, হতেও পারে, অস্বাভাবিক না। কারণ এই ধরণের আমন্ত্রণ এ যুগেও দেখে থাকবেন। সামনেই উদাহরণ আছে লিবিয়া। নালন্দাতে প্রহরী ভিক্ষুরা ছিল, তারা বাধা দেয়, তাতো দিবেই। কিন্তু খিলজীরা ভুল করে দূর্গ ভেবেই।

        ঘটনা শুধু এতটুকু নয়, শুধু হামলার আহবান পর্যন্তও নয়, বরং বখতিয়ারের সৈন্যদলে ‘double agent’ রাও ছিল। হামলা না হয়ে পারত না।  তবে ব্রাহ্মণ্য পুরোহিতবাদি পরিকল্পনা বৌদ্ধদের অবোধগম্য ছিল না। পরবর্তিতে বার্মার বাদশা কতৃক মুসলমানদের সাথে বৌদ্ধদের সম্পর্ক শুধু repairই হয়নি বরং সুসংযত,  সমুন্নত ও উভয়ের মধ্যে পারস্পারিক সহযোগীতা ও সৌহার্দপূর্ণের সম্পর্ক গড়ে ওঠে যা একে অন্যের নিরাপত্তার সহায়ক হয়। বিহার শুধু বিহারই রয়নি, ওটা হয়ে ওঠে ‘বিহার শরিফ’।
        আপনি ভারতের ইতিহাস, বিশেষ করে মুসলমান ও বৌদ্ধদের উত্তান পতনের ইতিহাস, ব্রাহ্মণ্যবাদী কৌশল ও বুদ্ধিমত্তা থেকে আলাদা করে দেখতে গেলে কিছুই পাবেন বলে মনে হয় না। ব্রাহ্মণ্য পুরোহিত কেরিসমাকে পশ্চিমের জায়োনিস্ট বিশেষজ্ঞদের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। নরেন ভট্টাচার্য ([১৯৯৬] (১৯৮৬), ধর্ম ও সংস্কৃতি, প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট, কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড
        পৃ: ৩৮) বলেন,‘ভারতীয় ধর্মের ইতিহাসে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম বলে কোন ধর্ম কোনদিনই ছিল না, কিন্তু সকল ধর্মের ক্ষেত্রেই ব্রাহ্মণদের প্রভাব ছিল অপরিসীম,কেননা আধুনিক ইংরেজিতে যাকে বলা হয় এক্সপার্টাইজ, যে কোন ধর্মের তত্ত্বগত প্রয়োগমূলক দিকের ক্ষেত্রে সেটি ব্রাহ্মণদের বরাবরই ছিল।’ তবে তারা যে কেবল সকল ধর্মের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল, তা নয় বরং ভারতের গোটা জীবন ব্যবস্থার উপর তা করেছিল।
        ড. মুমিন চৌধুরীর লেখা থেকে যে মন্তব্যটি প্রথমে দিয়েছিলাম তা ছিল একটি চাপ্টারের কয়েকটি লাইনকে কেন্দ্র করে। তিনি ব্রাহ্মণদের প্রভাবের এক প্রশস্ত ফিরিস্তি দিয়েছেন। উদন্তপুরের ব্যাপারে যে কয়টি পয়েন্ট তুলে ধরেন তার simplified version হল: এক, ব্রাহ্মণরা ভারতে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে [বরং মার্জিত অর্থে বলা যেতে ‘বুদ্ধির’ ব্যবহারে] আধিপত্য বিস্তার করেছিল; দুই, ব্রাহ্মণরা বিহার অঞ্চলের উপর তেমন কন্ট্রোল রাখতে পারছিলনা; তিন, বৌদ্ধদের মধ্যে কলহের ইন্ধন যুগিয়েছিল; চার, কাটা দিয়ে কাটা তুলেছিল, অর্থাৎ মুসলমানদেরকে দিয়ে বৌদ্ধদের ক্ষমতা খর্ব করার প্রয়াস পেয়েছিল; এবং পাঁচ, পরিকল্পিতভাবে মুসলমানদেরকে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটিয়েছিল। আমরা আজও তাদের পরিকল্পনার বাহিরে নই, আমরা shallow হুজুগি, ওরা নয়, আমাদের নাকে গোসা, ওদের নয়, ওরা গভির শান্ত, আর্য বৈশিষ্ট্য বহন করে।   ওরা বুদ্ধিমত্তায় অজগর, সে অন্য সাপের মত আহার খুঁজে খুঁজে বেড়াতে হয় না, উত্তেজনা দেখায় না, বরং আহার তার মুখে গিয়েই পড়তে হয়। It is never in hurry.
        বাহ্মণদের কোন মূল ধর্ম না থাকলেও তাদের অবস্থানিক অনুপস্থিতি নেই –এটা দেখতে হলে শান্ত মাথায় খেয়াল করতে হয়। ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, বাক্য ও শব্দের আর্কিওলজিতে যেতে হয়। আপনি ‘পুর’শব্দ বিবেচনা করুন। পুর হচ্ছে দুর্গ। পুরোহিত হচ্ছে সেই দুর্গের হিত কামনাকারি বা মডার্ন অর্থে বিশেষজ্ঞ, উপদেষ্টা, এরা সকলের উপর ছটাবর্দার,এদের বিশেষ কোন ধর্মের প্রয়োজন নেই।

        1. 3.2.1.1
          শামস

          @এম_আহমদ,
          আপনার পুরো মন্তব্য তথ্যনির্ভর।

          ঘটনা শুধু এতটুকু নয়, শুধু হামলার আহবান পর্যন্তও নয়, বরং বখতিয়ারের সৈন্যদলে ‘double agent’ রাও ছিল। হামলা না হয়ে পারত না।  তবে ব্রাহ্মণ্য পুরোহিতবাদি পরিকল্পনা বৌদ্ধদের অবোধগম্য ছিল না। পরবর্তিতে বার্মার বাদশা কতৃক মুসলমানদের সাথে বৌদ্ধদের সম্পর্ক শুধু repairই হয়নি বরং সুসংযত,  সমুন্নত ও উভয়ের মধ্যে পারস্পারিক সহযোগীতা ও সৌহার্দপূর্ণের সম্পর্ক গড়ে ওঠে যা একে অন্যের নিরাপত্তার সহায়ক হয়। বিহার শুধু বিহারই রয়নি, ওটা হয়ে ওঠে ‘বিহার শরিফ’।

          বিক্ষিপ্তভাবে ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের জাত্যাভিমান, বর্ণবাদ, বৌদ্ধদের উপর অত্যাচার ইত্যাদির ব্যাপারে পড়েছি। নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে এব্যাপারে একটি লেখা আশা করছি।
          ভালো থাকুন।

        2. এম_আহমদ

          আমি ভাবছি ড. মুমিন চৌধুরীর বইখানির chapter by chater একটা Review করা যায় কি না। এতেই সব কথা এসে যাবে। ড. মুমিন চৌধুরী বইটি ইংরেজীতে না লিখে বাংলায় লিখলেই ভাল হত।

  21. 2
    শামস

    অনেকেই আজ নতুন করে ইতিহাস লেখে। আর তা লিখতে গিয়ে প্রফেট মুহম্মদ (সাঃ)কে বানিয়ে দেয় দুনিয়ার নিকৃষ্ট মানব, আবার লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করেও চেঙ্গিস খানের মত রক্তপিপাসুও হয়ে যায় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ মানব (চেঙ্গিস বন্দনা-র নেপথ্যে)!!! সেই ধারাবাহিকতায় মুসলিম শাসক বা ধর্মীয় ব্যক্তি সে যে-ই হোক, সে-ই খারাপ- এই তত্ত্বের প্রাসারে কিছু বিদ্বেষী লোক যেন মিশন নিয়ে নেমেছে। বখতিয়ার খিলজীও সেই কোপানলে পড়া একজন। ধর্মে মুসলিম হলেই কেউ সাধু হবে আর তাকে ডিফেন্ড করতে হবে এমন কোন কারণ নেই। কিন্তু তৎকালীন সমাজ ও পারিপার্শিকতার আলোকে তাদের বিচার করলে কী অবস্থা দাঁড়ায়, তাই দেখার প্রয়াস চালানো হবে।

    1. 2.1
      ইবনে বতুতা

      এসব নিয়ে ইতিহাস রচনা হয়, আর তাতে বিজেতাই থাকে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ভিলেন। তবে ব্যতিক্রমও হয়! ইতিহাসবিদ তার বুদ্ধি, প্রজ্ঞা ও দৃষ্টির সীমাকে সবসময় অতিক্রম করতে পারে না। ফলে তার বর্ণনাকৃত কাহিনী অনেক সময় শুদ্ধতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হিমশিম খায়। তবে ইতিহাসের বর্ণনা একজায়গায় থেমেও থাকে না। বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের সুবিধার্থে একে পরিমার্জন করে উপস্থাপন করে, আবার আমজনতাও অনেক সময় গোগ্রাসে গিলেও ফেলে।

      অনেকেই ইতিহাস লেখেন তবে তাদের বেশির ভাগ ইতিহাস লিখতে বসেন কাউকে উদ্ধার করতে বা কাউকে ডুবিয়ে দিতে! কাউকে মহামানব বানাতে বা কাউকে মহাদানব বানাতে। আর এই ধরণের ইতিহাস চর্চা চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। কারণ নিমের মত ইতিহাস বাজারে চলেনা কেউ পৃষ্টপোষকতা করতে এগিয়ে আসেনা। ঝাল-মুড়ি আর পিয়াজু ভাজির মত ইতিহাস কাটতি খুব। এতে লেখকের লাভ হয় অর্থ যশ সম্মান।

      আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সেই সত্যগুলো যাচাই করে দেখন। এইটি সত্য যে পরিস্থিতি পরিবেশ মানুষই ধীরে ধীরে সৃষ্টি করে এবং এই পরিবেশের শিকার হয় পরবর্তি প্রজন্ম! যেমন গোবর গর্তে যে ফুলের জন্ম আর লালন পালন হয়ে বর্ধিত হয়, সেই ফুলের রেণুতে অনুতে গোবর জনিত ক্রিয়ার ফল দেখতে পাওয়া যাবে। যে যতই সার্জিক্যাল অপারেশন করেন না কেন গাছটি থেকে সেই উপাদানের কার্য ক্রিয়াকে বদলাতে পারবেন না। তখন শুধু কপালে কষাঘাত করে যেতে হবে।

      আজ ৯ শত বছর আগে নালান্দা মহাবিহার খিলজি কর্তৃক ধ্বংস করা হয় বলে খুব প্রচার করা হয়। কিন্তু হয় না এই সেদিন পাক ভারত ভাগের পর বাংলা আসাম ত্রিপুরার মধ্যে বিখ্যাত ত্রিপুয়া রাজ্যের ধর্মনগরের অবস্থিত ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে মাটিতে মিশিয়ে দেবার ইতিহাস!

      নালান্দার সেই মহা বিহার ছিল দূর্ভেদ্য দূর্গের মত প্রাচির দিয়ে ঘেরা। তুর্কিরা এত দেশ ঘুরে এসেছে তারা কোথাও এইরূপ দেয়াল ঘেরা স্থান যে দূর্গ নয় বিদ্যালয় তা ভাবার অবকাশ ছিলনা। প্রশ্ন আসবে যেখানে শুধু ধর্মীয় প্রচার প্রশার সেই যায়গাকে কেন সুউচ্চ দূর্গ প্রাচির দ্বারা সুরক্ষা করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল?

      এর পক্ষে ভারতের ইতিহাসবিদ দাসগুপ্ত তার লিখিত “ভারত বর্ষ ও ইসলাম” নামক বইয়ের ১২ পৃষ্টায় উল্লেখ করেন যে- তুর্কিরা দূর্গ বলে ভুল করেই নালান্দা ধ্বংস করেছিল। শুধু তাই নয় তিনি আরও উল্লেখ করেন-ময়নামতি মহা বিহার ধ্বংস করে ব্রাহ্মণরা। ভোজ শর্মার শিলালিপি থেকে জানা যায় ভোজ শর্মা নিজে সোম পুরের মহাবিহার ধংস করেছিলেন। কলহনের রাজতরঙ্গইনিতে উল্লেখ পাওয়া যায় যে, কাশ্মিরের হিন্দু রাজাদের দ্বারা অনেক বিজিত রাজ্যের মন্দির ধ্বংসের কথা।

      আজকালের ইতিহাসবিদদের বেশির ভাগ শুধু মুসলিমদের দ্বারা কোন অঘটন ঘটে থাকলে তাকে নিপুন শিল্পীর মত ইতিহাস ইঞ্জিনিয়ারিং করে পাঠকদেরকে বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়। যার পরিণামে এই দেশে চাষ হয় সাম্প্রদায়ীকতা। বিদ্বেষ! ধর্মে-ধর্মে বিদ্বেষ, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ! একই জাতির মধ্যে বিদ্বেষ বিভাজন।

      ধন্যবাদ সামস ভাই। আশা করি আমাদেরকে নতুন কোন ইতিহাস শুনাবেন।

      1. 2.1.1
        শামস

        ইবনে বতুতা ভাই, আমি নতুন কোন ইতিহাস লিখছি না। নীচে বেশ কিছু সুত্র দেয়া আছে। তবে এর চেয়ে বেশী তথ্যসুত্র পড়া হয়েছে এ উপলক্ষ্যে। আপনি যে চিত্র একেছেন তা অনেকখানিই সঠিক, অন্ততঃপক্ষে আমি যেগুলো পড়েছি মোটামুটি এরকমই পেয়েছি। যেমনঃ মন্দির ধ্বংসটা সেসময়ের খুব স্বাভাবিক ঘটনা ছিল, আর এই মন্দির ধ্বংস হিন্দু শাসকদের দ্বারাই বেশী হত। প্রতিপক্ষের মন্দির অনায়েসে ধ্বংস করত।

        কিন্তু হয় না এই সেদিন পাক ভারত ভাগের পর বাংলা আসাম ত্রিপুরা মধ্যে বিখ্যাত ত্রিপুয়া রাজ্যের ধর্মনগরের অবস্থিত ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কে ধ্বংস করে মাটিতে মিশিয়ে দেবার ইতিহাস!

        এটা জানতাম না। জানানোর জন্য ধন্যবাদ।

        প্রশ্ন আসবে সেখানে শুধু ধর্মীয় প্রচার প্রশার সেই যায়গাকে কেন সুউচ্চ দুর্গ প্রাচির দ্বারা সুরক্ষা করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল?

        প্রাচীর দেয়ার কারণটা আমারও জানা নেই। তবে এটা হতে পারে নালন্দার উপর বহিঃশত্রুর আক্রমণ। যতদূর জানা যায়, খিলজীর আগে নালন্দা দুইবার ধ্বংসের মুখে পড়ে। মজার ব্যাপার কি জানেন, ঐসব ধ্বংসের কথা আজকাল প্রচার করা হয় না। ধ্বংসকর্তাদের একজন আবার বাংলার শাসক ব্রান্মণ রাজা শশাঙ্ক!!! সেই সময়ে রাজ্যে রাজ্যে কলহ, শত্রুতা ছিল খুব স্বাভাবিক। হামলার সময় প্রতিপক্ষের যেভাবে পারে ক্ষতিসাধন করত। বাংলার ব্রান্মণ রাজা শশাঙ্কের নালন্দা ধ্বংসের সময় এরকমই হয়েছিল।

        এর পক্ষে ভারতে ইতিহাস বিদ দাসগুপ্ত তার লিখিত "ভারত বর্ষ ও ইসলাম " নামক বইয়ের ১২ পৃষ্টায় উল্লেখ করেন যে- তুর্কিরা দুর্গ বলে ভুল করেই নালান্দা ধ্বংস করেছিল।

        হ্যা, এটাই সঠিক। পরের পর্বে তা নিয়ে আলোচনা করা হবে।

        তিনি আরও উল্লেখ করেন -ময়নামতি মহা বিহার ধ্বংস করে ব্রাহ্মণরা। ভোজশর্মার শিলালিপি থেকে জানা যায় ভোজ শর্মা নিজে সোম পুরের মহাবিহার ধংস করেছিলেন।কলহনের রাজতরঙ্গইনি তে উল্লেখ পাওয়া যায় যে, কাশ্মিরের হিন্দু রাজাদের দ্বারা অনেক বিজিত রাজ্যের মন্দির ধ্বংসের কথা।

        সপ্তম শতাব্দীর আগে থেকেই ব্রান্মণ্যবাদ শক্তিশালী হতে থাকে। তবে সপ্তম শতাব্দীর পর থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ ব্রাণ্মণ রাজাদের হাতে অনেকটাই চলে যায়। তাই অনেক ভারতীয় ইতিহাসবিদ ঐ সময়টাকে ভারতের অন্ধকার যুগ বলে। কারণ বর্ণহিন্দু ব্রান্মণরা সমাজে শ্রেণীবিভাগকে প্রতিষ্ঠা করে, মেয়েদের সতীদাহ প্রথাকে বিস্তার করে, বৌদ্ধদের উপর নেমে আসে খড়গ। অবর্ণনীয় অত্যাচারের ফলে বৌদ্ধরা ব্যাপকহারে দেশত্যাগ করতে থাকে। চালকের আসন থেকে বৌদ্ধরা নেমে যায় শোষিতের আসনে। বৌদ্ধসভ্যতার ধ্বংসের দায় প্রধানত পড়ে সেই ব্রান্মণদের উপর।
        আপনার সুচিন্তিত মতামতের জন্য ধন্যবাদ।
         
         
         

  22. 1
    এস. এম. রায়হান

    অনেক অজানা তথ্য জানলাম। পরের পর্বের অপেক্ষায়…

    1. 1.1
      শামস

      পরের পর্বেই মূলত বিশ্লেষণটা আসবে। কিন্তু লেখার দৈর্ঘ্য খুব বড় হয়ে যায় বিধায় দ্বিতীয় পর্বে টানতে হল।
      ধন্যবাদ পড়ার জন্য।
       

      1. 1.1.1
        shuvra Jyoti chakma

        did not get next episode. plz. write soon

        1. 1.1.1.1
          শামস

          এখানে দুইটা পর্বকে একসাথে করে ১ এবং ২ হিসেবে রাখা হয়েছে। আর কোন পর্ব নেই।

          ধন্যবাদ।

           

  1. 0
    Anonymous

    […] http://www.shodalap.org/shams/8918/ […]

Leave a Reply

Your email address will not be published.