«

»

Dec ১৪

পবিত্র কুর’আনে জেরুজালেম (পর্ব-১)

 (ডিসক্লেইমারঃ-বর্তমান সময়ে মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে জেরুজালেমকে ঈসরায়েলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা । বলা বাহুল্য জেরুজালেমকে ঈসরায়েলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুদীর্ঘ ইহুদী পরিকল্পনারই অংশ। ঈসরায়েল রাষ্ট্রের প্ততিষ্ঠা আর ‘পবিত্রভূমি’ তথা জেরুজালেমকে দখল করা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশী গবেষণা আর আলোচনা করেছেন সম্ভবত শায়খ ইমরান নযর হোসেন পবিত্র কোরান আর হাদীসের আলোকে । এই ধারাবাহিক পোস্টটির পুরাটাই তাঁরই লিখিত ‘পবিত্র কুর’আনে জেরুজালেম’ নামক বই থেকে নেয়া (খুব সামান্য কিছু পরিবর্তন করে)। আশা করি পোষ্টগুলো আমাদেরকে বর্তমান আর ভবিষ্যতের মুসলিম বিশ্বের অনেক গুরুত্বপুর্ন বিষয়কে অনুধাবন করতে সাহায্য করবে।)   

জেরুজালেম এবং পবিত্রভূমির পরিণতি সম্বন্ধে কুর’আনিক দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রবিন্দুতে এই ঘোষণা রয়েছে যে, যখন শেষ সময় ঘনিয়ে আসবে, ইহুদী সম্প্রদায়কে, যারা বহুভাগে বিভক্ত হয়ে দেশে দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল, সেই অবস্থা থেকে ‘মিশ্র জনগোষ্ঠী’ হিসেবে ‘পবিত্রভূমি’তে ফিরিয়ে আনা হবে ।

 

وَقُلْنَا مِن بَعْدِهِ لِبَنِي إِسْرَائِيلَ اسْكُنُواْ الأَرْضَ فَإِذَا جَاء وَعْدُ الآخِرَةِ جِئْنَا بِكُمْ لَفِيفًا

তারপর আমি বনী ইসলাঈলকে বললামঃ এ দেশে তোমরা বসবাস কর। অতঃপর যখন পরকালের ওয়াদা বাস্তবায়িত হবে, তখন তোমাদের কে জড়ো করে নিয়ে উপস্থিত হব। [ সুরা বনী-ইসরাঈল ১৭:১০৪]

আল্লাহর সেই কথা ইতোমধ্যে পূর্ণ হয়েছে। ইহুদীরা ইতোমধ্যে ‘পবিত্রভূমিতে’ ফিরে এসেছে এবং সেটির উপর নিজেদের দাবী প্রতিষ্ঠা করেছে। ইসরাঈল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার সাফল্য, তাদেরকে এই রাষ্ট্রের ধর্মীয় বৈধতায় বিশ্বাসী করে তুলেছে। ইসলামের ব্যাখ্যা এই যে, ইসরাঈলের কোন ধর্মীয় বৈধতা নেই। বরং, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতারণার মাধ্যমে ইহুদীরা প্রতারিত হয়েছে, এবং তাদের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে কঠোরতম ঐশ্বরিক শাস্তি নেমে আসার উপযোগী ক্ষেত্র। কিন্তু ‘বনী ইসরাঈলের’ উপর চুড়ান্ত শাস্তি কার্যকর হওয়ার আগে, ‘পবিত্রভূমি’ তথা গোটা বিশ্বে এক বিশাল ক্রমবিকাশমান নাটকের আরো দৃশ্যাবলীর বাস্তবায়ন এখনো বাকী আছে। 
ইসলামরে দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ইসরাঈলের সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। গ্যালিলি হ্রদ খুব শীঘ্রই শুকিয়ে যাবে! ঈসা (আঃ) খুব শীঘ্রই ফিরে আসবেন। আর তার প্রত্যাবর্তনের সাথে, বিশ্ববাসী ইসরাঈল রাষ্ট্রেরও ধ্বংস অবলোকন করবে। 

মুসলিমদের কাছে যে সত্যটি রয়েছে, ইহুদীদের কাছেও তাই ছিল, কিন্তু তারা সেটিকে বিকৃত করেছে। কুর’আনের মাধ্যমে যে অবিকৃত সত্যটি নাযিল হয়েছে সেটিকে, এবং ইব্রাহীম (আঃ)-এর বিধাতার শেষ নবী হিসেবে মুহাম্মদ (সাঃ)-কে গ্রহণ করার জন্য মদীনার ইহুদীরা (হিজরতের পরে) দীর্ঘ ও পর্যাপ্ত সময় পেয়েছিল ─ কিন্তু তারা একগুঁয়েমিবশত তা করতে অস্বইকৃতি জানিয়েছিল। তারপর তাদের সময় ফুরিয়ে গেল এবং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা কিবলা পরিবর্তন করে দিলেন ।

এখন নির্বোধেরা বলবে, কিসে মুসলমানদের ফিরিয়ে দিল তাদের ঐ কেবলা থেকে, যার উপর তারা ছিল? আপনি বলুনঃ পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই। তিনি যাকে ইচ্ছা সরল পথে চালান। [ সুরা বাকারা ২:১৪২ ]

নিশ্চয়ই আমি আপনাকে বার বার আকাশের দিকে তাকাতে দেখি। অতএব, অবশ্যই আমি আপনাকে সে কেবলার দিকেই ঘুরিয়ে দেব যাকে আপনি পছন্দ করেন। এখন আপনি মসজিদুল-হারামের দিকে মুখ করুন এবং তোমরা যেখানেই থাক, সেদিকে মুখ কর। যারা আহলে-কিতাব, তারা অবশ্যই জানে যে, এটাই ঠিক পালনকর্তার পক্ষ থেকে। আল্লাহ বেখবর নন, সে সমস্ত কর্ম সম্পর্কে যা তারা করে। [ সুরা বাকারা ২:১৪৪ ]

সমষ্টিগতভাবে যে করুণ পরিণতি তাদের জন্য এখন অপে¶া করছে, তা এড়ানোর জন্য তত¶ণে দেরী হয়ে গেছে। ইতিহাসের যে সব ঘটনা এখনো আত্মপ্রকাশ করেনি, সেগুলির মধ্যে অন্য যে কোন ঘটনার চেয়ে, জেরুজালেমের শেষ পরিণতি এবং ইসরাঈল রাষ্ট্রের ভাগ্যই ইসলামের দাবীকে প্রমাণিত করবে, যা সত্যধর্ম হিসাবে সবচেয়ে সুস্পষ্ট ও অবিকৃত।

যায়োনিস্ট ইহুদীদের কৌশল

[নোটঃ- যে পাহাড়ের উপর সোলায়মান (আঃ)-এর হায়কাল অর্থাৎ মাসজিদুল আকসা অবস্থিত তার নাম যায়ন। ইহুদীদেরকে নির্বাসন থেকে ফিলিস্তিনে ফিরিয়ে এনে ইসরাঈল রাষ্ট্র সৃষ্টি করার উদ্যোগে উনবিংশ শতাব্দির শেষ দিকে যায়োনিয্মের তৎপরতা শুরু হয়।]

দূর্নিতীগ্রস্থ, স্থায়ীভাবে ধনী, লুণ্ঠনজীবী ও ধর্ম-বিমুখ সম্ভ্রান্ত শ্রেণী, যারা এখন ইসরাঈলের চারপাশের আরব-মুসলিম সম্প্রদায়গুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের সাথে সুবিধাবাদী আঁতাত গড়ে তোলা যায়োনিস্টদের সার্বিক কৌশলের একটা দিক। ঐ সম্ভ্রান্ত শ্রেণী তাদের নিজেদের [অবৈধ] ক্ষমতা, শাসন-নিয়ন্ত্রণ, সুবিধা, অগ্রাধিকার ও সম্পদকে আঁকড়ে ধরে রাখতে গিয়ে ইসরাঈলের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে বাধ্য হয়। ইহুদীরা ঐ সব উঁচু শ্রেণীর মানুষের উপর সাধারণ মুসলিমদের নির্যাতন করার জন্য এমনভাবে সার্বক্ষণিক চাপ দিতে থাকে যেন তারা ইসরাঈলের আনুগত্য মেনে নিতে বাধ্য হয়। সেকারণে তাদের লোক দেখান ইসরাঈল-বিরোধিতা ইহুদীদের জন্য কোন হুমকি হিসাবে গণ্য হয় না। ইসরাঈল যখন ‘পবিত্রভূমিতে’ মুসলিমদের উপর তার নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, আর তার ফলশ্রুতিতে যখন আরব-মুসলিম জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, তখন টিকে থাকার প্রয়োজনে ঐ উচ্চশ্রেণীর শাসকবর্গ ইসরাঈলের বিরুদ্ধে ক্রোধের অভিনয় করতে বাধ্য হয়। এই ইহুদী-আরব (শাসকশ্রেণীর) কৌশল আজ চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, যার মাঝে রয়েছে শয়তানী, কূটবুদ্ধি আর সুবিধাবাদ। আর এটা এমন এক জনসমষ্টির কৌশল, যারা ইব্রাহীম (আঃ)-এর ধর্মের নীতিভিত্তিক সারসত্তকে পরিত্যাগ করেছে। কৌশলগত দিক দিয়ে ইহুদীরা একদিন ঐসব আরব শাসক শ্রেণীকে পরিত্যাগ করবে যাদের সাথে তারা আজ সুবিধাবাদের ভিত্তিতে আঁতাত করেছে। আরব শাসক শ্রেণীকে পরিত্যাগ করার কৌশলও অবশ্য ইতোমধ্যেই গৃহীত হয়েছে। ইসরাঈল আরব-মুসলিমদের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে, যে যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে ইহুদী রাষ্ট্রটির পরিধি প্রসারিত হবে। তখন পৃথিবীর ‘ নয়িন্তা রাষ্ট্র’ হিসাবে (যুক্তরাষ্ট্রের স্থলাভিষিক্ত হয়ে) ইসরাঈল এই সমগ্র অঞ্চলের [মধ্যপ্রাচ্য] উপর শাসন করবে। এ ধরনের সকল ইহুদী কৌশল, যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলাকে এবং মুমিনদেরকে অবজ্ঞা করতে চায় এবং নিয়তির বিধানকে বদলে ফেলতে চায়। সেই সকল কৌশলের প্রতি কুর’আন ভয়ঙ্কর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেছে: 

٥٤ وَمَكَرُواْ وَمَكَرَ اللّهُ وَاللّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ

“আর তারা (ইহুদীরা) চক্রান্ত করেছে, এবং আল্লাহ্ও কৌশল অবলম্বন করেছেন; বস্তুত আল্লাহ হচ্ছেন সর্বোত্তম কৌশলী।” (কুর’আন, সুরা আলে ‘ইমরান ৩:৫৪)

‘পবিত্রভূমিতে’ ঐ শয়তানসুলভ কৌশল বাস্তবায়ন করার লক্ষ্য নিয়েই ইসরাঈল ইয়াসির আরাফাত এবং তার ধর্মনিরপক্ষ ও জাতীয়তাবাদী দল চখঙ-কে শান্তির জন্য নিজের সহযাত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছে। ঐ কৌশল মিশর, জর্ডান, তুরস্ক এবং সৌদী আরবের বেলায় কাজ করেছে, যারা সবাই হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের তাঁবেদার রাষ্ট্র। কিন্তু ঐ কৌশল ‘পবিত্রভূমিতে’ সফল হয়নি। সিরিয়া বা ইয়েমেনেও তা সফল হয় নি।  

পাঠকবর্গ হয়ত এখানে, রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর একটা প্রার্থনা সম্বন্ধে ভেবে দেখতে চাইবেন, যিনি প্রার্থনা করেছিলেন এভাবে: —

“ইবনে ওমর (রাঃ)-র বর্ণনায়: হে আল্লাহ্! আমাদের শাম (সিরিয়া) ও আমাদের ইয়েমেনের উপর তোমার রহমত নাজিল কর। লোকেরা বলল: আর আমাদের নাজ্দ (সৌদী আরবের ঐ অংশ যেখান থেকে বর্তমান সৌদী শাসকদের উৎপত্তি)। নবী (সাঃ) আবার বললেন: হে আল্লাহ্! আমাদের শাম ও ইয়েমেনের ওপর তোমার রহমত বর্ষণ কর। তারা আবার বলল: আর আমাদের নাজদ ওপরও [তোমার রহমত বর্ষণ কর]। এ সময় নবী (সাঃ) বললেন: সেখানে ভমিকম্প ও দুর্ভোগ দেখা দেবে এবং সেখান (নাজ্দ) থেকে শয়তানের মাথার পার্শ্বদেশ বেরিয়ে আসবে।” (সহীহ্, বুখারী)

ছবিঃ সৌদী রাজপরিবারই কি শয়তানের মাথা?

ইহুদী রাষ্ট্র ইসরাঈল তার অস্তিত্বের ৫০ বর্ষপূর্তি করেছে। কিন্তু “প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে” এটা ইহুদীদের তেমন কোন বিজয় নয়, যদিও তারা আমাদেরকে তাই বুঝাতে চাইবে। মূলত ধর্ম-বিমুখ যায়োনিস্টদের এই আন্দোলন, ‘বনী ইসরাঈলকে’ পর্বতপ্রমাণ মিথ্যা দ্বারা প্রতারিত করেছে। তেমনিভাবে তাদের একটা মিথ্যা শ্লোগান ছিল: “ভূমিহীন জনগোষ্ঠীর জন্য জনহীন ভূমি”। ঐ ভূমিতে যদি জনমানুষ নাই থেকে থাকে, তবে আমরা কি জিজ্ঞেস করতে পারি: এখন তাহলে কারা ‘পাথর’ ছুঁড়ছে? আরবরা যদি ‘জনগোষ্ঠী’ না হয়ে কেবল ‘ঘাসফড়িং’-এর দলই হয় ─ যেমন প্রাক্তন ইসরাঈলী প্রধানমন্ত্রী শামীর একবার ঘোষণা করেছিলেন ─ তাহলেও তারা কি ২০০০ বছর ধরে ইহুদীদেরকে নিজেদের মাঝে বসবাস করতে দেয়নি? ইহুদীরা যে ২০০০ বছরেরও বেশী তাদের মাঝে আরব ভূমিতে বসবাস করেছে, তখন কি আরবরা তাদের জান ও মালের নিরাপত্তা বিধান করে নি? আরবরা এসব করেছে, এবং তাদের জন্যে তার চেয়েও বেশী কিছু করেছে এমন সময়, যখন বাকী পৃথিবী ইহুদীদের জন্যে নিজ নিজ দরজা বন্ধ করে রেখেছিল, অথবা অনিচ্ছা সত্তে¡ও তাদেরকে নিম্নমানের বস্তিতে থাকার অনুমতি দিয়েছিল। আরবরা তা করেনি এজন্য যে, তাদের মাঝে ইব্রাহীম (আঃ)- এর ধর্মের ‘অবশিষ্ট’ কিছু রয়ে গিয়েছিল, যা ইসমা‘ঈল(আঃ)-এর মাধ্যমে তাদের কাছে এসেছিল। সত্যের ঐ অবশিষ্টাংশ তাদেরকে আতিথেয়তা শিখিয়েছিল। আজও আরবদের সেই আতিথেয়তা টিকে আছে। ইব্রাহীম (আঃ)-এর সেই একই ধর্ম, ইহুদীদেরকে অতিথিপরায়ণ ‘ঘাসফড়িং’-দের প্রতি কৃতজ্ঞ হতে শেখানোর কথা ছিল। যায়োনিজ্ম যুক্তি দেখায় যে, ইহুদীধর্মের অন্তর্নিহিত ‘সত্য’, ইহুদী জনগোষ্ঠীকে ‘পবিত্রভূমির’ উপর একচ্ছত্র, অনন্তকাল, স্থায়ী এবং নিঃশর্ত অধিকার দান করেছে। প্রায় ২০০০ বছর আগে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা যে ইহুদী রাষ্ট্র ধ্বংস করে দিয়েছিলেন, তার পুনঃপ্রতিষ্ঠাই সাক্ষ্য দেয় যে, ইহুদী ধর্ম সত্যের যে সাম্রাজ্যবাদী  সংস্করণের দাবী করে সেটাই সঠিক। যায়োনিস্টরা এমন যুক্তি প্রদর্শন করে। সর্বোপরি তৌরাত তো বলেছেই,

“প্রতিটি জায়গা, যার উপর তোমাদের পদচিহ্ন রয়েছে, তাই তোমাদের হবে” (তৌরাত, দ্বিতীয় বিবরণ Deuteronomy ১১:২৪)।

 

ইসরাঈলের জন্মের পর গত ৫০ বছর ধরে, পৃথিবী অবাক বিস্ময়ে চেয়ে দেখেছে যে, ক্রমাগতভাবে সম্প্রসারণশীল ইসরাঈলে কিভাবে ইহুদীরা দাপট দেখিয়ে চলেছে। ঐ সম্প্রসারণ এখনো বন্ধ হয় নি। আপাত দৃষ্টিতে যদিও মনে হবে যে, ইসরাঈল চারিদিক থেকে অবরুদ্ধ এবং সে তার শক্তি সুসংহত করছে কেবল আরবদের আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য। কিন্তু বাস্তবতা এই যে, ইসরাঈল এক বিশাল যুদ্ধ পরিচালনার ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে চলেছে, যার মাধ্যমে তার সীমান্ত নাটকীয়ভাবে প্রসারিত হয়ে ‘বাইবেলীয় পবিত্রভূমিকে’ ঐ রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করবে ─ অর্থাৎ “মিশরের নদী থেকে ফোরাত নদী পর্যন্ত”। এর অন্তর্নিহিত অর্থ এই যে, একদিকে সুয়েজ খালের উপর নিয়ন্ত্রণ এবং অপরদিকে ইরানী তেল সম্পদের সম্ভাব্য ব্যতিক্রম ছাড়া, সমগ্র উপসাগরীয় তেল সম্পদের উপর ইসরাঈলের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ ─ যে তেল সম্পদের উপর ইউরোপ, জাপান এবং পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই নির্ভরশীল। বাইবেলে আছে

 On that day the Lord made a covenant with Abram and said, “To your descendants I give this land, from the Wadi of Egypt to the great river, the Euphrates।

Genesis 15:18

                                                         ছবি ঃ মিশর থেকে শুরু করে ইরাকের ফোরাত নদী পর্যন্ত সুবিশাল এলাকাই হচ্ছে বাইবেলের 'প্রমিসড ল্যান্ড'

ঐ যুদ্ধের পরিকল্পনা অত্যন্ত যত্ন সহকারে তৈরী করা হবে, যেন তার মাধ্যমে ইসরাঈল পৃথিবীর ‘নিয়ন্তা রাষ্ট্র’ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে স্থানচ্যূত করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। আর তাই বাইবেলের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে মনে হবে, ইসরাঈল রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ইহুদীদের সাফল্য, পবিত্র নগরী জেরুজালেমের উপর ইহুদী নিয়ন্ত্রণ, এবং ইসরাঈল রাষ্ট্রের সম্প্রসারণ, ইহুদী ধর্মের সত্যতার দাবীকেই প্রমাণিত করেছে। আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে: ‘মসীহ্’ ছাড়া এটা সম্ভব হল কিভাবে? এর উত্তর হচ্ছে যে, এক ভণ্ড ‘মসীহ্’ অর্থাৎ আল-মাসীহ্ আদ্-দাজ্জালের প্রতারণার মাধ্যমে এটা সম্ভব হয়েছে! এ ছাড়া, বাইবেলীয় ইসরাঈল প্রতিষ্ঠায় আপাত সাফল্যের মধ্যে নিহিত আরেকটি অর্থকে এড়ানো যায় না, আর তা হলো ইহুদীদের সেই দাবী যে ঈসা (আঃ) এবং মুহাম্মদ (সাঃ) উভয়েই ভণ্ড ছিলেন। না‘ঊযুবিল্লাহ্। কিন্তু, ইসরাঈল-রাষ্ট্র সৃষ্টি করতে গিয়ে ইহুদী ধর্মকে সদ্য বিকশিত, মূলত ধর্ম-বিমুখ এবং ক্ষয়িষ্ণু, আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার সাথে ‘গাঁটছড়া’ বাঁধতে হয়েছে। পৃথিবীর মঞ্চে ঐ স্রষ্টা-বিমুখ পশ্চিমা জগত “মানবকুলের উপর সকল উচ্চভূমি থেকে নেমে এসে” এবং “চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে” (কুর’আন, সুরা আম্বিয়া ২১:৯৬) জলে, স্থলে ও অন্তরীক্ষে তাদের একক কর্তৃত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। নতুবা, ইহুদী রাষ্ট্রটি ঐ সর্বশক্তি সম্পন্ন অথচ নাস্তিক ও ক্ষয়িষ্ণু পশ্চিমের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া গত ৫০ বছরক টিকে থাকতে পারত না। আসলে ঐ [পশ্চিমা] সভ্যতা ‘ইয়াজুজ’ ও ‘মাজুজ’ কর্তৃক সৃষ্ট ও লালিত সভ্যতা। যে সকল ইহুদীরা ইসরাঈল রাষ্ট্রকে বাইবেলীয় ইসরাঈলের পুনঃপ্রতিষ্ঠা মনে করে সমর্থন করেন, তারা সেই রাষ্ট্রের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। অথচ অভাগা ফিলিস্তিনী জনগণের উপর যে অবিচার এবং অত্যাচার করা হয়েছে সেদিকে নজর দিতে তারা সুবিধাজনকভাবে ভুলে যান।

ছবি ঃ প্রতিদিনই ঈসরায়েলের বুল ডোজার গুড়িয়ে দিচ্ছে নিরীহ প্যালেস্টিনিরদের ঘর আর গোড়ছে নতুন ইহূদী বসতী।

ইহুদীদের ‘পবিত্রভূমি’ সেখানকার খৃস্টান এবং মুসলিম জনগণের আপন নিবাস ছিল, এটাই ছিল তাদের একমাত্র অপরাধ। সেই অবিচার ও অত্যাচার ৫০ বছর ধরে ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে। ইহুদীদের কাছে আমাদের প্রশ্ন: সত্যের দাবী কি কখনই নাস্তিকতা, [নৈতিক] অবক্ষয়, অবিচার, বর্ণবাদ এবং নির্যাতনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে? একটা জাতি, ধর্ম-বিমুখতার ট্রেনের সাথে নিজেদের বগী সংযুক্ত করার পরও কেমনে ইব্রাহীম (আঃ)-এর বিধাতার প্রতি অনুগত রয়েছে বলে দাবী করতে পারে? ইহুদীরা যুক্তি দেখিয়েছে যে, তারা ফিলিস্তিনীদেরকে ঘরছাড়া করেনি, বরং ফিলিস্তিনীরা নিজেরাই ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছে। বেশ, তাহলে ইহুদীরা তাদের ঘরবাড়িকে পবিত্র আমানত ভেবে যত্ন সহকারে সুরক্ষা করেনি কেন, এবং কেন তাদেরকে ঘরে ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানায়নি? তার পরিবর্তে ইহুদীরা ৫০টি দীর্ঘ ও দুর্ভোগপূর্ণ বছর ধরে তাদের [ফিলিস্তিনীদের] নিজ গৃহে ‘প্রত্যাবর্তনের অধিকারকে’ কঠোরভাবে অস্মীকার করেছে। আরো অবাক হবার ব্যাপার এই যে তারা এখন মনে করে: ইসরাঈল এবং ফিলিস্তিনী খৃস্টান তথা মুসলিমরা, কোন যুদ্ধ ছাড়া, ‘পবিত্রভূমিতে’ একই পরিসর ভাগাভাগি করে বসবাস করতে বাস্তবসম্মতভাবে একমত হবার জন্য ‘সম্ভবত’ আরো ৫০টি কঠিন বছর অতিক্রান্ত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এটাতো পরলোকে কল্পিত সুখ ছাড়া আর কিছুই না। এর সাথে দ্রুত বিকাশমান ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার কোন সম্পর্কই নেই। ইসরাঈলের জঘন্য নির্যাতন প্রতিদিনই তীব্রতর হয়ে চলেছে। অতিশীঘ্রই ইসরাঈল তার মিথ্যা বিজয় ও অহঙ্কারের শীর্ষে পৌঁছাবে, যখন সে পৃথিবীর ‘নিয়ন্তা রাষ্ট্রে’ পরিণত হবে। 

 

চলবে…..

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.