«

»

Jul ২৬

খলিফা

“ওয়াইজ ক্বালা রাব্বুকা লিলমালাইকাতি…… ক্বালা ইন্নি আলামু মা’য়ালা তায়ালামুন” (সুরা বাকারা-৩০) ঃ “আর (স্মরন কর) তোমার পালনকর্তা যখন ফেরেস্তাদের বললেন, ‘আমি পৃথিবীতে খলিফা সৃষ্টি করতে যাচ্ছি” তারা বলল, আপনি কি তথায় এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যারা অশান্তি ঘটাবে এবং রক্তপাত করবে? অথচ আমরাই তো আপনার প্রসংশাসহ তসবীহ ও পবিত্রতা ঘোষণা করি। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই আমি জানি যা তোমরা জান না।
উপরের আয়তটি পাক কোরআনের একটি সুপ্রসিদ্ধ আয়াত। বিষয়টির তফসির নয় বরং তা থেকে আমরা যে উপলদ্ধি ও শিক্ষা গ্রহন করতে পারি তা নিম্নে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করা হল।
আল্লাহ্ তাঁর সৃষ্টি, কর্ম এবং তাঁর বিশ্বজগৎ প্রতিপালন ও রক্ষানাবেক্ষনে স্বয়ংসম্পুর্ন এবং অমুখাপেক্ষী। তবুও পৃথিবীতে আদম সৃষ্টির প্রাককালে তাঁরই আর এক সৃষ্টি ফেরেশতাকুলের কাছে তাদের অভিমত চাওয়ার কি হেতু থাকেতে পারে? এই জাতীয় পরামর্শ গ্রহনের প্রয়োজনীয়তা থেকে তো আল্লাহ্ পাক সম্পুর্ন পবিত্র। তবুও প্রস্তাবিত বিষয়ে ফেরেশতাদের অভিমত চাওায়াতে বিশেষ তাৎপর্য ও মঙ্গল নিহত আছে। হয়তো এইরুপ সৃষ্টি বিষয়ে ফেরেশতাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকারও সমুহ সম্ভাবনা ছিল। আল্লাহর প্রস্তাবিত পৃথিবীতে প্রতিনিধি প্রেরনের গুঢ়অর্থ এও হতে পারে পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধির সালতানাত কায়েম, তথা শান্তি, শৃংখলা, সাম্য প্রতিষ্ঠাকল্পে প্রথিনিধিগন পরস্পর শলা-পরামর্শ করে মহান খেলাফতের দায়িত্ব পালন করবে। আদম সৃষ্টির পিছনে বিশ্বে তাঁর খেলাফত প্রতিষ্টার কথা ব্যক্ত করে ফেরেশতাদের পরীক্ষা নেওয়ার অভিপ্রায়ও থাকতে পারে।
যা হোক, আল্লাহ্ ফেরেশতাগণের অভিমত জানতে চাওয়ার প্রেক্ষিতে ফেরেশ্তাগন তাদের অভিমত এই বলে ব্যক্ত করেলেন যে, আপনি কি তাদেরকে সৃষ্টি করবেন, যারা সেখানে ফেতনা-ফ্যাসাদ করবে ও রক্তপাত ঘটাবে। মোট কথা, এই নতুন সৃষ্টির উপর খেলাফত ও শৃংখলা বিধানের দায়িত্ব অর্পনের হেতু তাদের বোধগম্য নয়। জবাবে তারা আরো বলেন, আমরাই তো আপনার গুনগান ও পবিত্রতা বর্ননা করছি। এ কথার পিছনে ফেরেশতাকুলের কোন অহমিকা ও ধৃষ্টতা ছিল না। কারন ফেরেশতা সৃষ্টির উপাদানের মধ্যে আল্লাহর নাফরমানী করা, আল্লাহর আদেশ লংঘন এই জাতীয় কোন উপদাদানই নেই। উপরন্তু তারা আল্লাহর আদেশ পালনে সদা তৎপর ও নিষ্কুলতার কারনে নিজেরা আল্লাহর প্রতিনিধির পদ পাওয়ার অধিকতর যোগ্য মনে করতেন। আর ফেরেশতাকুলের নিকট আদম জাতির পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি ও রক্তপাত ঘটানোর বিষয়টি সম্ভবতঃ পুর্ব অভিজ্ঞতা প্রসুত। কারন আদম সৃষ্টির পুর্বে জ্বিন জাতির পৃথিবীতে অবস্থান, তাদের বিশৃংখলা সৃষ্টি, আল্লাহ্‌ কর্তৃক ফেরেশতাদের মাধ্যমে তাদের দমন ও বিতারণ এগুলি তাদের অভিজ্ঞতায় ছিল এবং আদম সৃষ্টির উপাদানের মধ্যে এরুপ বিশৃংখলা সৃষ্টি ও আল্লাহর আইন লংঘনের উপাদান নিহিত আছে বলে ফেরেশতা এই জাতীয় অভিমত ব্যক্ত করেন।
কিন্তু আল্লাহ্‌ জানেন, এই আদম সৃষ্টির মধ্যে এমন উপাদানও নিহিত আছে যা আনুশীলনে মানবজাতি আল্লাহ্‌র সবচেয়ে সান্নিধ্যে উপণিত হবেন। তাদের মধ্য থেকেই হবেন আল্লাহ্‌র পয়গম্বর, সুহাদা, সালেহীন, গাওস-কুতুব এবং আল্লাহ্‌র সান্নিধ্যপাপ্তদল। তাই ফেরেশতাদের ধারনা, যে ভুল ও আমূলক তা আল্লাহ্‌ পাক শাসকোচিত ভঙ্গিতে বর্ণনা করে বলেন যে, বিশ্ব খেলাফতের প্রকৃতি ও আনুসাঙ্গিক প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তোমরা মোটেও ওয়াকেফহাল নও এবং তা কেবল আমি সম্পুর্ন ভাবে পরিজ্ঞাত। এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, যে বিষয়কে ফেরেশতারা খেলাফতের যোগ্যতার পরিপন্থি বলে মনে করছে প্রকৃত প্রস্তাবে সেটাই আদমের যোগ্যতার মূল উৎস ও প্রধান কারন। কেন না অশান্তি দূরীভুত করার উদ্দেশ্যেই বিশ্ব খেলাফত প্রতিষ্ঠা একান্ত আবশ্যক।
আয়াতটিতে বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয় যে, আল্লাহ্‌ পৃথিবীতে তাঁর খলিফা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেননি, পৃথিবীতে তিনি ইনসান(মানুষ) তৈরী করতে চান। আমরা যদি বলি এবং দাবী করি আমরাই সেই খলিফা এবং এটিই সত্য তাহলে এই দুনিয়ায় আল্লাহ্‌র প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আমাদের কি কি যোগ্যতা অর্জন করতে হবে? কি পরিমান আল্লাহ্‌র আইনে আনুগত থাকতে হবে? কি কি দোষ থেকে মুক্ত থাকতে হবে? কি পরিমান সাধনার প্রয়োজন হবে? সঙ্গে আমরা আমাদের আশরাফুল মাকলুকাত দাবী করি। এর জন্যও কি কি গুন ও যোগ্যতার প্রয়োজন?
আমরা আমাদের চারপাশে লক্ষ্য করলে দেখতে পাবো কোন দেশের সরকার প্রধান, কোন অফিস প্রধান অথবা যে কোন দায়িত্বে নিয়োজিত কোন কর্মচারী যখন কর্তব্য স্থলে অনুপস্থিত থাকেন কিংবা দায়িত্ব থেকে পৃথক হন তখন তাঁর কর্তব্য সম্পাদনের যোগ্য কাউকে দায়িত্ব অর্পন করেন অর্থাৎ প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। রাস্তা থেকে একটি লোক ধরে এনে চেয়ারে বসিয়ে দেন না। আল্লাহ্‌ এ দুনিয়ায় তাঁর প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সেই যোগ্যতারই প্রাধান্য দিয়ে আদম তৈরী করেছেন। আল্লাহ্‌ তাঁর সৃষ্টিকুলের রব এবং মানুষ এ পৃথিবীতে তাঁর বাহ্যিক প্রতিনিধি। মানুষ সাধনা ও চেষ্টার বলে আল্লাহ্‌র প্রতিনিধি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে।
তফসির ইবনে কাসির ও তফসিরে মারেফুল কোরআন-এ খলিফা বলতে খেলাফত তথা নবী-রাসুলগন, খলিফায়ে রাশিদীন এর দিকে ইঙ্গিত করার প্রয়াস পেয়েছেন কিন্তু অত্র আয়াতে ফেরেশতাদের জবাবে আল্লাহ্‌র খলিফা সৃষ্টির উত্তরে “সমস্ত আদম জাতি তথা সমস্ত মানব কুলকে বুঝিয়েছেন”। এটিই হয়তো সঠিক কারন নবী-রাসুলগনের গাইড/শিক্ষক আল্লাহ্‌ স্বয়ং এবং সমস্ত মানবকুল দুনিয়ার আল্লাহ্‌র প্রতিনিধি। আল্লাহ্‌ পাক অন্যত্র বলেছেন, “আমি জ্বিন ও ইনছান সৃষ্টি করেছি একমাত্র আমার ইবাদতের জন্য”। বর্তমানে আমরা ইবাদতকে মসজিদের চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেছি। অথচ “আল্লাহ্‌র রঙে রঞ্জিত হয়ে আল্লাহ্‌র দুনিয়ায় আল্লাহ্‌র আদেশ কায়েম করে প্রকৃত প্রতিনিধির দায়িত্ব পালনই প্রকৃত ইবাদত”। উদাহারন স্বরূপ, আমার চলার পথে পায়ের নিচে পিঁপড়া চাপা পড়তে যাচ্ছে দেখে আমি পা সড়িয়ে ফেললাম- আমি খলিফার কাজ করলাম। আবার পথে হেঁটে যেতে কোন প্রয়োজন নেই তবুও গাছ থেকে একটা ডাল টেনে ছিড়ে ফেললাম অথবা ভেঙ্গে ফেললাম- আমি খলিফার কাজ করলাম না। অতএব, খলিফার দায়িত্ব সুমহান।
উক্ত আয়াত সমস্ত মানবকুলের জন্য মর্যাদারবানী এবং সতর্কবানী। হে মানবকুল, তোমরা আল্লাহ্‌র প্রতিনিধি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন কর, আল্লাহ্‌র আইন প্রতিষ্ঠা কর, আশরাফুল মাকলুকাত হিসাবে নিজেকে আশরাফ রুপে গড়ে তোল। পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি কর না, অপরের সম্পদ অপহরন কর না, উপরুন্ত মিথ্যা পরিহার করো, সত্যের সাধক হও এবং এ পৃথিবীর সমস্ত মাকলুকের যথাযোগ্য বাস উপযোগী করে গড়ে তোল এবং রক্ষনা-বেক্ষন করো। সমস্ত জীবকুল ও উদ্ভিদ কুল যে যেখানে আছে, প্রত্যেকে যাতে তাঁর সুষ্ঠূ জীবনচক্র অতিবাহিত করতে পারে তাঁর নিশ্চয়তা বিধান কর। আল্লাহ্‌র দেওয়া “সুমহান মর্যাদা” এ পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি হওয়ার গৌরব অক্ষুন্ন রাখো। পাক-কোরআনের এই সুমহান বাক্য আমাদেরকে এই শিক্ষাই দেয়। এই একটি মাত্র মাক্যের পথ নির্দেশ আমাদের মানব জীবন সার্থক করে আমাদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনের সার্থকতার স্বর্ন শিখরে তথা চির কাঙ্ক্ষিত মঞ্জিল মকসুদে পৌঁছে দিতে পারে।
কবি আহসান হাবীবের “ফরমান” কবিতার শেষ ক’টি লাইনঃ
“মনে কর, মনে কর, প্রিয়তম হে বান্দা আমার,
ইবলিশের সাহংকার কি কথার জবাবের ভার,
তোমাকে দিয়েছি কবে;
রাখো, রাখো আমার সম্মান-
হে আমার প্রিয় সৃষ্টি, স্রষ্টাকে কর’না অপমান।”

১ comment

  1. 1
    মাহফুজ

    হাঁ, আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে খলিফার দায়িত্ব নিঃসন্দেহে সুমহান।
    কিন্তু সমাজে বিশৃঙ্খলা, অন্যায়, অনাচার, জুলুম চলতে থাকলে নিচের আয়াত অনুসারে খলিফার দায়িত্ব কিরূপ হওয়া চাই?
    আল্লাহতায়ালা আল-কোরআনে বলেন-
    (০৪:৭৫) আর তোমাদের কি হল যে, তেমারা আল্লাহর পথে লড়াই করছ না দুর্বল সেই পুরুষ, নারী ও শিশুদের পক্ষে, যারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদিগকে এই জনপদ থেকে নিষ্কৃতি দান কর; এখানকার অধিবাসীরা যে অত্যাচারী! আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য পক্ষালম্বনকারী নির্ধারণ করে দাও এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দাও।
    (০৮:৩৯) আর তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ কর, যে পর্যন্ত না ফেতনা অর্থাৎ কুফরী/ বিভ্রান্তি/ গোমরাহী/ পাপ/ উৎপীড়ন/ বিপর্যয়কর অবস্থার অবসান হয়, আর দ্বীন/ ধর্মের সবই তো আল্লাহরই (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) জন্য। অতঃপর যদি তারা বিরত হয়ে যায়, তবে আল্লাহ তাদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করেন।
    (০৮:৪৬) আর আল্লাহ তা’আলার নির্দেশ মান্য কর এবং তাঁর রসূলের। তাছাড়া তোমরা পরস্পরে বিবাদে লিপ্ত হইও না। যদি তা কর, তবে তোমরা কাপুরুষ হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব চলে যাবে। আর তোমরা ধৈর্য্যধারণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা রয়েছেন ধৈর্য্যশীলদের সাথে।
    (০৯:২৯) তোমরা যুদ্ধ কর ঐ লোকদের সাথে, যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে না এবং নিষিদ্ধ করে না- যা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন আল্লাহ ও তাঁর রসূল এবং তাদের সত্যধর্ম স্বীকার করে না যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা স্বেচ্ছায় ‘জিযিয়া’ প্রদান করে এবং তারা দমিত হয়।
    (০৯:৭৩) হে নবী, অবিশ্বাসী এবং মুনাফিকদের বিরুদ্ধে যিহাদ অর্থাৎ সংগ্রাম কর এবং তাদের প্রতি কঠোর হও। তাদের ঠিকানা হল দোযখ- নিঃসন্দেহে কত নিকৃষ্ট পরিনাম!
    (০৯:০৬) আর মুশরিকদের কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে তাকে আশ্রয় দেবে, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়, অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌছে দেবে। এটি এজন্যে যে এরা জ্ঞান রাখে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published.