«

»

Sep ১৫

নাস্তিক-মুরতাদ হত্যা প্রসঙ্গে কিছু কথা

এই লেখা পড়ে কে কী মনে করতে পারে; কারা হাসতে পারে, আর কারা কাঁদতে পারে; কাদের পক্ষে যেতে পারে, আর কাদের বিপক্ষে যেতে পারে – এগুলো দেখার বা এগুলো নিয়ে ভাবার মতো সময় নাই। হুজুরদের কেউ কেউ ঘরে বসে কিংবা মুরিদ-পরিবেষ্টিত হয়ে ফতোয়া দিচ্ছেন এই বলে যে, নাস্তিক-মুরতাদ'দেরকে হত্যা করতে হবে। তারা কিন্তু ফতোয়া দিয়েই খালাস। এই ধরণের ফতোয়া নিয়ে নিচে কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করা হচ্ছে।

প্রথমত:

– শুধুমাত্র বাংলাদেশে বসবাসরত নাস্তিক-মুরতাদ নাকি সারা বিশ্বের নাস্তিক-মুরতাদ'দেরকে হত্যা করা হবে? আর ইন্টারনেটের যুগে সকল নাস্তিক-মুরতাদ'দেরকে চিহ্নিতই বা করা হবে কী করে?

– কে বা কারা এই হত্যার দায়িত্ব পালন করবে?

– সত্যি সত্যি যখন কোনো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে তখন সেই হুজুররা হত্যাকাণ্ডের দায়ভার নিচ্ছেন না কেন? এমনকি কোনো ইসলামপন্থী দলই এইসব হত্যাকাণ্ডের দায়ভার নিচ্ছে না। অথচ তারা ইসলামের নামে এগুলোকে সমর্থন করছে। কী অবাক করা কাণ্ড!

– নাস্তিক-মুরতাদ'দেরকে হত্যা করা যদি 'ঈমানী দায়িত্ব' হয়ে থাকে এবং সেটা যদি 'রাসূল-প্রেমে'র চরম বহিঃপ্রকাশ হয়, তাহলে সেইসব হুজুরদের কেউ এই ধরণের হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ না নিয়ে নাম-না-জানা কিছু তরুণকে দিয়ে 'ঈমানী দায়িত্ব' পালন করা হচ্ছে কেন? এদিকে হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ইসলাম ও দুনিয়া সম্পর্কে অজ্ঞ-অসচেতন তরুণদেরকে সনাতনপন্থী মিশন্যারী অভিজিৎ রায় 'সহি ইসলামের অনুসারী সহি মুসলিম' বানিয়ে দিয়ে ইসলামকে একটি 'ভাইরাস ও জঙ্গি-সন্ত্রাসী ধর্ম' হিসেবে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সাইটে প্রচার করেছে। এমনকি সদালাপের লেখকদেরকেও সে ৯/১১-এর সাথে যুক্ত করে সন্ত্রাসী বলেছে। অবশ্য 'মা প্রকৃতি'র প্রতিশোধের হাত থেকে তার শেষ রক্ষা হয়নি। আর বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ফিটনেসের অভাবে জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে না পেরে সে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

দ্বিতীয়ত:

– নাস্তিক-মুরতাদের সংখ্যা যেমন নির্দিষ্ট না, তেমনি আবার 'নাস্তিক-মুরতাদ' টার্মদুটি সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িতও না। বরঞ্চ প্রতিটা ধর্মাবলম্বীদের মতো করে নাস্তিক-মুরতাদের সংখ্যাও কম-বেশি বেড়ে চলছে- সোজা কথায় এটা একটা চলমান বিষয়। তাহলে কি সারা বিশ্ব জুড়ে এই নাস্তিক-মুরতাদ হত্যা মিশনও চলতে থাকবে…? অধিকন্তু, মুসলিমদের মধ্যেই কথায় কথায় যাকে তাকে 'নাস্তিক/কাফের' আখ্যা দেয়া হচ্ছে। তাদেরকেও কি হত্যা করা হবে? কে বা কারা তাদেরকে হত্যা করবে?

তৃতীয়ত:

– নাস্তিক-মুরতাদ হত্যায় আল্লাহ্‌ বা রাসূল (সাঃ)-এঁর কোনো লাভ হচ্ছে কি-না কিংবা নিদেনপক্ষে তাঁদের কেউ খুশী হচ্ছেন কি-না, সেটা ফতোয়া দেয়া হুজুররা কিংবা হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া তরুণরা কোনোভাবে জানতে পারছে কি?

– যারা নাস্তিক-মুরতাদ হত্যার ফতোয়া দিচ্ছে এবং যারা তা কার্যকর করছে, তারা বাকিদের চেয়ে যে 'বেশি ইসলামপ্রেমী' – তার প্রমাণ কী?

– এই ধরণের হত্যাকাণ্ডে ইসলাম বা মুসলিমদের ঠিক কী লাভ হচ্ছে? বিপরীতটা কিন্তু দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার।

এই কতিপয় প্রশ্নেরই জবাব দিতে গেলে যেকেউ বুঝতে পারবেন যে, পুরোপুরি অবাস্তব জগতে বসে ইসলাম ও সারা বিশ্বের মুসলিমদের ভালো-মন্দ তোয়াক্কা না করে এই ধরণের ফতোয়া দিয়ে একদিকে যেমন মুসলিম পরিবারের কিছু তরুণের জীবনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে অন্যদিকে আবার এইসব বিচার-বহির্ভূত চোরাগুপ্তা হত্যাকাণ্ডের দায়ভার ইসলামের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে ইসলামের গায়ে 'জঙ্গি-সন্ত্রাসী' লেবেল সেঁটে দেয়ার পরিবেশও তৈরী করে দেয়া হচ্ছে। সেই সাথে ইসলামকে একটি চরম অবাস্তব দ্বীন হিসেবেও উপস্থাপন করা হচ্ছে। চিন্তা করে দেখুন- আগামীকাল থেকে সারা বিশ্ব জুড়ে চোরাগুপ্তা নাস্তিক-মুরতাদ হত্যা শুরু হয়ে গেলে কী অবস্থা হতে পারে, আর বাস্তবে সারা বিশ্বের নাস্তিক-মুরতাদদের হত্যা করা আদৌ সম্ভব কি-না?

১২ comments

Skip to comment form

  1. 12
    আফিয়া শিরিন শিশির

    সময় উপযোগী লেখা।তবে প্রবলেমটা হলো এই ধরনের লেখা থেকে নেট ব্যবহারকারীরাই ঠিক মতো পায় না let alone সাধারন মানুষ।তাই এই ব্যপারে সবার ব্যবস্থা গ্রহন করা উচিত বলে মনে করছি।না হলে লেখার উদ্দেশ্যটা তেমন রেজাল্ট আনতে পারবেনা।কিছু মনে না করলে লেখাটি ফেবুতে দিচ্ছি।কর্টেসি অবশ্যই আমার ফেবারিট রায়হান ভাইয়ার।

  2. 11
    ব্লগারাদিত্য

    লেখাটা অসাধারণ! প্রথমেই লেখক কে আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ধন্যবাদ।

    আমি গোলাম মোস্তফা'র লেখা "বিশ্বনবী" (সম্ভাবত বাংলাভাষায় লেখা হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর সবচেয়ে পরিপূর্ণ গ্রন্থ) পড়েছি। সেখানে নবীজির চরিত্রকে সেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তা পাঠ করে যে কোন সুবিবেচক ব্যক্তি এক কথায় স্বীকার করবে যে চরিত্রগত আদর্শের দিক দিয়ে তিনি একজন শ্রেষ্ঠ মহামানব।

    কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে আধুনিক মুসলিম সমাজে নবীজির চরিত্রগত আদর্শের সঠিক অনুসারী খুজে পাওয়া একান্তই দুষ্কর হয়ে দাড়িয়েছে। একটা ঘটনা জানি, "এক কাফের ব্যক্তি একদিন মসজিদের ভিতরে বসে প্রসাব করছিলেন, নবীজি তখন সহচরদের নিয়ে সেখান উপস্থিত হন। তার সাথে থাকা লোকেরা ঐ কাফেরকে হত্যা করতে উদ্যোত হলে নবীজি তাদের থামতে বলেন। নবীজি বলেন আগে ওকে ওর প্রাকৃতিক কাজ করতে দাও।"

    এহেন সহিষ্ণুতা যার চরিত্রে ছিল তার অনুসারীরা এখন সামান্য পান থেকে চুন খসলেই তাকে হত্যা করতে মুক্ত তরবারি হাতে ঝাপিয়ে পড়েন। সত্যিই দুঃখজনক !!!

    আর একটা বিষয় মনে রাখা উচিত, আজ ইসলামের জন্মের ১৫০০ বছর পরেও পৃথিবীর সকল মানুষ এটা গ্রহন করেনি, আগামীতে করবে সে সম্ভাবনাও কম। আর ধরে নিলাম যদি করেও তাতেও কি পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে? ইসলামের অনুসারীরা কি একে অন্যের সাথে মারামারি-ঝগড়াঝাটি করে না? সিয়া সুন্নীদের পারষ্পরিক বিরোধ কে ত অস্বীকার করতে পারেন না।

    যা-ই হোক আমার বক্তব্য হচ্ছেঃ বিশ্ব শান্তির প্রয়োজনে সবাইকে সহিষ্ণুতার পরিচয় দিতে হবে। লক্ষ্য করবেন আমি কিন্তু সবাইকে সহিষ্ণুতার পরিচয় দিতে বলছি, শুধু ইসলাম কে নয়। তাহলেই পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

    লেখকের বেশকিছু লেখা আমার খুব ভাল লেগেছে, কিছু কিছু লেখায় দ্বিমতও আছে। পরিশেষে আবারো ধন্যবাদ।

  3. 10

    ভালো লিখেছেন

  4. 9
    সত্য সন্ধানী

    খুব সময়োপযোগী লেখা। এটার দরকার ছিল।

  5. 8
    মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন

    আল্লাহ বলেছেন দ্বীনের ব্যাপারে জোরাজোরি নেই। তাহলে মোল্লারা কোথায় পায় এই ফতোয়া?

  6. 7
    তাহমিদ ইসলাম

    লেখাটি ভালো হয়েছে…

  7. 6
    মাহফুজ

    ভাল লিখেছেন। এ বিষয়ে ইসলাম কি বলে সেটাও তুলে ধরা প্রয়োজন-

    এখানে আমন্ত্রণ- আস্তিক-নাস্তিক ও বিশ্বাস প্রসঙ্গে

  8. 5
    জামশেদ আহমেদ তানিম

    পরমত সহিষ্ণুতা অনেক বড় একটা গুণ। কোন সিস্টেম, আদর্শ যদি সমালোচনা, বিরোধী মতের জন্য স্পেস না রাখে তাহলে সেই সিস্টেম এবং আদর্শ বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না। ভালো উদাহরণ হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন।

    সমালোচনা থাকবে, কু-মন্তব্য থাকবে তাই বলে গলাটিপে ধরা যাবে না যতক্ষন পর্যন্ত না আমার গলাটিপে ধরা হবে। আমরা মুসলিমরা এবং যারা নিজেদেরকে ইসলামের অনুসারী বলে মনে করি তাদের উচিত এসব বিষয়ে খেয়াল করা, তা না হলে কম্যুনিস্টদের সাথে আমাদের কোন পার্থক্য থাকলো না।

  9. 4

    shabaz nazrul vai,

    era 2i jon 2idik thek fanatic tai eder maje onek similarities character..

    Amar Universityte amar onekgula atheist bondhu ase ami khub objectively notice korsi j tara khub fanatic.

  10. 3
    আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

    মাদার নেচারের বাংলা অনুবাদটা চমৎকার হয়েছে। 

  11. 2
    শাহবাজ নজরুল

    ভালো লিখেছেন। মুক্তমনা আর নাস্তিক-মুরতাদ নির্মুলী পার্টি একে অপরের পারপাস সার্ভ করে। এদের মধ্যে এক অদ্ভুত সিমবায়োটিক রিলেশন আছে। এরা একে অপরের অক্সিজেনে শ্বাস নিয়ে টিকে থাকে। 

  12. 1

    This is a very effective post, because fanaticism and Islam are two different term but the western media published it as a same term but intentionally….

Leave a Reply

Your email address will not be published.