«

»

Nov ২১

হে ঈমানদারগন তোমরা ইহুদী ও খৃীষ্টানদেরকে নিজেদের বন্ধু হিসেবে গ্রহন করো না (পর্ব-২)

পর্ব-২/৪: অটোমান সম্রাজ্যের পতন

আমার প্রথম পর্বে মোটামুটি সংক্ষিপ্ত আকারে ইউরোপের জাতীগত যুদ্ধ ও তার ফলাফলের উপর আলোকপাত করেছি। এ পর্বে মূলত মুসলিম খেলাফত হিসেবে পরিচিত অটোমান সম্রাজ্যের বিষয়টি আলোকপাত করার চেষ্টা করবো। প্রায় ১৫১০ সালে মামলুক সম্রাজ্য দখলের মধ্য দিয়ে অটোমান সম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হয় যা সমগ্র আরব ও উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। অটোমান সম্রাজ্য তার্কী, কুর্দ, গ্রীক, আর্মেনিয়া, বোসনিয়া, সারবিয়া, পারসিয়া, আরব সহ পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসা বহুজাতীর সংস্কৃতি ও ভাষা ভাষির মানুষের সমন্বয়ে হলেও এর নের্তৃত্বে ছিল মূলত তুরুস্কের মুসলিম নের্তৃত্তের আধিপত্য। অটোমান সম্রাজ্যের শেষ সুলতান ছিলেন ৫ম সুলতান মাহমেদ যিনি ১৯০৯ থেকে ১৯১৮ পর্যন্ত খেলাফতের শাসনভারের দায়িত্বে ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সম্রাজ্যের সুলতান রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দুঃখ জনক হলেও সত্য যে সে সময় সুলতান মাহমেদ ছিলেন খেলাফতের মূলত একজন প্রতিকী পুতুল শাসক মাত্র। বরং শাসক শ্রেনীর মধ্য থেকে তৎকালিন ইউরোপিয়ান শিক্ষায় শিক্ষিত সেকুলার মানসিকতার কিছু সংখ্যক তরুন নের্তৃত্ত সুলতানকে উপেক্ষা করে খেলাফতের নের্তৃত্বের দায়িত্ব সুলতানের পক্ষে পরিচালনা করতো। অনেকটা আমাদের হাওয়া ভবনের মত। যদিও ইসলামিক শরীয়া তথা কোরআন ও রসুলের সুন্নাহতে এ ধরনের কাজকে সম্পূর্নভাবে নিষেধ করা হয়েছে কিন্তু বেশীরভাগে মুসলিম রাষ্ট্র এমন কি মুসলিম সমাজ বা পরিবারে এ ধরনেরই উদাহরনই বেশী পরিলক্ষিত হয়। যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় তখন কিছু সংখ্যক সেকুলার, ইউরোপিয়ান আধুনিক মানসিকতার তথাকথিত মডারেট তুর্কী মুসলিম তরুন অটোমান সুলতানের কাঁধে বন্ধুক রেখে মূলত খেলাফতের শাসনভার পরিচালনা করছিল। যুদ্ধ শুরুর অনেক আগেই অটোমান সম্রাজ্যের বিশাল একটা অংশ ফরাশী, ব্রিটিশ, জার্মান কোলনিয়ালদের দ্বারা দখল হয়ে যায়। প্রযুক্তির দিক থেকে অটোমান ছিল অনেক পশ্চাৎপদ। প্রযুক্তির জন্য তাদেরকে নির্ভর করতে হতো পশ্চিমা ইউরোপিয়ানদের উপর। অবশ্য এখনও মুসলিম বিশ্ব যে কোন প্রযুক্তির জন্য পশ্চিমাদের‌ই উপর নির্ভরশীল তা বলাই বাহুল্য। ১৮০০ সালের দিকে প্রযুক্তির জন্য অটোমান সম্রাজ্য ব্রিটিশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ১৮৮০ সাল বা তার কিছু পূর্ব থেকে যখন ব্রিটিশ ও অটোমান সম্রাজ্যের সম্পর্কের অবনতি ঘটে তখন অটোমান সুলতান জার্মানের সাথে সুসম্পর্ক তৈরী করে। এই সময় জার্মান ও অটোমানের মধ্যের সুসম্পর্ক এতটাই দৃঢ় হয় যে জার্মান সম্রাট কাইজার জার্মানির মিউনিক শহর থেকে সরাসরি তুরুস্কের ইস্তাম্বুল পর্যন্ত বিস্তৃত বিখ্যাত অভিজাত এক্সপ্রেস ওরিয়েন্ট রেলওয়ে চালু করে।

যাই হোক ১৯১৪ সালের দিকে অটোমান সুলতান যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকার অঙ্গিকার করলেও অটোমানের ভিতরের তরুন তুর্কী নের্তৃত্ব ইনভার পাশা সুলতানের অজ্ঞাতে এবং বিনা অনুমতিতে গোপনে জার্মানদের সাথে যুদ্ধচুক্তি করে জার্মান-অটোমান এ্যালাইন্স তৈরী করে। এই চুক্তির ফলে প্রকাশ্যে জার্মানদের সাথে এ্যালাইন্স ঘোষনা করা ছাড়া সুলতানের পক্ষে কোন পথই খোলা থাকে না। ফলে ১৯১৪ এর নভেম্বর মাসে সুলতান সরকারীভাবে জার্মান-অটোমান এ্যালাই ফোর্সের পক্ষে ব্রিটিশ-রাশান-ফ্রান্স-ইটালী এ্যালাই ফোর্সের বিরুদ্ধে “জিহাদ” এর ঘোষনা দিতে বাধ্য হন। পাঠক লক্ষ্য করুন কিভাবে মুসলিমরা দুনিয়ায় ক্ষমতার লোভে জার্মান নাসারাকে তাদের আউলিয়া বা রাজনৈতিক বন্ধু হিসেবে গ্রহন করলো যা কোরআনের ঐ আয়াতে আল্লাহ’র দেয়া পরামর্শের পুরাটাই পরিপন্থী কাজ। যদিও আমাদের সমকালিন মডারেট সেকুলার মুসলিমদের যুক্তি এটা নিতান্তই রাজনৈতিক এ্যালাই ছিল ইসলাম ধর্ম বা শরীয়ার সাথে সম্পৃক্ত কিছু নয়। কিন্তু মুসলিম উম্মা বা ইসলামী শরীয়তের ক্ষতি সাধন করবে এমন কাউকে যে কোন ধরনের পরামর্শক এ্যালাই হিসেবে গ্রহন করাকেই ঐ আয়াতে ‌আল্লাহ সোবহানা তালা মুসলিমদের জন্য পরামর্শ দিয়েছেন বলেই ইসলামিক চিন্তাবিদরা মনে করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয় যে, ইসলামের আখেরী নবী মোহাম্মদ (সাঃ) যখন মদিনায় বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় গোত্রদের (তিন গোত্রের ইহুদী সম্প্রদায় সহ) সাথে বৃহত্তর প্রতিরক্ষামূলক এ্যালাই গঠন করেছিলেন (যা কিনা মদিনা সনদ নামে মানব সভ্যতার ইতিহাসে পরিচিত) তখন রসুল(সাঃ) নিজে তার উদ্দ্যগতা এবং নের্তৃত্তে ছিলেন। তিনি (সাঃ) মুশরিক বা কাফির কাউকে তাঁর পরামর্শক এ্যালাই হিসেবে গ্রহন করেননি বা সে ধরনের সুযোগও দেননি। যাই হোক অটোমান সম্রাজ্যের এই ধরনের হটকারী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলে ব্রিটিশ এ্যালাই ফোর্সের জন্য অটোমান সম্রাজ্য আক্রমন করা ফরজ হয়ে পড়ে। যুদ্ধের কয়েক মাসের মধ্যে ১৯১৫ সালের এপ্রিল মাসে ব্রিটিশ এবং ফ্রান্স যৌথভাবে অটোমান সম্রাজ্যকে আক্রমন করে বসে, উদ্দেশ্য ইস্তাম্বুল দখল করা। এটাই সর্বপ্রথম ব্রিটিশ ও ফ্রান্সের যৌথবাহিনীর দ্বারা অটোমান সম্রাজ্য আক্রান্ত হয় যা কিনা ইতিহাসের পাতায় “গ্যালি পোলী” ক্যাম্পেইন হিসেবে পরিচিত। ৮ মাস ব্যাপি এই যুদ্ধে অটোম্যান বাহিনীর পক্ষে তার্কির তরুন যোদ্ধা সেকুলার মানসিকতার মোস্তাফা কামাল আতাতুর্ক নের্তৃত্ব দেন। এই যুদ্ধে অটোম্যান বিজয়ী হলেও অটোম্যানের আন্যান্য অঞ্চল ব্রিটিশ-ফ্রান্স এ্যালাই শক্তির দখলে চলে যায়। ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ ইরাকে আগ্রসন করে এবং ১৯১৭ সালের মার্চের মধ্যে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী ইরাকের রাজধানী বাগদাদ দখল করে অটোম্যান সম্রাজ্যের পতাকা নামিয়ে ব্রিটিশ পতাকা উত্তোলন করে।

অন্য ফ্রন্টে তৎকালিন ব্রিটিশ সরকার জেনারেল এ্যাডমনড এ্যালেনবি’কে মিশরের দায়িত্বে নিযুক্ত করে এবং জেরুজালেমকে একই বছরের ক্রিসমাসের আগেই দখল করার নির্দেশ দেন। জেনারেল এ্যালেনবি তার উপর অর্পিত এই দায়িত্ব পালনের জন্য টি.ই.লরেন্সকে তৎকালিন মাসিক ২০০ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড বেতনে আরব নের্তৃত্বের জন্য পরামর্শক হিসেবে নিযুক্ত করেন। উদ্দেশ্য অটোমান মুসলিম খেলাফতের মধ্যে আরবের মুসলিম ও নন-আরব মুসলিমদের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করা এবং নন-আরব মুসলিম এবং আরব মুসলিমদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ বেঁধে দেয়া। আরবের নের্তৃত্বের মধ্যে স্পাই হিসেবে লরেন্সের এই ভূমিকা নিয়ে বিখ্যাত হলিউডের সিনেমা “লরেন্স অব এ্যারিবিয়া”র কথা আমার হয়তো অনেকেই জানি। জেনারেল এ্যালেনবি মিশর থেকে কতগুলো সাকসেসফুল যুদ্ধ পরিচালনা করতঃ ক্রমান্বয়ে আগ্রসর হয়ে গাঁজা, জাফ্ফা উপত্যকা থেকে শুরু করে শেষ পর্যায়ে ১৯১৭ সালের ৯ই ডিসেম্বরে ফিলিস্তিন সহ জেরুজালেম দখল করেন এবং জেরুজালেমকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী’র ক্রিসমাস উপঢৌকন হিসেবে উপহার দেন। ১৯১৮ সালের অক্টোবর মাসে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী সিরিয়ার দামেস্কাস দখল করার মধ্য দিয়ে মুসলিম খেলাফতের বৃহৎ রাজধানী শহরগুলোর দখল কার্য সম্পন্ন করে। এবং ১৯১৮ এর ১৩ই নভেম্বরে ব্রিটিশ-ফ্রান্স এর যৌথবাহিনী তার্কীর ইস্তাম্বুল দখল করার মধ্য দিয়ে সমগ্র মুসলিম অটোমান খেলাফতের শোচনীয় পতন ঘটায়। ইস্তাম্বুলের পতনের মাধ্যমেই মূলত নাসারাদের হাতে মুসলিম খেলাফতের অহঙ্কার সকল বৃহৎ ও ম্যাগনিফিসেন্ট রাজধানী শহরগুলো যথা বাগদাদ, দামেস্কাস, ইস্তাম্বুল এবং অবশ্যই পবিত্র শহর জেরুজালেমের শুধু প্রতিকী পতন ঘটেনি বরং প্রকৃতঅর্থই পতন ঘটেছে। মুসলিম খেলাফতের এহেন রাজনৈতিক পতন শুধু যে রাজনৈতিক পতন তা নয় বরং সমগ্র মুসলিম উম্মার মর্যাদার উপর ইউরোপিয়ান নাসারাদের একধরনের চপেটাঘাত, যা সম্ভব হয়েছিল মুসলিম নের্তৃত্তের রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আকাঙ্খা চরিতার্থ করার চরম বাসনা থেকে যার মাধ্যমে শয়তান তাদেরকে কোরআনের উক্ত আয়াতগুলোতে দেয়া আল্লাহ’র পরামর্শকে অমান্য করতে অনুপ্রেরণা যোগায়। আল্লাহ সোবহানা তালা পবিত্র কোরআনে মুসলিমদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন “তোমরা যদি আয়াতে নির্দেশিত পথে না চলো তবে আমার কোন ক্ষতি হবে না বরং তোমাদের নিজেদেরই ক্ষতি হবে”। অটোমান ও আরব মুসলিমদের কোরআনের উক্ত আয়াতের পরামর্শ পরিপন্থী হটকারিতার কারনে যেমন নিজেদের ক্ষতি হয়েছে তেমনি সামগ্রীকভাবে মুসলিম খেলাফতের পতনে কোরআনের এই কথাই পরিপূর্নভাবে বাস্তবায়নের পরিচয় বহন করে। (অসমাপ্ত)
 

২ comments

  1. 2
    রাসেল ইউসুফী

    অসাধারণ! অনেক কিছু জানতে পারলাম। ধন্যবাদ ভাই করতোয়া।

  2. 1
    Momtaz Begum

    হজরত আলীর সাথে বিবি আয়শার যুদ্ধের কারন কি? ইব্রাহিম লোদীর সাথে সম্রাট বাবরের যুদ্ধে?  তালেবানদের সাথে পাকিস্তানী সৈন্যদের সংঘাত বাঁধে কেন? সিরিয়ায় যুদ্ধ কেন??

    এরা তো সবাই মুসলমান। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.