«

»

Oct ২০

তাকদীর দ্বিধা নয়; কম্পিউটারাইজড প্রযুক্তির দিকে আঙ্গুলি নির্দেশন!

প্রথম অংশঃ

তাকদীর বিশ্বাস ঈমানের অঙ্গ। একজন মুসলমানকে এটা অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে আমরা যা করছি, যা করব, যা অর্জন করছি, যা হারাচ্ছি, আমাদের সৌভাগ্য, আমাদের দুর্ভাগ্য সবই পূর্ব নির্ধারিত। লওহে মাহফুজ সৃষ্টির আদিতে যখন সমগ্র মহাবিশ্বের যাবতীয় ভবিষ্যত লিখেছে, তখন সব মানুষের ভাগ্যও বিস্তারিতভাবে লেখা হয়েছে। এ হলো ইসলামি শরিয়া ভিত্তিক তকদীরের মূলনীতি, যাতে বিশ্বাসের বিন্দু মাত্র বিচ্যুতি ঈমানকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিবে। সেই সাথে আপনাকে এও বিশ্বাস করতে হবে যে- মহান রব পরম করুনাময় অসীম দয়ালু, তিনি হলেন সর্বশ্রেষ্ট ন্যায় বিচারক, তিনি কারো প্রতি বিন্দু মাত্র জুলুম করেন না, সকলেই তার কৃতকর্মের ফল ভোগ করবে অক্ষরে অক্ষরে। 

 

আসলে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে আপনি যদি উপরের অংশটুকু লক্ষ্য করেন- তাহলে দেখবেন ব্যাপারটা কেমন যেন গোলমেলে দেখায়। কারণ ঈমান রক্ষার জন্য আপনাকে তকদীরের উপর পূর্ণ আস্থা রাখতে হবে এবং মহান রবকে মহান বলেই স্বীকার করতে হবে! যদিও মহান রব পূর্ব থেকেই সব কিছু (আপনার ভাগ্য) নির্ধারণ করে রেখেছেন, তথাপি আপনার দ্বারা কৃত কর্মের ফল আপনাকেই ভোগ করতে হবে এবং এর জন্য সম্পূর্ন দায় ভার আপনার; আর যেই মহান রব পূর্বেই সব কিছু (আপনার কর্ম) নির্ধারন করে রেখেছেন এর জন্য কোন দায় ভার উনি (মহান রব) নিবেন না। এতে কোন প্রশ্নও করতে পারবেন না, কারণ অনন্ত কালের জান্নাত আপনার জন্য হারাম হয়ে যাবে; তাই কোন প্রশ্ন নয়, মহান রব যেই ভাবে বলেছে আমরাও সেই ভাবেই বিশ্বাস করবো। 

 

আসলেও কি ব্যাপারটা তাই; কুরআন ও হাদিসের আলোকে তকদীরের বর্ননা কি এলোমেলো বা পরস্পর সাংঘর্ষিক? মহান রব কি এমন ভূল করেছেন (নাউযুবিল্লাহ) যা সাধারণ জ্ঞানে যুক্তিহীন প্রমাণ করা যায়! আর মহান রব যদি এমন সাধারন ভুল করে থাকেন; তাকে মহান বলা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে আমরা তাকে কি মহান জ্ঞানী বলে কি বিশ্বাস করতে পারি!

 

সৃষ্টির আদিতে লওহে মাহফুজে সব মানুষের ভাগ্যও বিস্তারিতভাবে লেখা হয়েছে; সুতরাং লওহে মাহফুজে যা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে সেই অনুযায়ে মানুষ পৃথিবীতে জীবন-যাপন করছে। তাহলে মানুষের কর্ম তো আগেই নির্ধারণ করা হয়েছে, আর যা লিখা আছে তাই তো মানুষ করছে; তাহলে এর দায় ভার মানুষ বহন করবে কেন? আবার মহান রবও (যিনি কর্ম নির্ধারণ করেছেন এবং যার ইচ্ছায় সব কিছু হচ্ছে তিনিও) দায় ভার নিবেন না! এমন সাংঘর্ষিক তথ্যগুলো আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে আমরা কি ভাবে মেনে নেই? এমনটাই হয়তো অনেকে বলে থাকেন। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি- এই সাংঘর্ষিক (আমাদের সাধারন যুক্তিতে যা সাংঘর্ষিক মনে হচ্ছে) তথ্যগুলো আসলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নির্দেশ করছে। যা আমাদের আধুনিক প্রযুক্তি থেকেও উচ্চতর কোন প্রযুক্তির দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করছে। আমার এই বক্তব্য হয়তো অনেকের কাছে উদ্ভট মনে হতে পারে, তবে আমি এখানে তাই তুলে ধরাবো এবং ৪টা পর্বে প্রমাণ করার চেষ্টা করবো।

 

দ্বিতীয় অংশঃ

লওহে মাহফুজ সৃষ্টির আদিতে যখন সমগ্র মহাবিশ্বের যাবতীয় ভবিষ্যত লিখেছে, তখন সব মানুষের ভাগ্যও বিস্তারিতভাবে লেখা হয়েছে। অর্থাৎ আমাদের কর্ম নির্দেশক (কমান্ড) ডাটাগুলো লওহে মাহফুজে সংরক্ষিত (লিখিত) আছে, আর সে অনুযায়ে সকলেই তার কর্ম করে যাচ্ছে। সৃষ্টির আদিতে নির্ধারণ করে দেওয়া কর্ম গুলোই আপনি করে যাচ্ছেন, তারপরও আপনার কর্মের ফল আপনাকেই ভোগ করতে হবে, এর দায় ভার শুধু আপনার, এর জন্য আপনি কেউ কে-ই দায়ী করতে পারেন না; আপনি মেনে নিন আর না নিন এটাই সত্য। এটা উপলব্ধি করার আগে আমাদের প্রথমে যে বিষয়টি বুঝতে হবে তা হলো-
লাওহে মাহফুজ কি?
এতে আমাদের ভাগ্য কিভাবে লিখা আছে?

এবং আল্লাহর ইচ্ছায় যেহেতু সব কিছু হচ্ছে-
সুতরাং আল্লাহর ইচ্ছাটা কি?

লওহে মাহফুজ কি?

লওহে মাহফুজ কি এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে দুষ্কঃর। তবে লওহে মাহফুজে যেহেতু মহাবিশ্বের যাবতীয় ভবিষ্যত লিখা আছে, আর মহাবিশ্ব সে অনুযায়ে পরিচালিত হচ্ছে। তাহলে বলা যায়, লওহে মাহফুজ হলো অতি উচ্চ ক্ষমতা ও প্রযুক্তি সম্পূর্ণ এমন এক কম্পিউটার, যাতে নির্দেশক (কমান্ড) ডাটাগুলো সংরক্ষিত এবং লওহে মাহফুজ সে অনুযায়ে মহাবিশ্বকে নিয়ন্ত্রন করছে, সাথে আমাদের সব কিছু। এখানে লওহে মাহফুজকে কম্পিউটারের সাথে তুলনা করা হয়েছে। কারণ সৃষ্টির আগে আল্লাহতালা লাওহে মাহফুজে সব কিছু লিখেছেন, তারপর সৃষ্টি করেছেন; এবং যা লিখা হয়েছে সেই অনুযায়ে মহাবিশ্ব পরিচালিত হচ্ছে। তাহলে বলা যায়, লাওহে মাহফুজে যা লিখা হয়েছে তা হলো নির্দেশাক (কমান্ড); যা অনুসারে মহাবিশ্ব পরিচালিত হচ্ছে। আর মহাবিশ্ব সহ সকল কিছুর এই বিধি-বিধানগুলো লাওহে মাহফুজে পর্যায়ক্রমিক ভাবে লিখা হয়েছে বলে আমরা ধরে নিতে পারি।

আর কম্পিউটারের মাধ্যমে কোন সমস্যা সমাধানের জন্য যখন পর্যায়ক্রমে নির্দেশাবলীকে সাজানো হয়, তখন এই নির্দেশাবলী সাজানোর কৌশলকেই বলে প্রোগ্রামিং; এবং একটি পূর্নাঙ্গ প্রোগ্রামকেই আমরা বলে থাকি সফটওয়্যার, যা কম্পিউটারে সেটআপ দিয়ে বিভিন্ন কাজ করে থাকি। আর প্রোগ্রামে যে যে নির্দেশাবলী (কমান্ড) দেওয়া আছে কম্পিউটারটি সে অনুযায়ে-ই কাজ করে থাকে। তাহলে আমরা যখন কোন একটি সফটওয়্যার দিয়ে কোন কার্য করে থাকি, তখন প্রাপ্ত সকল ফলাফল-ই পূর্বে থেকে নির্ধারন করে দেওয়া থাকে প্রোগ্রামটিতে। আর একই দৃষ্টিভঙ্গীতে যদি দেখি, তাহলে লাওহে মাহফুজকে কম্পিউটার (হুবুহুব মানব নির্মিত কম্পিউটারের মত নয়) এবং লিখিত নির্দেশাবলীকে প্রোগ্রামের সাথে তুলনা করা হয়তো অমুলক কিছু হবে না; গ্রহন করার দায় ভার পাঠকবৃন্দের কাছে।

লাওহে মাহফুজে আমাদের ভাগ্য কি ভাবে লিখা আছে?

এখানে যেহেতু লাওহে মাহফুজকে আমি কম্পিউটারের সাথে এবং লিখিত নির্দেশাবলীকে কম্পিউটারের প্রোগ্রামের সাথে তুলনা করেছি। সুতরাং এ কথা এখানে স্পষ্ট যে লাওহে মাহফুজে আল্লাহতালা যা লিখেছেন তাহলো প্রোগ্রাম, আর সে অনুযায়ে মহাবিশ্ব সমেত সব কিছু চলছে; যার বিন্দু মাত্র বিচ্যুতির অবকাশ নেই। যদিও আমাদের তৈরিকৃত কম্পিউটারে কোন প্রোগ্রাম সেটআপ করে কাজ করার সময় ত্রুটি লক্ষ্য করা যায়।

পূর্বেই আলোচনা করেছি, প্রোগ্রাম হলো- ‘কোন সমস্যা সমাধানের জন্য পর্যায়ক্রমে নির্দেশাবলীকে সাজানো’। আর কম্পিউটারের মাধ্যমে আমরা যে কাজটি করি; কোন প্রোগ্রাম সেটআপ করার পর- কিবোর্ড, মাউস অথবা অন্য কোন ইনপুট ডিভাইস দিয়ে যদি কমান্ড করি তাহলে প্রসেসর কমান্ড কৃত ডাটাকে প্রোগ্রামের নির্দেশাবলীর দ্বারা এনালাইসিস করে একটি ফলাফল প্রদর্শন করবে। এখন আপনি কিবোর্ড, মাউস অথবা অন্য সকল ইনপুট ডিভাইস দিয়ে অনেকগুলো কমান্ড করতে পারবেন। তবে কমান্ডের পর প্রাপ্ত যতগুলো ফলাফল-ই আসুক, সবগুলো-ই প্রোগ্রাম দ্বারা নির্ধারিত। আর একজন দক্ষ প্রোগ্রামার অবশ্যই বলে দিতে পারবে, আপনার ইনপুট কৃত কমান্ডের প্রেক্ষিতে কি ফলাফল পাওয়া যাবে; আর ফলাফলও প্রোগ্রামার কর্তৃক নির্ধারিত করে দেওয়া। এখানে আপনার কিবোর্ড, মাউস ও অন্য কোন ইনপুট ডিভাইস দিয়ে কমান্ড করার স্বাধীনতা আছে, এক্ষেত্রে ফলাফল তৈরি করবে প্রোগ্রামটি; প্রোগ্রামার যে ভাবে প্রোগ্রামিং করেছেন তার উপর ভিত্তি করে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, এখানে আপনার একটা স্বাধীনতা আছে কমান্ড করার, কিন্তু ফলাফল পূর্বে থেকেই নির্ধারন করা। তবে কি ফলাফল পাবেন তা নির্ভর করছে আপনার কমান্ডের উপর।

ঠিক অনুরুপ ভাবে লাওহে মাহফুজে সব-ই লিখা আছে, লিখা আছে আপনার তাকদীর (কম্পিউটারের প্রোগ্রামের মত), শুধুমাত্র আপনি-ই তাকদীরের ফলাফল নির্ধারন করাবেন- আপনার কর্মের মাধ্যমে। অর্থাৎ আপনার রয়েছে কর্মের স্বাধীনতা, আপনি ভাল বা মন্দ যা চান তাই করতে পারবেন। আর আপনার কর্মকে লাওহে মাহফুজ এনালাইসিস করে নির্ধারন করবে আপনার গন্তব্য স্থান বা আপনার ভবিষ্যত। আর হয়তো এজন্য-ই আল্লাহতালা কুরআনে এরশাদ করেন- “যে জাতি নিজের ভাগ্য নিজে পরিবর্তন না করে আল্লাহর করার কিছুই থাকেনা”। এর অর্থ কি, তাকদীর কি পরিবর্তনশীল? না, তাকদীর অপরিবর্তনীয়, কম্পিউটার প্রোগ্রামের মত তাকদীর লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত, এর বিন্দু মাত্র বিচ্যুতি নেই। তাহলে উক্ত আয়াতের অর্থ কি? এর অর্থ হতে পারে, আপনি যখন মন্দ কাজ করছেন, তখন লাওহে মাহফুজ আপনার ভবিষ্যত যা নির্ধারন করছে তা-ই হবে, আল্লাহ এতে হস্ত্যক্ষেপ করবেন না; এখন আপনি যদি মন্দ কাজ বাদ দিয়ে ভাল কর্ম করেন তাহলে লাওহে মাহফুজও আপনার ভবিষ্যত তেমন-ই ভাবে নির্ধারন করবে। এজন্যই আল্লাহতালা আমাদেরকে ভাল ও মন্দ সম্পর্কে জ্ঞান দিয়েছেন, বার বার ভাল কর্ম করার তাগিদ দিয়েছেন, মন্দ কাজ পরিহার করতে বলেছেন। এবং ভাল ও মন্দ কাজের ফলাফল কি হবে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। প্রত্যেকেই তার অনু-পরমানু পরিমান ভাল বা মন্দ কর্মের ফল ভোগ করবে, আল্লাহ কারো উপর যুলুম করেন না, তিনি হচ্ছেন শ্রেষ্ঠ বিচারক, মহান আল্লাহতালা তো পরম করুনা ময় অসীম দয়ালু। আর আল্লাহর এই মহান গুণ গুলো কখনোই বলে না, মহান আল্লাহতালা কোনো মানুষের তাকদীর সরাসরি লিখে রেখেছেন বলেই মানুষ সেই অনুযায়ী কর্ম করে যাচ্ছে। আল্লাহ মানুষকে কর্মের স্বাধীনতা দিয়েছেন, আর কর্ম অনুসারে ফলও দিবেন। যদিও তাকদীর নির্ধারিত, তার পরও বলছি কর্মের স্বাধীনতা আপনার আছে, আপনি ইচ্ছা করলেই ভাল কর্ম করতে পারবেন, ইসলামের ছায়াতলে আসুন, আল্লাহর কথামত চলুন, দেখবেন আপনার তাকদীরের ফলাফলও ভাল হবে।

 

তৃতীয় অংশঃ

আল্লাহর ইচ্ছায় যেহেতু সব কিছু হচ্ছে- সুতরাং আল্লাহর ইচ্ছাটা কি?

আমরা প্রায়-ই বলে থাকি আল্লাহর হুকুম ছাড়া একটি গাছের পাতাও নড়ে না! হ্যাঁ অনেকে হয়তো পজেটিভ দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে এই উক্তিটি করে থাকেন। তবে অনেকে বলেন- নেগেটিভ দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে। অর্থাৎ নিজের পাপ কর্মের দায় ভার আল্লাহর উপড় চাপানোর জন্য (নাউযুবিল্লাহ)! যেমন আল্লাহর হুকুম ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না, সুতরাং আমি যে পাপ কর্ম করছি তা আল্লাহ হুকুমে-ই করছি (অনুরুপ ভাবে আরো বলে থাকেন, আল্লাহতালা আমার তাকদীর যা নির্ধারণ করে রেখেছেন আমি তাই করে যাচ্ছি)। আর এই সমস্যা উত্তরণের জন্য-ই আপনাকে বুঝতে হবে প্রথমেঃ আল্লাহর ইচ্ছাটি কি?

আর আমি এখানে তাকদীর বিষয়টিকে কম্পিউটারাইজড সিস্টেমের সাথে তুলনা করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি; তাই সেই পথ ধরে-ই সামনে অগ্রসর হতে চাই।

ধরুন এমন একটি রোবটের কথা, যা মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ডিএনএ কোডিং কে সফটয়ারে রূপান্তর করে তৈরি করা হল। তাহলে রোবট টিতে মানুষের সকল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিদ্ধমান থাকবে, থাকবে মানুষের মত কাজ করা বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। আর এমন রোবট নিশ্চয় মানুষের জন্য শুভকর হবে না। তাই রোবটি যিনি তৈরি করেছেন, তিনি নিজের হাতে রেখে দিলেন এমন একটি নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা, যাতে সহজেই রোবটটিকে নিয়ন্ত্রন করা যায়। তাহলে রোবটটির স্বাধীন কাজের ও সিদ্ধান্তের বাহিরে থাকবে এর আবিষ্কারকের ইচ্ছার অদিপাত্য বিস্তার। তাহলে রোবটটি যা ইচ্ছা তাই করতে পারবেন যদি এর (রোবটের) আবিষ্কারক নিজের ইচ্ছাকে রোবটের উপর না চাপিয়ে দেন। এখন ধরুন রোবটটি কোন এক সাগরের তীরে দাঁড়িয়ে আছে, তার খুব ইচ্ছে করছে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়তে। কিন্তু সে জানে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শর্ট সর্কিট জনিত কারণে প্রসেসর সহ গুরুত্ব পূর্ণ যন্ত্রাংশ গুলো নষ্ট হয়ে যাবে এবং সে ধ্বংস হয়ে যাবে। তারপরেও রোবটটি সাগরে ঝাঁপ দিল, আর তার আবিষ্করক অপলক নয়নে তাকিয় ঘটনাটি দেখে গেলেন। এখন এই ঘটনার জন্য আপনি কাকে দায়ী করবেন? স্বয়ং রোবট কে না এর আবিষ্করক কে? এ ঘটনাটি কার ইচ্ছায় হল- রোবটের না কি এর আবিষ্কারেক? কারন রোবটকে দেওয়া হয়েছিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা, দেওয়া হয়েছিল জ্ঞান। সে জানত ঝাঁপ দেওয়ার পরিনতি কি হবে, তারপরও সে তার স্বাধীন চিত্তের প্রতিফলন ঘটয়ে নিজেকে ধ্বংস করে দিল। এর জন্য দায়ী রোবট নিজে স্বয়ং, তার আবিষ্কারক নয়। যদি ইচ্ছা শক্তির প্রসঙ্গে আসি তাহলে বলতে হয়- রোবট তার নিজের ইচ্ছায় নিজেকে ধ্বংস করে দিয়েছে এটা যেমন সঠিক; তবে এর আবিষ্কারকের ইচ্ছাটা ছিল ১০০%। কারণ রোবট এর আবিষ্করক রোবটটিকে নিয়ন্ত্রনের পূর্ণ ক্ষমতা রাখে। আবিষ্করক যদি চায় তো তাহলে রোবটটিকে ধ্বংসের হাত থেকে অনায়াসে রক্ষা করতে পারতো, তিনি ইচ্ছা করলেই রোবটটিকে সাগরের তীর থেকে ফিরিয়ে আনতে ও রক্ষা করতে পারতেন। যেহেতু আবিষ্কারক রোবটের উপর নিজের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাননি, তাই বলা যায় রোবট নিজের ইচ্ছায় নিজেকে ধ্বংস করলেও; আবিষ্কারক এটাই চেয়ে ছিলেন রোবটটি ধ্বংস হয়ে যাক। তাহলে একথা দৃঢ়তার সাথে বলা যায়, ঘটনাটি আবিষ্কারকের ইচ্ছাতেই হয়েছে। কারণ রোবট ইচ্ছা করলেই পারতেন না নিজেকে ধ্বংস করতে, যেহেতু আবিষ্কারক নিজের ইচ্ছা অনুসারে রোবটটিকে নিয়ন্ত্রন করতে সক্ষম। সুতরাং সমূদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার ব্যাপারে প্রথম ইচ্ছাটা ছিল রোবটের আর আবিষ্কারকের সক্ষমতা স্বত্বেও রোবট কে না ফিরিয়ে আনায়; আবিষ্কারকের একই ইচ্ছা ছিল। তবে এর দায় ভার সম্পূর্ন রোবটের, এর জন্য আবিষ্কারক কে কোন ভাবেই দোষারূপ করা যায় না। যদি আবিষ্কারক রোবটের অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও তাকে সাগরে ঝাঁপ দিতে বাধ্য করতেন তাহলে এর দায় ভার আবিষ্কারকের উপর চাপানো যেত।

অনুরূপ ভাবে আমাদের কোন কিছু করার পূর্ণ স্বাধীনতা আছে বা আল্লাহতালা আমাদেরকে তা দিয়েছেন; তবে মহান আল্লাহতালা আমাদের উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। সুতরাং আমরা যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারি যদি আল্লাহতালা তার স্বীয় ইচ্ছাকে আমাদের উপর না চাপান! পরিশেষে একথা বলা যায়, আমরা যা ইচ্ছা করি- তা যখন করতে পারি, তখন বলতে হবে আল্লাহর ইচ্ছাতেই তা করতে পেরেছি। কারণ আল্লাহ ইচ্ছা না করলে আমাদের পক্ষে তা করা সম্ভবপর ছিল না; তার মানে এই নয় আল্লাহ ইচ্ছা করেছেন বলেই আমি তা করেছি। সুতরাং আমার দ্বারা কৃত কাজটা প্রথমে-ই আমি ইচ্ছা করেছি, কিন্তু আল্লাহতালা আমাকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রন করার ক্ষমতা থাকা স্বত্ত্বেও তিনি তাতে হস্ত্যক্ষেপ করেননি, বরং আমি যা চেয়েছি তা হতেই দিয়েছেন; ফলে আল্লাহতালার ইচ্ছাও ছিল। তাহলে বলা যায় আমরা যা-ই করি না কেন, আল্লাহর ইচ্ছা থাকে বলে করতে পারি; কিন্তু এর জন্য দায় ভার স্বয়ং আমি নিজে। মহান আল্লাহর উপর এর দায় চাপানো শুধু নিজের মুর্খতার পরিচয় ছাড়া আর কিছু নয়।

 

চতুর্থ অংশঃ

দ্বিতীয় পর্বের সারমর্ম ছিল লাওহে মাহফুজকে কম্পিউটারের (সুপার বা আলট্রা সুপার কম্পিউটারের) সাথে তুলনা করা; এবং অটোমেটিক কন্ট্রোলিং সিস্টেমের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাপনা, যা দ্বারা মহাবিশ্ব সমেত সকল কিছু স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে৷ অর্থাৎ লাওহে মাহফুজে মহান রব প্রোগ্রাম ইন্সটল করে (লিখে) দিয়েছেন, আর প্রোগ্রামের কমান্ড বা ইন্সট্রাকশন অনুসারে-ই চলছে সব কিছু৷ 

সুতরাং আমাদের কর্মগুলো হচ্ছে- অটোমেটিক কন্ট্রোলিং সিস্টেমের ফিজিক্যাল কন্ডিশন, যা লাওহে মাহফুজ ইনপুট ডাটা হিসেবে গ্রহণ করে এবং প্রোগ্রামের ইন্সট্রাকশন অনুসারে প্রসেসিং করে অাউটপুট প্রদান করে, যা আমরা কর্মের ফলাফল হিসেবে পেয়ে থাকি৷ আর এই কর্মের ফলাফল-ই হল তাকদীর৷

তৃতীয় পর্বের আলোচনায় ছিল- অাল্লাহর ইচ্ছাটা কি?
এখানে আমরা দেখেছি- একটা রোবটকে  এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ছিল মানুষের চরিত্রিক বৈশিষ্ট্য গুলো এবং আবিষ্কারকের  ছিল তাকে নিয়ন্ত্রণ করার পূর্ণ ক্ষমতা। 

এখন যদি দ্বিতীয় ও তৃতীয় অংশের মধ্যে সমন্বয় সাধন করি, তাহলে তকদীর বিষয়ক সকল সমস্যার সমাধান স্বরূপ একটি পূর্ণ তত্ত্ব ব্যাখ্যা করা যায়। 

যেমন- এখানে আলোচ্য রোবট থেকেও মানবজাতি অতি উচ্চ প্রযুক্তি সম্পূর্ণ রোবট। যে প্রযুক্তি দিয়ে মহান রব আমাদের তৈরি করেছেন, আমাদের পক্ষে তা কখনো তৈরি করা সম্ভব নয়। এবং অবশ্য-ই আমাদেরকে  যেমন খুশি কর্ম করার স্বাধীনতা  দিয়েছেন, ঠিক তেমন-ই সম্পূর্ণ রূপে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তাঁর কাছে ন্যস্ত। ধরি লাওহে মাহফুজ বা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা বা আলট্রা সুপার কম্পিউটার টির মাধ্যমে মহান রব আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। তাই আলট্রা সুপার কম্পিউটারটি (লাওহে মাহফুজ) সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছেন আমাদের গতিবিধি, আর সাথে সাথে প্রক্রিয়াজাতকরণ করছেন প্রাপ্ত ফলাফলও। 

সুতরাং আমার কর্মের ফলাফলও আমার-ই কর্মের প্রতিফলন; আর মহান রব যেহেতু আমাকে নিয়ন্ত্রণ করার পূর্ণ ক্ষমতা রাখা স্বত্বেও আমার স্বাধীনতা-ই হস্থ্যক্ষেপ করেন না, তাই আমার প্রতিটি কর্ম-ই মহান রবের ইচ্ছাতেই হচ্ছে। 

আর লাওহে মাহফুজে লিখার (প্রোগ্রাম ইন্সটল করার) ফলে সব কিছু পূর্বেই নির্ধারণ করা হয়ে গেছে; অামরা শুধু কর্ম করে যাব এবং সেই অনুজায়ে ফল ভোগ করব। 

তারপরও যদি তকদীর বিষয়ে আমার ব্যাখ্যার ব্যাপার করো কোন প্রশ্ন থেকে থাকে তাদের জন্য বলছি- আমাদের তৈরিকৃত এমন কোন রোবট, যাকে আমরা একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইন্সট্রাকশন সম্বলিত প্রোগ্রাম দিয়ে তৈরি করে থাকি, তাহলে সে কোন সিদ্ধান্ত টি নিবে; আমাদের পক্ষে হয়তো তা বলা অসম্ভব।  কিন্তু মহান এমন একটি সুপার কম্পিউটারাইজড রোবট তৈরি করেছেন- যা নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া, নিজে থেকে নতুন কিছু উদ্ভাবন করা ইত্যাদি গুণ গুলো বিদ্যমান। তথাপি মহান রব সম্পূর্ণ রূপে জানেন আমাদের কে কি সিদ্ধান্ত নিবেন, কার দ্বারা কি কাজ সম্পন্ন হবে; কারণ তিনি তো সর্ব বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞাত।  

সুতরাং এমন নয় যে, লিখা রয়েছে বলে আমি/আমরা এমন কাজটি করছি, বরং আমি/আমরা এমন কাজটি করব বলে-ই এমনটি লিখা রয়েছে। আর আমরা তো তা অক্ষরে অক্ষরে নিজের স্বাধীন চিত্তে পালন করে স্রষ্টার শ্রেষ্ঠত্বকে-ই স্বীকৃতি দিচ্ছি। 

আমার মহান রব তো পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু। মানুষ কিভাবে ভাবে যে, মহান রব নিজের ইচ্ছা অনুসারে যা লিখেছেন, তা-ই আমাদের দিয়ে করাচ্ছেন এবং পরিশেষে এই কর্মের জন্য আমাদেরকেই শাস্তি দিবেন। মহান রব তো অতিশয় মহান, তার উপর যারা এরূপ মিথ্যা অারোপ করে- তারা………..; অাল্লাহ আমাদের সবাইকে ক্ষমা করুন।

৬ comments

Skip to comment form

  1. 5
    ইতিহাস

    আমাদের বাস্তব জীবনে অনেক সময় এমন হয়ে থাকে যে, কোন মানুষের স্বভাব ও কার্যকলাপ সম্পর্কে জানার কারণে আমরা আগে থেকেই বলে দিতে পারি, দেখো, অমুকে আজ এই কাজটি করবে, কিংবা এই কথাটিই বলবে; আর তারপর হুবহু তা ফলে যায়। এর অর্থ কি এই যে, আমিই তাকে দিয়ে করাচ্ছি, নইলে আমি তা জানলাম কিভাবে? আসলে ব্যাপারটা এমন নয়। বরং, আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে কিংবা তার মতিগতি ও হাবভাব দেখে তার স্বভাব ও খাসলত জানার কারণেই আমি অগ্রিম বলে দিতে পারছি। আর আল্লাহ যেহেতু আরো মহাজ্ঞানী, তাই তাঁর অপরিসীম জ্ঞানের দ্বারা তিনি আরো আগে থেকেই জেনে গেছেন যে, ভবিষ্যতে কে কি করবে। কিন্তু মূলত: তিনি তা করাচ্ছেন না।
     

  2. 4
    Fazle hassan siddiqui

    আমার কাছে বক্তব্য টি পছন্দ হচ্ছে না। তাহলে ব্যাপার দাড়াচ্ছে, ওটা আরেকটা উন্নত সভ্যতার ইংগিত দেয়। আর এটা আসলে প্রগ্রামাইযড না। তা হলে সব ঘটনার ব্যাক্ষা সহজ হয়ে যেত।  

     

  3. 3
    ফুল বানু

    আমি তাগদীরের বিষয়টাকে এত জটিল করে দেখিনা । আমি মনে করি যেহেতু মহান আল্লাহ আপনার অতীত , বর্তমান এবং ভবিষ্যতে আপনার স্বাধীন ইচ্ছায় কি করবেন তা জানেন , এটা আল্লাহর একটা সিফাত সুতরাং আপনি আপনার স্বাধীন ইচ্ছায় আগামীকাল কি করবেন  তা তাঁর সিফাতের কারণেই আজকে লিখে রাখলেন লৌহে মাহফুজে তাহলে আপনার স্বাধীন কর্মকাণ্ডও বহাল থাকল আবার পুর্ব থেকে আপনার তাগদীর লৌহে মাহফুজে সংরক্ষিত আছে সেটাও বহাল থাকল ।

  4. 2
    সুন্দরি

    "আসলে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে আপনি যদি উপরের অংশটুকু লক্ষ্য করেন- তাহলে দেখবেন ব্যাপারটা কেমন যেন গোলমেলে দেখায়। "

    গোলমেলে এই ব্যাপারটাকে ধামাচাপা দেবার প্রান্তাকর প্রচেষ্টা দেখে মুগ্ধ। চালিয়ে যান…

    1. 2.1
      সুলতান মাহমুদ

      এক সত্যকে অর এক সত্য দ্বারা প্রমান করেছি, মানেন বা না মানেন সেটা অাপনার ব্যাপার! 

  5. 1
    Shahriar

    Fantastic write.. Jajak-allah

Leave a Reply

Your email address will not be published.