«

»

Oct ২১

হজ্জ্ব পাথেয় নয় পথের ঠিকানা

ইসলাম একটি জীবন বিধান। ইসলামে মানুষের সকল কাজের জন্য বিধি-বিধান প্রবর্তন করা হয়েছে। প্রবর্তীত এই বিধি-বিধান অনুসারে কাজ করলে মানুষের যে কোন কাজ এবাদতে পরিণত হয়ে যায়। আল্লাহ্ আমাদেরকে তাঁর খলিফা বা প্রতিনিধি হিসাবে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। প্রতিনিধি হিসাবে দৈনন্দিন জীবনের সকল কাজ এবাদতে পরিণত করাই আমাদের মৌলিক দায়িত্ব। অফিস আদালতে আমরা অর্পিত দায়িত্ব পালন করার জন্য চাকুরী করে থাকি। এই দায়িত্ব পালনের জন্য আমাদেরকে কিছু প্রিন্সিপল বা রেগুলেটরী নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয়। একই ভাবে মুসলমানগনও যেন দৈনন্দিন জীবনের সকল কাজ কোর’আন-সূন্নাহ্ অনুযায়ী সম্পন্ন করতে পারে এজন্য আল্লাহ্ আমাদের জন্য ঈমান, নামাজ, রোজা, যাকাত, হজ্জ্ব পাঁচটি নিয়ন্ত্রক বা গাইডিং প্রিন্সিপল নির্ধারণ করে দিয়েছেন। অফিস আদালতের মতো সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য ইসলামের এই পাঁচটি প্রিন্সিপল মেনে চলা সকল মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। ঈমান এনে ইসলামে এডমিশন নিতে হয়। নামাজ পড়তে হয় আল্লাহ্র সাথে সম্পর্ক তৈরী করার জন্য। রোজা মুসলমানদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের সহিত আত্মনিয়ন্ত্রনের দৃঢ়তা তৈরী করে। আর যাকাতের অনুশীলন করে সকল কাজ আমাদেরকে আল্লাহ্র ইচ্ছা (কোন’আন-সূন্নাহ্) অনুযায়ী পালন করতে হয়। পরিশেষে আল্লাহ্র উপর আস্থা ও আল্লাহ্র সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে আত্মনিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে আল্লাহ্র আইন অনুযায়ী যারা জীবন পরিচালনা করে আল্লাহ্ তাদেরকে আরাফাতের ময়দানে ডেকে নিয়ে স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন। আল্লাহ্র স্বীকৃতি দানের এই অনুষ্ঠানকে আমরা হজ্জ্ব বলে অভিহিত করে থাকি। হজ্জ্ব ঈমান নামাজ রোজা যাকাতের মতই একটি গাইডিং বা নিয়ন্ত্রক প্রিন্সিপল। হজ্জ্ব তাই অন্যান্য নিয়ন্ত্রক বা গাইডিং প্রিন্সিপলের মতো সকল মুসলমানের সব সময়ের এবাদত। ঈমান নামাজ রোজা ও যাকাতের মতো হজ্জ্ব সকল মুসলমানকে সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রতিনিয়ত গাইড বা অনুপ্রাণিত করে থাকে। হজ্জ্ব দুই পর্বে প্রতিপালন করতে হয় ১. প্রস্তুতি পর্ব ও ২. অনুষ্ঠানিক হজ্জ্ব। আল্লাহ্র বাৎসরিক হজ্জ্ব অনুষ্ঠানে শুধু মোত্তাকীন বা সামর্থ্যবানগন যোগ দেওয়ার যোগ্যতা রাখে। তাই সামর্থ্য বা যোগ্যতা হজ্জ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই যোগ্যতা অর্জনের জন্য মুসলমানদেরকে জীবনের শুরু থেকে নিয়োজিত থাকতে হয়। আর ঈমান নামাজ রোজা যাকাত হজ্জ্বের নিয়ন্ত্রনে থেকে যারা সারা জীবনের সকল কাজ আল্লাহ্র ইচ্ছানুযায়ী সম্পন্ন করে তারাই আনুষ্ঠানিক হজ্জ্বের জন্য যোগ্যতা অর্জন করে থাকে। নিয়ন্ত্রক বা গাইডিং প্রিন্সিপল বা রেগুলেটরী বিধান মেনে চলার জন্য বেতন দেওয়া হয় না। বেতন দেওয়া হয় অর্পিত দায়িত্ব সঠিক ভাবে প্রতিপালন করার পরিবর্তে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক, রেগুলেটরী বিধান বা গাইডিং প্রিন্সিপল মেনে না চললে চাকুরী রাখা যায় না। দৈনন্দিন জীবনের সকল কাজ আল্লাহ্র ইচ্ছানুযায়ী সম্পন্ন করা আমাদের উপর আল্লাহ্র অর্পিত দায়িত্ব। অর্পিত এই দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে আল্লাহ্ আমাদেরকে বেহেশ্ত দান করবেন। কিন্তু ইসলামে অধিষ্ঠিত থাকার জন্য ইসলামের পাঁচটি প্রিন্সিপল নিরবচ্ছিন্ন ভাবে মেনে চলা সকল মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। সকল নিয়ন্ত্রক বা গাইডিং প্রিন্সিপলের মতো যে হজ্জ্ব কোর’আন সূন্নাহ্ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার জন্য আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রন ও গাইড করে না সে হজ্জ্ব মানুষের কোন কাজে লাগেনা। বরং চাকুরী হারানোর মতো ভুল হজ্জ্ব পালনের অপরাধে ইসলাম থেকে বহি®কৃত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হয়ে যেতে পারে। 

প্রাত্যাহিক কাজ-কর্মে যোগ্যতা ও পদমর্যাদার ভিত্তিতে বেতন ধার্য হয়। বেতন ধার্যের সময় নিয়ন্ত্রক বা গাইডিং প্রিন্সিপলের বিষয় বিবেচনা করা হয় না। বেতন দেওয়া হয় যে যখন যে কাজে নিয়োজিত থাকে তার বিনিময়ে। নিয়ন্ত্রক বা গাইডিং প্রিন্সিপল প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মচারীকে সব সময় সমান ভাবে মেনে চলতে হয। ইসলামের পাঁচটি গাইডিং প্রিন্সিপল মেনে চলার ব্যাপারেও মুসলমানদের মধ্যে কোন তারতম্য রাখা হয়নি। কর্মস্থানে রেগুলেটরী রুলস্ বা বিধান যেমন সকল কর্মচারী সমান ভাবে সব সময় পালন করে থাকে, ইসলামে পাঁচটি প্রিন্সিপলও সকল মুসলমানকে সব সময় সমান ভাবে মেনে চলতে হয়। হজ্জ্বও একটি নিয়ন্ত্রক বা গাইডিং প্রিন্সিপল তাই হজ্জ্ব কোন মুসলমানের নিদিষ্ট কোন সময়ের এবাদত নয়। হজ্জ্ব প্রকৃতপক্ষে সকল মুসলমানের সার্বক্ষনিক এবাদত। আগেই বলা হয়েছে, আল্লাহ্ প্রতি বছর সমার্থ্যবান মুসলমানদেরকে আরাফাতের ময়দাকে স্বীকৃতি প্রদান করে থাকেন। আল্লাহ্র স্বীকৃতি লাভের জন্য মুসলমানদেরকে জীবনের শুরু থেকে সামর্থ্য অর্জনের কাজে নিয়োজিত থাকতে হয়। আর এই সামর্থ্য দিয়ে মুসলমানগন অনুষ্ঠানিক হজ্জ্ব পালনের যোগ্যতা অর্জন করে থাকে। সামর্থ্য হজ্জ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সামর্থ্য অর্জনের কাজে মুসলমানদেরকে নিয়োজিত থাকতে হয় জীবনের শুরু থেকে। ঈমান নামাজ রোজা ও যাকাতের নিয়ন্ত্রন অনুশীলনের মাধ্যমে সকল কাজ আল্লাহ্র ইচ্ছানুযায়ী সম্পাদন করে সামর্থ্য অজর্ন করতে হয়। আল্লাহ্র উপর ঈমান বা বিশ্বাস মুসলমানদের জন্য সার্বক্ষণিক এবাদত। এর থেকে কোন মুসলমানের এক মুহুর্তের জন্য বেরিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। নামাজের মাধ্যমে আল্লাহ্র সাথে মানুষের সার্বক্ষণিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে থাকে। রোজা মুসলমানদেরকে সারা বছর অবৈধ বা হারাম কাজ থেকে বিরত রাখে। মুসলমানদেরকে সারা বছর ধরে অনেক হারাম বা অবৈধ কাজ থেকে বিরত থাকতে হয়। রমজানে সারা বছরের জন্য সকল অবৈধ কাজের সহিত প্রতিদিন আরো দু’তিনটি কাজ বাড়িয়ে দেওয়া হয় কিছুক্ষণের জন্য। রমজানে শয়তান বন্দি থাকে। এসময় যে কোন হারাম কাজ থেকে বিরত থাকা যায় নির্বিঘেœ। কিন্তু প্রকৃত রোজা শুরু হয় ঈদের দিন থেকে, যখন শয়তান মুক্ত থাকে এবং তখন আমাদেরকে নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকতে হয় শয়তানের সাথে যুদ্ধ করে। রমজানের রোজা মুসলমানদের মধ্যে বিরত থাকার অভ্যাস তৈরী করে। আর এই অভ্যাস সারা বছর ধরে রেখে মুসলমানদেরকে প্রতিদিনের সকল হারাম কাজ থেকে বিরত থাকতে হয়। আর হালাল-হারাম নির্ণয়ের মাধ্যমে সকল কাজ আল্লাহ্র আইন অনুযায়ী সম্পাদিত হলে যাকাতের দাবি পূরন হয়ে যায়। যাকাত ইসলামী সমাজ নীতি, রাষ্ট্র নীতি, বাণিজ্যনীতি ইত্যাদি সকল নীতির ফাউন্ডেশন। আয়করের মতো সকল হালাল আয়-ব্যয়, দায়-দেনার পর যদি উদ্ধৃত থাকে তার উপর শর্ত সাপেক্ষে ২.৫০% প্রদান করলে যাকাতের দায়িত্ব পালন হয়ে যায়। আর আয় কর অডিট করার সময় যেমন আয় থেকে শুরু করে টেক্স রিটার্নের পুরো প্রসেসটা অডিট করা হয়; আল্লাহ্ যখন আমাদের যাকাত অডিট করবেন তখন আয়-ইনকাম থেকেই শুরু করে মানুষের সারা জীবনের সকল কাজ কর্ম অডিট করবেন। আর যাকাতের পরীক্ষা পাশ করেই সবাইকে বেহেশ্ত অর্জন করতে হবে। সামর্থ্য বা তাক্ওয়া অর্জন আনুষ্ঠানিক হজ্জ্ব পালনের পূর্বশর্ত এবং বেহেশ্ত অর্জনের পূর্ব শর্তও এই সামর্থ্য। সাধারন ভাবে অর্থ-সম্পদকে সামর্থ্য বলে অভিহিত করা হয়। কিন্তু তাক্ওয়াই মানুষের প্রকৃত সামর্থ্য। আল্লাহ্র ইচ্ছা তথা কোর’আন-সূন্নাহ্ অনুযায়ী যারা জীবন পরিচালনা করে তারাই তাক্ওয়ার অধিকারী হয়ে থাকে। “ইন্নাল মোত্তকুনা ফি জিলালিন অয়ুন” – আল্লাহ্ মোত্তকীনগনকে বেহেশ্ত দান করবেন । এবং মোত্তকীনগনই অর্জন করে আরাফাতে গিয়ে আল্লাহ্র কাছ থেকে স্বীকৃতি লাভের যোগ্যতা। কিন্তু মনে রাখবেন, আল্লাহ্ অবশ্যই চোর-চোট্টাদেরকে বেহেশ্ত দেওয়ার জন্য হজ্জ্বের ব্যবস্থা করেননি।

হজ্জ্বের দিন (৯ জিলহজ্জ্ব) আরাফাদের ময়দানে সশরীরে উপস্থিত থেকে হজ্জ্ব আদায় করতে হয়। এহ্রাম পরার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক হজ্জ্বের প্রথম পর্বের কাজ শুরু হয়। পুরুষ হাজীগনের এহ্রাম নির্দিষ্ট মাফের দু’খন্ড সাদা কাপড়। হজ্জ্বের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই দু’টুকরা কাপড়ই হয় সকল হাজীগনের একমাত্র পরিধেয় পোষাক। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকল হাজীগন এই একই পোষাক পরিধান করে থাকেন। এর মাধ্যমে সকল হাজ্জ্বীগনের মান-মর্যাদা একটা লেভেল এ নিয়ে আসা হয়। রাজা-প্রজা নির্বিশেষে সকল মানুষকে দাঁড়াতে হয় একই ভাবে এক কাতারে। আল্লাহ্র কাছে রাজা-প্রজার কোন পার্থক্য নেই। আল্লাহ্ মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করেন অর্জিত তাক্ওয়ার ভিত্তিতে। দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে মানুষ যে পোষাকে আল্লাহ্র সামনে হাজির হয়। সেই একই পোষাকে হাজ্জ্বীগনকে হাজির হতে হয় আরাফাতের ময়দানে আল্লাহ্র সামনে। এবং মান-মর্যাদার এই লেভেলটিই হাজ্জ্বীগনকে মেন্টেইন করতে হয় সারা জীবন ধরে। আরাফাতে না গিয়ে হজ্জ্বের সহিত সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অনুষ্ঠান পুরোপুরি ভাবে পালন করলেও আংশিক হজ্জ্ব পালন হয় না। কিন্তু অন্যান্য অনুষ্ঠান পালন না করে হজ্জ্বের দিন (৯ জিলহজ্জ্ব) শুধু আরাফাতে উপস্থিত থাকলেই সামান্য ত্র“টিসহ হজ্জ্ব আদায় হয়ে যায়। যারা বলেন টঙ্গির বিশ্ব ইস্তেমায় গেলে হজ্জ্বের সওয়াব পাওয়া যায় তাদের এই বিষয়টি ভাল ভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। তবে এহ্রাম পরার পর আরাফাতে পৌঁছা পর্যন্ত হজ্জ্বের এই প্রস্তুতি পর্বে কয়েকটি অনুষ্ঠান রয়েছে এবং হজ্জ্ব থেকে ফেরার পথে কোরবানী করে মাথা মুড়ানো পর্যন্তও কয়েকটি অনুষ্ঠান রয়েছে। এই অনুষ্ঠান গুলোকেও হজ্জ্বের অংশ হিসাবে সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। হজ্জ্ব এবং হজ্জ্বের এই সকল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে অনেক শিক্ষনীয় বিষয় রয়েছে। এবং সকল বিষয়ের মধ্যে নিহিত রয়েছে মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা ও গাইডেন্স। কা’বা শরীফ তাওয়াফ হজ্জ্বের প্রস্তুতি পর্বের প্রথম অনুষ্ঠান। কাবা শরীফ আল্লাহ্র আরশের নিচে দুনিয়াতে অবস্থিত একটি ঘর। আদম (আঃ) বায়তুল মামুরের নিচে বায়তুল মামুরে অবস্থিত একটি ঘরের অনুরুপ ভাবে কা’বা শরীফ তৈরী করেন। ফেরেশ্তাগন বায়তুল মামুরে অবস্থিত ঘরকে কেন্দ্র করে সর্বক্ষণ আল্লাহ্কে তাওয়াফ করে থাকেন। বায়তুল মামুরের উপর অবস্থিত রয়েছে আরশ-র্কুসি। আল্লাহ্ এই আরশ-কুরসি থেকেই তাঁর সামাজ্য পরিচালনা করে থাকেন। ফলে কা’বা শরীফ তাওয়াফের মাধ্যমে আমরা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্কে তাওয়াফ করে থাকি। তাওয়াফ এন্টিক্লক ওয়াইজ করতে হয়। সারা ইউনিভার্সের সকল গ্রহ-নক্ষত্র তথা আল্লাহ্র আঠারো হাজার মাখ্লুকাত প্রতি মুহুর্ত এন্টিক্লক ওয়াইজ আল্লাহ্কে তাওয়াফ করে থাকে। কা’বা শরীফ তাওয়াফের মাধ্যমে আমাদেরকে এই আঠারো হাজার মাখ্লুকাতের সাথে মিশে যেতে হয়। এবং উপলব্দি করতে হয় যে আমাদের চারপাশের আল্লাহ্র আঠারো হাজার মাখ্লুকাতের মধ্যে আমরাই সর্বশ্রেষ্ট (আশরাফুল মাখ্লুকাত)। আল্লাহ্ এই সকল মাখ্লুকাত আমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। আর আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন খলিফা বা প্রতিনিধি হিসাবে আল্লাহ্র দুনিয়াতে আল্লাহ্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। দুনিয়াতে আল্লাহ্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করা আমাদের উপর আল্লাহ্র অর্পিত দায়িত্ব। এই দায়িত্ব নিয়ে আদম (আঃ) দুনিয়াতে আগমন করেছিলেন এবং আরাফাতের ময়দান থেকে ঘোষনা করেছিলেন তার শুভ আগমনের শুভ বার্তা। আমাদেরকেও একই অনুভূতি নিয়ে আরাফাতের ময়দানে যেতে হয়। এবং আল্লাহ্র স্বীকৃতি লাভ করে আল্লাহ্র কাছ থেকে আল্লাহ্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্র“তি নিয়ে ফিরে যেতে হয় দেশ থেকে দেশান্তরে। বিবি হাজেরা শিশু ইসমাইলকে নিয়ে নির্জন মুরুভূমিতে অসহায় বোধ করতেন না। আল্লাহ্ যার তত্ত্বাবধানে থাকে তাকে ভয় করতে হয় না। কিন্তু না চাইলে তিনি কাকেও কিছু দেন না। মওজুদ রসদ শেষ হয়ে গেলে তিনি রসদের খোঁজে সাফা-মারোয়া সায়ী করেছিলেন। সপ্তমবার সায়ী করার পর তিনি তাঁর প্রয়োজনীয় সরবরাহ পেয়ে গিয়েছিলেন। আন্তরিকতার সহিত চেষ্টা করলে আল্লাহ্ কারো প্রচেষ্টা ব্যর্থ করেন না।  

আরাফাতে হজ্জ্ব শেষে ফিরতি পথে দেশে কর্মস্থলে যাওয়ার আগে সকল হাজ্জ্বী গনকে আরো দু’টি বিশেষ অনুষ্ঠান পালন করতে হয়। মুয্দালিফার খোলা আকাশের নিছে রাত্রি যাপন হজ্জ্ব থেকে ফিরতি পথের প্রথম অনুষ্ঠান। আদম (আঃ) দুনিয়াতে বিবি হাওয়ার সাথে প্রথম মিলিত হয়েছিলেন মুয্্দালিফার খোলা আকাশের নিচে। কিন্তু বেহেশ্তে প্রথম বারের মতো ভুল করলেও এবার অনেক দিন পর স্ত্রীকে পেয়ে তিনি তার দায়িত্বের কথা ভুলে যাননি। উপরে আরাফতের ময়দানে গিয়ে সেখান থেকে দায়িত্ব পালনের কাজ শুরু করেছিলেন। মুয্দালিফা দুনিয়াতে মানুষের পারিবারিক জীবন প্রতিষ্ঠার শুরুর দিনের সাক্ষী। প্রতি বছর স্মৃতিরোমন্থনের মাধ্যমে গর্বিত অতীতের এই প্রথম ক্ষণটির কথা স্বরন করাও মুয্্দালিফা অবস্থানের একটি কারন হতে পারে। হজ্জ্ব ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে অনুপ্রেরনা প্রদানের জন্য একটি নিয়ন্ত্রক বিধান। কিন্তু দুনিয়াতে ইসলামের কথা বলে ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করা একটি কঠিন কাজ। মোহাম্মদ (সাঃ) চল্লিশ বছর পর্যন্ত আরবদের সামনে আল’আমিন ও আল’সাদিক হিসাবে কাটিয়েছিলেন। কিন্তু শুধু ‘লা’ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ বলার অপরাধে মোশরেক আরবরা তাদের এই আল’আমিন আল’সাদিককে মেরে ফেলার কথা ভাবতে দ্বিধাবোধ করেনি। তাই হজ্জ্ব শেষে করে দেশে দেশে ফিরে গিয়ে নির্বিঘেœ যে ধর্মের কাজ করা যাবে এমনটা মনে করা ঠিক নয়। ভুলে যাবেন না যে, ইব্লিশ মানুষকে বিভ্রান্ত করার অধিকার লাভের জন্য বেহেশ্তের দাবী ছেড়ে জাহান্নাম কবুল করেছিল। ইব্লিশের প্রতিরোধ থেকে বাঁচার জন্য তাই আধ্যাত্মিক প্রস্তুতির সাথে সামরিক শক্তির জন্যও পুর্বপ্রস্তুতি প্রয়োজন। মুয্দালিফা থেকে এরকম প্রস্তুতি গ্রহনের প্রতিশ্র“তি নিয়ে হাজ্জ্বী গন মিনায় শয়তানের সাথে প্রতিকী যুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় পাথর সংগ্রহ করে থাকেন।  ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সকল যুদ্ধের জন্য পুর্বপ্রস্তুতি মুয্দালিফা অবস্থানের একটি উল্লেখযোগ্য শিক্ষা।

ইব্রাহীম (আঃ) যৌবনে মিথ্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রজ্বলিত অগ্নিকুন্ডে আত্মত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিলেন।  পৌড় বয়সে প্রিয়তমা স্ত্রী ও একমাত্র শিশু পুত্র ইসমাইল (আঃ)কে দুর্গম মরু প্রান্তরে বির্সজন দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে, স্ত্রী-পুত্র পরিবারের স্নেহ মায়া মমতার চেয়ে আল্লাহÍ আদেশ পালনের মূল্য অনেক বেশী। তিনি আবেগ-অনুভুতির পরীক্ষা সহ সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। পরিশেষে একমাত্র ছেলেকে কোরবাণী দেওয়ার আদেশ পালনে তিনি কতটুকু প্রতিশ্র“ত এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে আল্লাহ্র হুকুম মানতে গিয়ে মানুষকে যতটুকু যেতে হয় ততটুকুই মানবতার ঠিকানা। কিন্তু দ্বিতীয় পক্ষকে না জানিয়ে মানুষ কিছুই করার অধিকার রাখেনা। ইব্রাহীম (আঃ) সবিস্তারে বিষয়টি ইসমাইল (আঃ) এর সাথে আলোচনা করেছিলেন। বড় সার্টিফিকেট পেতে হলে বড় পরীক্ষা দিতে হয় শয়তানের মতো অপদার্থ ছাড়া একথা আর কারো অজানা থাকার কথা নয়। ইব্রাহীম ও ইসমাইল (আঃ) আল্লাহ্র আদেশ পরীক্ষাকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়েছিলেন। কিন্তু শয়তান যখন দেখলো যে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে বাপ-বেটা মহাখুশীতে আল্লাহ্র  আদেশ পালনের জন্য মিনার পথে যাচ্ছেন। ইব্রাহীম ও ইসমাইল (আঃ)কে সে তিন যায়গায় বাধা দিয়েছিল। ইব্রাহীম ও ইসমাইল (আঃ) তিন যায়গাতেই তারা শয়তানের সাথে যুদ্ধ করে শয়তানকে পরাভূত করেছিলেন। আল্লাহ্র হুকুম মানতে গেলে অবশ্যই বাধা আসবে এবং এই বাধা অতিক্রম করতে হবে। মিনা থেকে এই শিক্ষা নিয়ে হাজ্জ্বীগনকে দেশে ফিরে যেতে হয়। এর মধ্যে আমাদের জন্য আর একটা শিক্ষাও রয়েছে যে, আল্লাহ্ মানুষের রক্ত চান না, চান ভালবাসা। এবং ভালবাসা প্রমাণের জন্য অনেক সময় তিনি এর তল পর্যন্ত দেখতে চান। কেহ যদি এই তলটুকু পর্যন্ত যাওয়ার ধৈর্য্য রাখতে পারে ইসমাইল (আঃ)এর মতো আল্লাহ্ তাকে তলোয়ারের তীক্ষè কষাঘাত থেকে বাঁচিয়ে দেন। মনে রাখবেন শত্র“র এটম বোম থাকলে মুসলমানদেরও তা থাকতে হবে। এবং এমন কমিটমেন্ট থাকতে হবে যে দুনিয়াতে আল্লার্হ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ইব্রাহীম ও ইসমাইল (আঃ) এর মতো শয়তানের কোন বাধার কাছেই নতি স্বীকার করা যাবে না।                      

মাথা মুন্ডনের মাধ্যমে হজ্বের পরিসমাপ্তি হয়। মাথা মুন্ডন সহ হজ্বের কোন অনুষ্ঠানই রীতি সর্বস্ব কোন প্রতিকী অনুষ্ঠান নয়। কোরবানীর মাধ্যমে মানুষের ভিতরের মানুষটিকে কুলুষ মুক্ত করার শেষ পর্বটি সমাপ্ত হয়ে থাকে। এহ্রাম দিয়ে শরীরের সকল অংশ নিরাপদ (সিকিউর) করা হলেও পুরো হজ্জ্বে এহ্রাম পরা অবস্থায় মাথায় কিছু পরিধান করা হয়না। মনুষ্য দেহের সর্বোত্তম অংশ মাথা। মাথা মানুষের জীবনের চালিকা শক্তি। মানুষকে আল্লাহ্র সকল সৃষ্টির সামনে মাথা উঁচু করে থাকার মর্যাদা দিয়ে দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আল্লাহ্ ও মানুষের মাঝখানে আল্লাহ্ কোন প্রতিবন্ধকতা রাখেন নি। কোন রকম প্রতিবন্ধকতা পরিহার করার জন্যই হয়তো হজ্জ্বের সময় শীরস্ত্রান পরা সীমিত করা হয়েছে। মাথার বাইরের আবরন চুল। এহরাম হজ্জ্বের পুরোটা সময় ধরে দেহের পবিত্রতা রক্ষা করে থাকে। আর মাথার পবিত্রতা রক্ষা করে মাথার চুল। হজ্জ্ব সমাপ্ত হলে হজ্জ্বে আবরন এহ্রাম পরিত্যাগ করতে হয়। একই সাথে মাথার আবরন তার চুল পরিত্যাগ করে হাজ্জ্বীগনকে বেরিয়ে আসতে হয় স্বাভাবিক জীবনে। এবং এখান থেকেই শুরু হয় হাজীগনের ভিতর ও বাইরে আবর্জনা মুক্ত একটি নতুন জীবন। পবিত্রতা মুসলমানদের সকল এবাদতের সারভাগ বা নির্যাস। হজ্জ্বের মাধ্যমে মানুষ শরীর ও মনের পরিপূর্ণ পবিত্রতা অর্জন করে থাকে। এবং এখান থেকেই শুরু হয় মানুষের পুত পবিত্র আর একটি নব জীবনের শূভ যাত্রা। আমিন।

১ comment

  1. 1
    মহিউদ্দিন

    সুন্দর একটি লিখা। আপনার পরিশ্রম সার্থক হউক। ভিন্ন আঙ্গিকে ইসলামের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর আপনার বিশ্লেষণ মূলক কথাগুলা খুবই যুক্তিসংগত হয়েছে। জানিনা কেন কেউ মন্তব্য লিখছেন না? হয়তবা বিষয়টা ইসলামের উপর সাধারণ আরেকটি রুটিন মাফিক লিখা ভেবে কেউ পড়তে আসছেন না। শিরোনাম দেখেই সাধারণ পাঠক হয়তবা ভাবছেন নতুন কিছু জানা যাবেনা। তাই শিরোনামটা পরিবর্তন করে দেখতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.