«

»

Sep ২৬

হজ্জ্বের সামর্থ্য

হজ্জ্ব ইসলামের একটি নিয়ন্ত্রক এবাদত বা রেগুলেটরী প্রিন্সিপল। ঈমান, নামাজ, রোজা, যাকাত, হজ্জ্ব ইসলামে এই পাঁচটি নিয়ন্ত্রক এবাদত রয়েছে। মুসলমানদেরকে দৈনন্দিন জীবন আল্লাহর আইন অনুযায়ী পরিচালনার কাজে নিয়ন্ত্রিত থাকার জন্য এই পাঁচটি প্রিন্সিপল মেনে চলতে হয়। জীবনের প্রতিটি কাজ আল্লাহর আইন অনুযায়ী সম্পন্ন করা মানুষের স্বক্রিয়ক বা অব্লিগেটরী দায়িত্ব। স্বক্রিয়ক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার জন্য নিয়ন্ত্রক বা রেগুলেটরী প্রিন্সিপল মেনে চলতে হয়। আর হজ্জ্বের সামর্থ্য অর্জন হয় নিয়ন্ত্রক ও স্বক্রিয়ক উভয় দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের মাধ্যমে। ইসলামের পাঁচটি প্রিন্সিপল মেনে চলা সকল মুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু বাৎসরিক আনুষ্ঠানিক হজ্জ্ব পালনের যোগ্যতা অর্জন করে শুধুমাত্র সামর্থ্যবানগণ। বস্তুতঃ সামর্থ্য অর্জনই আনুষ্ঠানিক হজ্জ্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতার একমাত্র পূর্বশর্ত। আনুষ্ঠানিক এই বাৎসরিক হজ্জ্ব প্রকৃতপক্ষে মুসলমানদের মধ্যে যারা সামর্থ্যবান যোগ্যতা সম্পন্ন তাদেরকে স্বীকৃতি প্রদান অনুষ্ঠান। যাদের হজ্জ্ব কবুল হয় তারাই স্বীকৃতি লাভ করে এবং তারাই অর্জন করে বেহেশ্তে সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভের জন্য সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালনের অধিকার। হজ্জ্বের স্বীকৃতি অনেকটা পিএইচডি ডিগ্রীর মতো। পিএইচডি ডিগ্রীধারীগণকে উচ্চস্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয় সম্মানিত করার জন্য। আরাফাতের ময়দান ছাড়া দুনিয়াতে অন্য আর কোথাও হজ্জ্বের বাৎসরিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হওয়ার উপায় নেই। আদম (আঃ) এর দায়িত্ব পালনের জন্য আরাফাতের ময়দান নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। আল্লাহ্ মানুষের জন্য প্রত্যাদেশ প্রদান সম্পন্ন করেছেন এই আরাফাতের ময়দানে। মোহাম্মদ (সাঃ) আরাফাতের ময়দানেই ঘোষণা দিয়েছিলেন তাঁর বিদায় হজ্জ্বের বিদায় বাণী।

আরাফাতের ময়দানেই আল্লাহ্ স্বীকৃতি প্রদান করেন তাঁর অনুগত বান্দাদেরকে। তাই লাব্বায়েক দ্বান করে হজ্জ্বের দিন আরাফাতে উপস্থিত হতে হয় সকল সামর্থ্যবানকে। হজ্জ্বের দিন আরাফাতে উপস্থিত না থাকলে হজ্জ্ব পালন হয় না তাই আরাফাত ছাড়া অন্য কোথায়ও হজ্জ্বের সওয়াব পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু হজ্জ্বের সামর্থের শর্ত নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়ার উপায় নেই। কাকেও হজ্জ্বের বার্ষিক অনুষ্ঠানে যোগদান থেকে বঞ্চিত করার জন্য সামর্থের এই শর্তটি জুড়ে দেওয়া হয়নি। সামর্থের শর্ত সংযুক্ত করা হয়েছে সামর্থ্যবানদেরকে ঊঁচুস্তরের যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ করে দিয়ে ইসলামকে পূর্ণতা দান করার জন্য। মানুষ তার নিজ নিজ অবস্থান থেকেই অগ্রগতির শীর্ষদেশে পৌঁছার স্বপ্ন দেখে থাকে। অল্পকিছু লোকের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়, আর বাকীরা সব পথিমধ্যে হারিয়ে যায়। কিন্তু যারা চেষ্টা করতে করতে হারিযে যায় তাদেরকে ব্যর্থ বলা যায় না। কারণ যে যত টুকু দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়ে থাকে তার কাছ থেকে ততটুকু হিসাবই নেওয়া হবে। হজ্জ্ব মুসলমানদের জন্য মর্যাদার শীর্ষদেশে পৌঁছার সর্বোচ্চ সোপান। সামর্থ্য থাকলেই শুধু মর্যাদার সর্বোচ্চ এই সোপানে উপনীত হওয়া যায়। আর এজন্যই হজ্জ্ব পালনের সাথে সামর্থের শর্তটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সামর্থ্য অর্জন একটি লাইফ লং অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা অর্জনের কসরত চলে সারা জীবন ধরে। হজ্জ্ব এজন্যই সকল মুসলমানের জন্য একটি নিয়ন্ত্রক এবাদত। প্রকৃতপক্ষে হজ্জ্বের সামর্থ্য অর্জনে প্রচেষ্টা সকল মুসলমানের জন্য একটি চলমান প্রক্রিয়া। মুসলমানদেরকে হজ্জ্ব পালনের যোগ্যতা লাভের প্রচেষ্টায় লেগে থাকতে হয় বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকে। এজন্য হজ্জ্ব কিছু মুসলমানের কোন নির্দিষ্ট সময়ের এবাদত নয়। হজ্জ্ব প্রকৃতপক্ষে সকল মুসলমানের সব সময়ের এবাদত। হজ্জ্বের সামর্থ্য বলতে অনেকেই আমরা আর্থিক সামর্থ্য মনে করে থাকি। অবশ্য সকল সামর্থ্যকেই একসময় অর্থের মানদন্ডে নিরুপন করা হয়। কিন্তু হজ্জ্বের ক্ষেত্রে সামর্থ্য একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। মনে রাখা প্রয়োজন যে, যে আর্থিক সামর্থ্য মানুষের আধ্যাত্মিক ও মানষিক সামর্থ্য মজবুত করে না তা দিয়ে হজ্জ্বের সামর্থ্য অর্জন হয় না।

মানুষের হৃদপিন্ড যেমন মানুষের জীবনিশক্তি। আবার বেঁচে থাকার জন্য অর্থকেও জীবনিশক্তি বলা হয়। এই হৃদপিন্ড কলুষিত হলে যেমন মানুষের সারা শরীর কলুষিত হয়ে যায়। একই ভাবে অর্থের সরবরাহ কলুষিত হলেও কলুষিত হয়ে যায় জীবন প্রবাহের সকল শাখা প্রশাখা। কারন ময়লাযুক্ত হাত দিয়ে পরিষ্কার করতে গেলে পবিত্র বস্তুও আর পবিত্র থাকেনা। হজ্জ্বের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্যে দায়িত্ব পালনের জন্য দক্ষতা অর্জনের শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে। তাই হজ্জ্বের জন্য আর্থিক সামর্থের চেয়ে আধ্যাত্মিক, মানষিক ও শারীরিক সামর্থের গুরত্ব অনেক বেশী। আল্লাহ নিজেও হজ্জ্বের জন্য পাথেয় এর কথা বলেছেন কিন্তু সাথে সাথে বলে দিয়েছেন যে, তাক্ওয়াই (সামর্থ্য) হজ্জ্বের সর্বোত্তম পাথেয় (আল বাকারা-২/১৯৭)।

আগেই বলা হয়েছে যে, সকল স্বক্রিয়ক কাজ সঠিক ভাবে পালন করার জন্য আমরা ইসলামের পাঁচটি নিয়ন্ত্রক প্রিন্সিপল অনুসরণ করে থাকি। আল্লাহর উপর ঈমান আনলে আল্লাহর এবাদত করার অধিকার অর্জিত হয়। আল্লাহর স্বীকৃতি লাভের সামর্থ্য অর্জনের অগ্রযাত্রা শুরু হয় নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে নিরবিচ্ছ্ন্নি সম্পর্ক তেরীর মধ্য দিয়ে। রোজা আল্লাহর হুকুম প্রতিপালনের কাজে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকতে মুসলমানদেরকে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। আর যাকাত জীবন পারচালনার সকল পর্যায়ে আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুনিয়াতে ইসলামী সমাজ গঠনের বলিষ্ট অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে পালন করেই মুসলমানদেরকে হজ্জ্বের সামর্থ্য অর্জন করতে হয়। এবং এই সামর্থ্য অর্জনের মাধ্যমেই অর্জিত হয় স্বীকৃতি প্রদানের জন্য অনুষ্ঠিত আল্লাহর বাৎসরিক হজ্জ্ব অনুষ্ঠানে যোগদানের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা। অনেকের পক্ষে হয়তো সামর্থ্য অর্জনের এই সর্বোচ্চ মঞ্জিলে পৌঁছা সম্ভব হয় না। বাস্তবিক পক্ষেও অগণিত মানুষের মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক মানুষই মর্যাদার সর্বোচ্চ শিখরে উপনীত হতে সক্ষম হয়। এবং এদের হাতেই তুলে দেওয়া হয় সমাজ উন্নয়নের সকল দায়িত্ব। আল্লাহ্ মহাবিশ্বের মহাধিপতি। আল্লাহর সাম্রাজ্যে যারা আল্লাহর সকল স্বক্রিয়ক ও নিয়ন্ত্রক আইন যথাযথভাবে পালন করে তাদেরকেই আল্লাহ্ সামর্থ্যবান মনে করে থাকেন। অনুষ্ঠানিক হজ্জ্বের মাধ্যমে আল্লাহ্ এই সামর্থবানদেরকেই স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন ধর্ম প্রবর্তনের দায়িত্ব পালন করার জন্য। আদম (আঃ) বেহেশ্ত থেকে দায়িত্ব বুঝে নিয়ে আরাফাতের ময়দান থেকে দায়িত্ব পালন শুরু করেছিলেন। আর আমাদেরকে আরাফাত থেকে দায়িত্ব নিতে হয় দেশে দেশে প্রচার করার জন্য। কোর’আন সুন্নাহ্ আল্লাহর আইন। কোর’আন-সুন্নাহ্ অনুসরণের মাধ্যমে তাক্ওয়া অর্জন করে মোত্তাকীন হতে হয়। মোত্তাকীনগনই হজ্জ্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় আধ্যাত্মিক সামর্থের অধিকারী। আর হজ্জ্বের জন্য প্রয়োজনীয় মানষিক সামর্থ্য হলো হজ্জ্ব পালনকারীর মানষিক পরিপক্কতা ও মানষিকতার পবিত্রতা। যে কোন উচ্চ পদমর্যাদা সম্পন্ন কাজের জন্য উন্নত মেধা সম্পন্ন কর্মচারীর প্রয়োজন হয়। এবং এমন কাজের প্রশিক্ষনের জন্যও প্রয়োজন হয় উর্বর বোধশক্তি ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা। আবার কারো জ্ঞানের পরিধি যত ব্যাপকই হোকনা কেন, সদিচ্ছার কমতি থাকলে তার কোন প্রচেষ্টাই সার্থক হয়না। অনুকূল মানষিকতার প্রতিফলনও তাই হজ্জ্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সামর্থ্যেরই একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।

হজ্জ্ব সম্পাদন এবং হজ্জ্ব পরবর্তী দায়িত্ব পালন একটি শ্রমসাধ্য কাজ। শারিরীক সামর্থ্য না থাকলে হজ্জ্ব কেন সামান্য কোন কাজও ঠিকমত সম্পাদন করা যায় না। তাই শারিরীক যোগ্যতা অবশ্যই হজ্জ্ব পালনের জন্য একটি অপরিহার্য সামর্থ্য। অর্থকে উন্নতির সকল সম্ভাবনা মনে করা হয়ে থাকে। আর এটাও অসত্য নয় যে অর্থনীতির সদর দরজা উম্মুক্ত না করে সম্ভাবনার দরজা উন্মুক্ত করা যায় না। আবার অর্থকে সকল অনর্থের মূল মনে করা হলেও, অর্থের সদ্ব্যবহার করেই হজ্জ্বের জন্য প্রয়োজনীয় আধ্যাত্মিকক, মানষিক এমনকি শারীরিক সামর্থ্যও অর্জন করতে হয়। তাই হজ্জ্বের সাথে যে আর্থিক সামর্থ্যের সম্পর্ক জড়িয়ে রয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে হজ্জ্বের খরচের সাথে আর্থিক সামর্থের যে সম্পর্ক জড়িয়ে রয়েছে তা নিতান্তই সামান্য। তাই সামর্থ্য বলতে শুধু মাত্র হজ্জ্বের খরচ জোগানোর জন্য আর্থিক সামর্থের বিষয়টি মূখ্য মনে করা ঠিক নয়। যদি তা হতো তাহলে রাসুল (সা:) হাজার হাজার মোহাজীর সঙ্গে নিয়ে মদিনা থেকে মক্কায় হজ্জ্ব করতে যেতেন না। আর কোন মুসলমানকেই বলা হতোনা পরিবার পরিজন পিছনে ফেলে রেখে শূন্য হাতে অনিশ্চিত ও অজানা স্থানে হিজরত করতে। কারণ মোহাজীরগণ প্রায় সকলেই আনসারগণের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। বস্তুতঃ মোহাম্মদ (স:) মদিনা থেকে যাদেরকে নিয়ে হজ্জ্ব করতে গিয়েছিলেন, আধ্যাত্মিক যোগ্যতাই ছিল তাদের বড় সামর্থ্য। তবে আমাদের মতো যাদেরকে দূরবর্তী স্থান থেকে গিয়ে হজ্জ্ব পালন করতে হয়, হজ্জ্বের জন্য প্রয়োজনীয় খরচের বিষয়টি অবশ্যই কিছুটা বিবেচনা করতে হয়। কিন্তু মক্কা থেকে যারা যত কাছাকাছি থাকে তাদের এই ভাবনা অনেক কম থাকে। আবার যারা কা’বা শরীফের একান্ত কাছাকাছি থাকে তাদেরকে আর্থিক খরচের এই বিষয়টি হয়তো মোটেই চিন্তা করতে হয় না। তাই প্রচলিত অর্থে হজ্জ্বের খরচের জন্য আর্থিক সামর্থের বিষয়টি হজ্জ্বের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে না। হজ্জ্বের সামর্থ্য নিরুপনের ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে আমাদের আধ্যাত্মিক সামর্থ্যই প্রকৃত সামর্থ্য।

বর্তমান বিশ্বে আর্থিক  সামর্থ্য একটি বিভ্রান্তিকর বিষয়। সাধারণত, কারো কাছে টাকা থাকলেই তাকে সামর্থ্যবান মনে করা হয়। কিন্তু ইসলামী পরিভাষায় সামর্থ্যের সংজ্ঞা ভিন্ন রকম। ইসলামী মতে মুসলমানদেরকে যাকাতের পরীক্ষা (টেষ্ট) এ উত্তীর্ণ হয়ে সম্পদের মালিকানা পেতে হয়। আমাদের দেশে অনেক কোটি কোটি এমনকি শতশত কোটি টাকার অধিকারী লোক রয়েছে। কিন্তু খুঁজলে দেখা যাবে হয়তো  এদের একজনেরও হজ্জ্বের জন্য সামর্থ্যের নির্ধারিত পরিধি অতিক্রম করার সামর্থ্য নেই। কারণ অবৈধ বা হারাম ভাবে অর্জিত টাকার উপর ২.৫০% হারে যাকাত দিলে যেমন ঐ টাকা বৈধ বা হালাল হয়ে যায়না, একই ভাবে অবৈধ অর্থের সাথে সংশ্লিষ্ট সম্পদ ব্যবহার করে হজ্জ্ব করলে হজ্জ্ব বৈধ হয় না। অবৈধ সম্পদ অধিকারে থাকলে নিজকে মালিক মালিক মনে করা যায়, কিন্তু সম্পদের প্রকৃত মালিকানা থেকে যায় যার স্বার্থ নষ্ট করে সম্পদ সংগ্রহ করা হয়েছে তার কাছে। বাস্তবে সম্পদের এমন অনেক মালিক রয়েছে যাদের আয়ের বৈধ কোন উৎস নেই। এরা যে শুধু গরীব তা নয়; এরা অপরাধীও বটে। অপরদিকে ইসলামী আমল আখ্লাক মেনে চলার ক্ষেত্রে যারা উদাসীন তাদেরকে সামর্থ্যবান বলতেও বিবেচনা করা প্রয়োজন। আবু জাফর (রা:) বলেছেন, “আল্লাহ্ ঐ লোকের হজ্জ্ব ও ওমরাহ্ গ্রহণ করেন না যে এগুলো পালন করার জন্য অবৈধ বা হারাম সম্পদ ব্যয় করে।” আবার তথাকথিত অনেক প্রগতিশীল রয়েছেন যাদের অনেক বক্তব্য ঈমানের মৌলিক দাবী প্রশ্নাবিদ্ধ করে ফেলে। যতক্ষণ পর্যন্ত না এরা তওবা পড়ে কলুষমুক্ত হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত এদেরকেও সামর্থ্যবান বলা যায় না। অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করে যারা সম্পদের পাহাড় গড়ে তারা দূর্ভাগ্যবান, পরমুখাপেক্ষী, সম্পদের অবৈধ পাহারাদার। অবৈধ সম্পদের উপর যেমন যাকাত দিতে হয়না, অবৈধ সম্পদ হাতে রাখলে হজ্জ্বের সামর্থ্যও অর্জন হয়না। মানুষের চারিত্রিক সামর্থ্যও হজ্জ্বের ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা রেখে থাকে। কথায় বলে মানুষের মনে কষ্ট দেওয়া আর মসজিদ ভাঙ্গা নাকি একই গুণাহ্। হজ্জ্বের জন্য এটাও একটি সামর্থ্য। এজন্যই হজ্জ্বে যাওয়ার ক্ষেত্রে জানা মত কারো মনে কষ্ট রেখে যেতে নেই। বস্তুতঃ দায় দেনা পরিশোধ করা এবং কারো মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে তার থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া হজ্জ্বের একটি বড় সামর্থ্য।

কথিত আছে, ইমাম আহম্মদ ইব্ন্ হাম্বল একবার হজ্জ্ব করেছিলেন। হজ্জ্বের পর তিনি স্বপ্ন দেখলেন যে, ঐ বছর করো হজ্জ্ব কবুল হয়নি এবং তাঁর নিজের হজ্জ্বও কবুল না হয়ে অর্ধপথে ঝুলে রয়েছে। আর ঝুলে থাকার কারণ তাঁর মা নাকি তাঁর উপর কোন কারণে অসন্তুষ্ট ছিলেন এজন্য। পরে খোঁজ নিয়ে জানলেন যে, তাঁর মা ভূল বুঝে তাঁর উপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। পরবর্তীতে ভূল সংশোধন করে মা’র অসন্তষ্টি দূর করার পর নাকি ইমাম সাহেবের হজ্জ্ব কবুল হয়েছিল। কথিত আছে ঐ বছর এই একজনের হজ্জ্বই নাকি কবুল হয়েছিল। মাকে সন্তুষ্ট রাখাও হজ্জ্ব পালনের জন্য সামর্থের একটি অংশ। যারা অন্যের সম্পদ আত্বসাৎ করে এবং মানুষের মনে কষ্ট দিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে এবং মনে করে যে হজ্জ্ব করলে আল্লাহ্ তাদের গুনাহ্ মাফ করে দিবেন, তাদের হজ্জ্বের এই শর্তটির কথা ভাল করে ভেবে দেখা দরকার।

আমাদের দেশে যারা ঘুষ খায় তারা মনে করে, যে ঘুষ দেয় সে সন্তুষ্ট চিত্তেই ঘুষ দেয় তাই এটা দোষের নয়। কিন্তু ঘুষ নিয়ে ঘুষ প্রদানকারীকে সুবিধা দেওয়ার জন্য যার স্বার্থ নষ্ট করা হয় তিনি নিশ্চয়ই কষ্ট পান। অন্যদিকে সরকারী সম্পদ যারা লুন্ঠন করে তাদেরকে দায়ী থাকতে হয় সারা দেশের সকল নাগরিকের কাছে। মনে রাখবেন আল্লাহ্ নিশ্চয়ই চোর বদমাসদেরকে সুবিধা দেওয়ার জন্য হজ্জ্বের প্রবর্তন করেননি। প্রকৃতপক্ষে চুরি বদমাসী থেকে মুক্ত থেকেই হজ্জ্বের সামর্থ্য অর্জন করে হজ্জ্ব পালনের যোগ্যতা লাভ করতে হয়। হজ্জ্বের সামর্থ্য অর্জনের প্রক্রিয়া শুরু হয় জীবনের শুরু থেকে এবং এর সাথে সম্পৃক্ত থাকতে হয় জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত। ফলে সামর্থ্য অর্জনের এই প্রক্রিয়ার সাথে সকল মুসলমানই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জড়িত থাকে সারা জীবন ধরে। হজ্জ্বকে তাই কোন শ্রেণী বা জনগুষ্টির এবাদত মনে করা ঠিক নয়।

হজ্জ্ব সকল মুসলমানের সবসময়ের এবাদত। হজ্জ্বের আবেদন সার্বজনীন। হজ্জ্ব সকল মুসলমানকে আল্লাহর আইন অনুসরণের অনুপ্রেরণা দান করে থাকে তাই হজ্জ্ব ঈমান নামাজ রোজা যাকাতের মতো একটি নিয়ন্ত্রক এবাদত। হজ্জ্বের প্রত্যেকটি আকিদার মধ্যে এই নিয়ন্ত্রক গুণ নিহিত রয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণের এই গুণ আয়ত্ব করার জন্যই হজ্জ্ব পালন করতে হয়। আর আত্মনিয়ন্ত্রণের গুণাগুণ আয়ত্ব করা সম্ভব হলেই হজ্জ্ব এবাদতে গণ্য হয়ে যায়।

আগেই বলা হয়েছে যে, হজ্জ্ব অনেকটা সামর্থবানদেরকে পিএইচডি প্রদানের অনুষ্ঠানের মতো। হজ্জ্বের বাৎসরিক অনুষ্ঠানে এহরাম ও তাওয়াফের মাধ্যমে আমাদেরকে আরাফাতে আল্লাহর সামনে হাজির হওয়ার পূর্ব প্রস্তুতি নিতে হয়। আর‘লাব্বায়েক আল্লাহ্ হুম্মা লাব্বায়েক’ এই ঘোষণা দিয়ে আমাদেরকে উপস্থিত হতে হয় আরাফাতে আল্লাহর সামর্থ্যবাদদেরকে স্বীকৃতি প্রদানের বাৎসরিক অনুষ্ঠানে। যাদের হজ্জ্ব কবুল হয় তারাই স্বীকৃতি পায় এবং তারাই অর্জন করে সর্বোচ্চ মর্যাদা অর্জনের জন্য সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালনের অধিকার। তাই হজ্জ্বের দিন আরাফতে হাজির থেকে এই স্বীকৃতি লাভ করতে হয়। হজ্জ্বের দিন আরাফাতে উপস্থিত না থাকলে হজ্জ্ব সম্পন্ন  হয় না এবং হজ্জ্বের সওয়াবও পাওয়া যায় না। যারা বলে বিশ্ব ইস্তেমায় গেলে হজ্জ্বের সওয়াব পাওয়া যায় তারা মিথ্যা কথা বলে। বিশ্ব ইস্তেমাকে হজ্জ্বের সমতুল্য মনে করলে মুসলমানিত্ব নষ্ট হয়ে যায়। মুসলমানদেরকে কোর’অন-সুন্নাহ্ অনুযায়ী এবাদত করতে বলা হয়েছে। রুকু-সিজদা, তসবিহ-তাহ্লীল, দোয়া-দুরুদ ইত্যাদি পড়তে হয় আল্লাহর হুকুম পালনের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাহায্য পওয়ার জন্য। সকল এবাদতের মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে বাঁচা সম্ভব হলে ইবলিশকে বেহেশ্ত ছাড়তে হতো না। আগেই বলা হয়েছে, আদম (আঃ) বেহেশ্ত থেকে দায়িত্ব নিয়ে এসে আরাফাতের মযদান থেকে দায়িত্ব পালন শুরু করেছিলেন। আর আমাদের মধ্যে যারা যোগ্যতা সম্পন্ন তাদেরকে আরাফাত থেকে দায়িত্ব নিয়ে দেশে ফিরে যেতে হয় দায়িত্ব পালন করার জন্য। এবং ফিরতি পথে মুজ্দালিফা ও মিনা অবস্থান করতে হয় আল্লাহর হুকুম পালনের ক্ষেত্রে আদম (আঃ), ইব্রহীম (আঃ) ও ইসমাইল (আঃ) এর মতো শয়তানকে প্রতিরোধ করার কাজে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকার শিক্ষা  গ্রহণ করার জন্য। কোরবানী ইসলামী জীবন ব্যবস্থার মৌলিক নিয়ামক। আমাদেরকে স্বাধীনতা বা ফ্রী-উইল বিক্রয় করে উপার্জন করতে হয়। আল্লাহ্ও এই ফ্রী-উইল বা স্বাধীনতা বিক্রয়ের বিনিময়ে মানুষকে বেহেশ্ত দান করবেন।

৩ comments

  1. 3
    আহমেদ শরীফ

    ভাল লাগল।

    লিখতে থাকুন।

  2. 2
    বুড়ো শালিক

    পড়লাম। ভালো লাগলো। তবে ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের (র) ঘটনাটার রেফারেন্স দিলে ভালো হতো।

  3. 1
    এস. এম. রায়হান

    সদালাপে স্বাগতম। পরে মন্তব্য করব।

Leave a Reply

Your email address will not be published.