«

»

Jan ১৪

কেইস স্টাডিঃ জেনোসাইড ইন বাংলাদেশ

বিংশ শতাব্দীর গনহত্যাগুরির মধ্যে বাংলাদেশের ১৯৭১ এর ধ্বংসলীলা মাধ্যমে সংগঠিত গণহত্যা সোভিয়েত যুদ্ধবন্দী হত্যা (১৯৪১-৪২), ইহুদী হলোকাস্ট (১৯৩৩-৪৫) বা রুয়ান্ডার গণহত্যার (১৯৪৪) শতাব্দীর সবচেয়ে নিবিড় গণহত্যাগুলোর মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই চার গণহত্যা এই শতাব্দীর সবচেয়ে নৃশংস ঘটনাগুলোর অন্যতম। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতাকামী শক্তিকে ধ্বংসের প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ বাঙ্গালীকে হত্যা করে। 

১. পিছনের কথা

জাতি, ধর্ম অনুসারে দেশবিভাগের বিরুদ্ধে মহাত্মা গান্ধি ও অন্যান্যদের অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও ব্রিটিশ ও তৎকালীন উপমহাদেশের রাজনীতিবিদের কারণে ধর্মের ভিত্তিতে দুইটা দেশ গঠন করা হলে সংখ্যালঘুরা আদি নিবাস ছেড়ে অন্য প্রান্তে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয় আর সেইসাথে শুরু হল ধর্ম ভিত্তিক দাঙ্গা।

পশ্চিম পাকিস্তানীদের পূর্ব পাকিস্তানীদের উপরে জোর জুলুম চালানোর কারণে আস্তে আস্তে অসন্তোষ দানা বাধতে শুরু হয়। ভাষা নিয়ে ১৯৫২ সালে সংঘটিত হয় ভাষা আন্দোলন। এরপর ১৯৭০ সালের আগস্টের বন্যায় ত্রাণের অপ্রতুলতা ও নানানভাবে প্রতিনিয়ত বঞ্চনা বাঙ্গালিদের মধ্যে বিদ্রোহী মনোভাবের জাগরণ ঘটায়। ফলশ্রুতিতে ডিসেম্বর মাসের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করে। সেই সময়ের অন্যতম দাবী ছিল স্বায়ত্তশাসন ও মিলিটারি শাসনের অবসান। এই আন্দোলন আস্তে আস্তে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। ফলশ্রুতিতে ১৯৭১ সালের ২২ এ ফেব্রুয়ারি পাকি জান্তা আওয়ামী লীগের নেতা ও সমর্থকদের উপরে একটি ক্র্যাক ডাউনের পরিকল্পনা করে। 

সামরিক সরকারের প্রধান ইয়াহিয়া খান ফেব্রুয়ারি ‘৭১ এ একটি কনফারেন্সে  ঘোষণা দেয় – “ আমরা ওদের মধ্যে ৩০ লক্ষ শেষ করে দেব আর বাকীরা আমাদের কাছে জীবন ভিক্ষা চাইবে”। (রবার্ট পাইন, ম্যাসাকার, পৃ. ৫০)।

জেনারেল ইয়াহিয়া খানের এই উক্তি থেকে সুস্পষ্ট ইংগিত পাওয়া যায় যে, পাকিস্তানী শাসক-চক্র তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের দমনের জন্যে একটা গণহত্যার পরিকল্পনা করেছিলো।  

অবশেষে ২৫ এ মার্চ শুরু হয় সেই ইতিহাসের নির্মম ঘটনার। পাকি মিলিটারি আক্রমণ করে ঢাকা ইউনিভার্সিটি, ই পি আর ও অন্যান্য এলাকা। মানুষকে পাখির মত গুলি করে মারা শুরু হল। এক রাতেই ৭০০০ জনের মত হতভাগ্য বাঙ্গালি মারা যায়। সেইটা ছিল শুধুমাত্র শুরু। 

“এক সপ্তাহের মধ্যে ঢাকায় অর্ধেক অধিবাসী পালিয়ে যায় এবং কমপক্ষে ৩০,০০০ এর মত নিরস্ত্র মানুষ নিহত হয়। চট্টগ্রামও তার অর্ধেক জনসংখ্যা হারায়। সেই সময়ে (এপ্রিলের উপাত্ত অনুযায়ী) ৩০ মিলিয়নের মত মানুষ হতভম্বের মত দিশেহারা হয়ে দেশের ভিতরেই স্থানান্তর হয়ে মিলিটারিকে ফাঁকি দেবার চেষ্টা করছিলো “ – (রবার্ট পাইন, ম্যাসাকার, পৃ. ৪৮)। 

অবশেষে ১০ মিলিয়ন বাঙ্গালি ভারতে পালিয়ে শরণার্থী হয়। উল্লেখ্য তখন সেই ভূখণ্ডের সর্বমোট জনসংখ্যা ছিল ৭৫ মিলিয়ন। 

অবশেষে এপ্রিলের ১০ তারিখে আওয়ামীলীগের নেতৃত্ববৃন্দ স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ধীরে ধীরে মুক্তিবাহিনী সংগঠিত হতে থাকে এবং পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সাথে লড়াই শুরু করে। প্রাথমিক ভাবে দেশের ভূপ্রকৃতি ও জনগণের সহায়তায় গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে মুক্তিবাহিনীর কার্যক্রম শুরু হলেও পরে জনসমর্থনের কারণে একটা গণযুদ্ধে পরিণত হয়। 

 

 

২. বাঙ্গালী পুরুষদের বিরুদ্ধে “জেন্ডার-সাইড”
 
জেন্ডার-সাইড বলতে বুঝায় নির্দিষ্ট লিঙ্গের মানুষের গণহত্যা। ৭১ সালের গণহত্যাও এই শ্রেণীর মধ্যে পরে।

 

২. ক পুরুষ মানুষের প্রতি আক্রোশ

এই গণহত্যার নির্দিষ্ট কিছু টার্গেট ছিল। এন্থনি মাসকারেনহাসের মতে প্রধান টার্গেট ছিলোঃ (এন্থনি মাসকারেনহাস, দা রেইপ অফ বাংলাদেশ পৃ. ১১৬-১৭) – “গণহত্যার লক্ষ্য নিয়ে কোন দ্বিধা দ্বন্দ ছিল না”। 

তার মতে – গণহত্যার লক্ষ্য ছিল যথাক্রমে: 

১. সেনাবাহিনীতে চাকুরীরত বাঙ্গালী জওয়ান, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, পুলিশ, আনসার ও মুজাহিদ

২. হিন্দু – আর জে রুমেল কুমিল্লাতে নিজ কানে শুনেন যে মিলিটারিরা বলছিল,  – “আমরা শুধু ছেলেদের হত্যা করার জন্য এসেছি, মহিলা ও শিশুরা নিরাপদ, আমরা কি কাপুরুষ যে তাদের হত্যা করবো” (ডেথ বাই গভার্নমেন্ট পৃ. ৩২৩) তাঁর মতে মিলিটারিরা নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করাকে নায়কোচিত কাজ বলে মনে করেছিল। অবশ্য অনেক ক্ষেত্রেই পুরো পরিবার হত্যাকাণ্ডের স্বীকার হয়েছিল।

৩. আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী ও সমর্থক। 

৪. ছাত্র – কিশোর ও তরুণ বয়সীদের প্রতিও পাকি মিলিটারির নির্মম আক্রোশ দেখা গিয়েছিলো। তারা অল্প বয়সী কেউকে দেখলেই মুক্তিবাহিনী বলে মনে করত এবং নির্বিচারে তাদের হত্যা করে। আর জে রুমেলের বর্ণনায় অসংখ্য কিশোর ও তরুণদের মৃতদেহ দেখা গিয়েছিল মাঠে, নদীতে ভাসমান অবস্থায় বা আর্মি ক্যাম্পের আশে পাশে।

৬. বাঙালী বুদ্ধিজীবী – শিক্ষক ও অধ্যাপকদের মধ্যে সেনাবাহিনীর দৃষ্টিতে যাদের “সংগ্রামী” মনে হয়েছ – তাদেরকেই হত্যা করা হয়েছে (এন্থনি মাসকারেনহাস, দা রেইপ অফ বাংলাদেশ পৃ. ১১৬-১৭) 

এন্থনী মাসকারেনহাসের লেখার সারমর্ম হল এই যে, হত্যাকাণ্ডের সাথে লৈঙ্গিক ও সামাজিক শ্রেণীর (বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপক, শিক্ষক, নেতা/কর্মী, এবং মুক্তিসংগ্রামরা প্রায় সবাই পুরুষ ছিল)। – অনেক ক্ষেত্রে উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গের পরিবারের সদস্যদেরও হত্যা করা হয় শুধু মাত্র পারিবারিক বা রক্তের সম্পর্কের কারণে। 

এই সব বিষয় থেকে প্রমাণিত হয় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃক একটা জেন্ডারোনাইড সংগঠিত হয়েছে।   

ড. রওনক জাহানের মতে – “ মুক্তিযুদ্ধের সম্ভাব্য যোদ্ধা হিসাবে আওতায় সকল যুবকদের গ্রেফতার ও নির্যাতন চালায় আর্মি – পরে অধিকাংশকে হত্যা করা হয়। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে শহর ও উপশহরগুলো যুবক শূন্য হয়ে যায়। তাদের অনেকে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেয় অথবা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। ”

“সক্ষম যুবকদের মধ্যে যাদের খৎনা করা হয়নি তাদের জন্যে মৃত্যু অবধারিত হয়ে যায়”। (জেনোসাইড অব বাংলাদেশ, আর জে রোমেল, পৃষ্ঠা ২৯৮) 

রোমেল আরও বলছেন – “পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দৃষ্টিতে প্রতিরোধ যুদ্ধে যেতে সক্ষম কিশোর যুবকদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালায় – সেই অভিযানে ধৃত যুবকদের আর কখনও জীবিত অবস্থায় দেখা যায়নি। তাদের মৃত দেহগুলো ভাসতে দেখা গেছে নদীতে, সেনা ক্যাম্পের কাছে। এই অভিযানে স্বাভাবিক ভাবে ভীত হয়ে পড়েছিলো সকল যুবক আর তাদের পরিবারবর্গ। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে ১৫ থেকে ২৫ বছরের সকল যুবক গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে পালিয়ে বেড়িয়েছে – যাদের অনেকে ভারতে চলে গিয়েছিলো। যারা বাড়ী ছাড়তে চাইছিল না – তাদের মা বা বোনেরা তাদের জোর করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে – যাতে তাদের জীবন রক্ষা পায়।“ ( ডেথ বাই গভর্নমেন্ট) 

রোমেলের  বর্ণনা মতে ( পৃ – ৩২৩) এই গান হিম করা গণহত্যার উৎসবটি অনেকটা নাজীদের “পুরুষ নিধন” কর্মসূচীর সাথে তুলনীয়-যাতে – “এটা ছিল প্রদেশব্যাপী একটা গণহত্যা, যেখানে হিন্দুদের আলাদা করে হত্যা করা হয়েছে – সেই প্রক্রিয়ায় সেনা সদস্যরা ধৃত-ব্যক্তিদের খৎনার বিষয়টা নিশ্চিত হতো – যা মুসলমানদের  জন্যে বাধ্যতামূলক – যদি খৎনা করা থাকতো – তাহলে হয়তো তাৎক্ষনিক মৃত্যু এড়ানো যেত।“

     
রবার্ট পাইন ঢাকা শহরের আশেপাশে গণহত্যার স্থানগুলোর বর্ণনা করতে গিয়ে সেইগুলোকে পরিকল্পিত গণহত্যা – বিশেষ করে লৈঙ্গিক” গণহত্যার একটা ক্লাসিক উদাহরণ হিসাবে দেখেন – যা লিঙ্গভিত্তিক ও নিরস্ত্র মানুষের উপর সংগঠিত হয়ে ছিল বলা হয়। 

 

“ঢাকা ও তার আশেপাশে নির্জন প্রান্তগুলোতে মিলিটারি জান্তা গণহত্যার এক্সপেরিমেন্ট চালায় (বিশেষ করে পুরুষদের উপরে) যাতে করে সাংবাদিকদের চোখ এড়িয়ে যায় এই ঘটনাগুলো। বুড়িগঙ্গার তীরে হরিহারাপারাতে এইরকম তিনটা প্রমান রবার্ট পাইন আবিষ্কার করেন – একটি বন্দীশালা (নদী তীরবর্তী গোডাউন), মৃত্যুদণ্ড দেবার জায়গা (নদীর তীরে) ও তাদের লাশ ধামাচাপা দেবার উপায় (নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে)। ছয় থেকে আট জন বন্দীকে দড়ি দিয়ে বেধে রাতের আধারে মেরে ফেলা হয়েছে। এই ঘটনা ঘটেছে রাতের পর রাত। পাকিস্তান ন্যাশনাল ওয়েল কোম্পনীর  গোডাউনটি ছিল নদীর ধারে – সেখানে প্রতিরাতে দলে মানুষ ধরে আনা হতো – আট দশজনকে দড়ি দিয়ে বেঁধে নদীর অল্প পানিতে নামিয়ে গুলি করা হতো। ভোরে কোন নৌকার মাঝিকে দিয়ে ভাসমান লাশগুলোর দড়ি কেটে আলাদা করে দিয়ে নদীর মাঝে টেনে নিয়ে যাওয়া হতো – যাতে স্রোতের টানে লাশগুলো আলাদা আলাদা ভাবে ভেসে যায় (রবার্ট পাইন, ম্যাসাকার, পৃ. ৫৫)। 

উপরের বর্ণনা থেকে এইটা বলা যায় যে, এই হত্যাকান্ডগুলো আর্মেনিয়া ও নানজিং (১৯৩৭) গণহত্যার সাথে সমাঞ্জ্যস্যপূর্ন। 

২. খ নির্বিচারে নারী হত্যা ও নির্যাতন

এটা আরও লক্ষ্য করা গেছে যে, আর্মেনিয়া ও নানজিং এর মতো বাংলাদেশেও নারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছিলো। বাঙালী নারীদের উপর যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ আর হত্যা শুরু করা  হয় যুদ্ধের প্রাথমিক অবস্থা থেকেই। যুদ্ধের পুরো সময়টা জুড়ে বাঙ্গালি নারী নির্যাতন ও মৃত্যুর সম্মুখীন ছিল -যা ছিল সুপরিকল্পিত ও ভয়াবহ। 

সুজান ব্রাউনমিলার তার এগেইন্সট আওয়ার উইল বইতে (Against Our Will: Men, Women and Rape, Susan Brownmiller ) এই নির্যাতনকে নানজিঙ্গে জাপানিদের দ্বারা ধর্ষণ ও রাশিয়াতে ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মানিদের দ্বারা ধর্ষণের তুলনা করেছেন। ৮০ শতাংশ ধর্ষিত ছিল মুসলমান নারী (পৃ. ৮১)।

“ ২,০০,০০০ বা ৩,০০,০০ বা ৪,০০,০০০ (তিনটি ভিন্ন পরিসংখ্যান) বাঙালী নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮০% নারী ছিলেন মুসলমান, যা তখনকার ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যানুপাতিক ছিল। সেই ক্ষেত্র হিন্দু বা খৃষ্টান নারীরাও রক্ষা পায়নি। 
একটা ছোট্ট জনবহুল দেশের নারীদের উপর এই ভয়াবহ যৌন অত্যাচার হয়েছে।“ (ব্রাউনমিলার, পৃষ্ঠা – ৮১)

এই বিষয়ে Aubrey Menen নামক এক রিপোর্টার কয়েকটি উদাহরণ দিয়েছে। তারমধ্যে সদ্যবিবাহিত এক তরুণীর নির্যাতনে ঘটনা এইরকম –

“দুইজন পাকিস্তানী সৈন্য বাসরঘরে ঢুকে পড়লো। অন্যজন বাইরে বন্দুক নিয়ে পাহারায় দাড়িয়ে থাকলো। বাইরের মানুষরা ভিতরে সৈন্যদের ধমকের সুর আর স্বামীর প্রতিবাদ শুনতে পাচ্ছিলো। সেই চিৎকার একসময় থেমে গেল – শুধু শুনা গেল তরুণীর কাতর আর্তনাদ। কয়েক মিনিট পর একটা সৈন্য অবিন্যস্ত সামরিক পোশাকে বেড়িয়ে এলো বাইরের থেকে আরেকটা সৈন্য ভিতরে গেল। এভাবে চলতে থাকলো – যতক্ষণ না ছয়টা সৈন্য দ্রুত সেই বাড়ী ত্যাগ করলো। তারপর বাবা ভিতরে গিয়ে দেখতে পেল তার মেয়ে দড়ির বিছানায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। আর তার স্বামী মেঝেতে করে ফেলা নিজের বমির উপর উপর হয়ে পড়ে আছে।“ (Brownmiller, Against Our Will, p. 82) 

“বাঙ্গালি নারীদেরকে নির্যাতন কোন সৌন্দর্য বা এই রকমের কোন কিছুতে বাধা ধরা ছিল না। তারা আট সন্তানের মা বা ৭৫ বছরের দাদীমাকেও ছাড়ে নাই। তারা শুধু ঘটনাস্থলে নির্যাতন করেই চলে যায় নাই, তারা হাজারো নারীদের তাদের ক্যাম্পে তুলে নিয়ে যায়। কেউ কেউ আট বারের মত নির্যাতনের স্বীকার হয়েছিল এক রাতে (ব্রাউনমিলার পৃ. ৮৩)।

দুঃখজনক হলেও এই নির্যাতিত নারীদের অসন্মান যুদ্ধের পরেও চলেছিল। শেখ মুজিব কর্তৃক তাদেরকে জাতির বীরাঙ্গনা ঘোষণা দেয়া হলেও বাস্তবে তা হালে তেমন পানি পায় নাই। নির্যাতিত অনেক নারী তাদের হারানো সুখ ফিরে পায়নি (ব্রাউনমিলার পৃ. ৮৪)।

 

৩. যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা – কতজন মারা গেছে:

এইটা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, বাংলাদেশের গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা সাত ডিজিটর এর মধ্যে পড়বে। এই গণহত্যা রুয়ান্ডা (৮০০,০০০) আর ইন্দোনেশিয়া (১ থেকে ১.৫ মিলিয়ন) ছাড়িয়ে গেছে। 

আর. জে রোমেলের মতে – 

“সেই ২৬৭ দিনের যুদ্ধে নিহত হওয়ার সংখ্যাটা ভয়াবহ। আঠারোটি জেলার মধ্যে পাঁচটি জেলায় তদন্ত কমিটির আংশিক পরিসংখ্যানে দেখা যায় – পাকিস্তানী আর্মিরা –

ঢাকায় – ১,০০,০০০
খুলনায় – ১,৫০,০০০
যশোরে – ৭৫,০০০
কুমিল্লায় – ৯৫,০০০
চট্টগ্রামে – ১,০০,০০০

মানুষ হত্যা করেছে। এই আংশিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ১৮ টি জেলায় (তখন বাংলাদেশ ১৮টি জেলায় বিভক্ত ছিল) মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২,৪৭,০০০ মানুষ। উল্লেখ্য যে এই পরিসংখ্যানটি হল অসমাপ্ত পরিসংখ্যান। যেহেতু সেই পরিসংখ্যানটি সম্পন্ন হয়নি – তাই আজও সেই যুদ্ধে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা বলা কঠিন। অনেকের মতে প্রাক্কলিত সর্বমোট সংখ্যাটি হবে ৩০,০০,০০০। (আর জে রোমেল, ডেথ বাই গভর্নমেন্ট)।

পাকিস্তানী আর্মি আর তাদের সহযোগী বাহিনী (রাজাকার/আলবদর) কর্তৃক নিহত হয়ে প্রতি ২৫ জনের একজন বাঙালী, হিন্দু আর ভিন্নমতের মানুষ। সেই বিবেচনায় এই হত্যাকাণ্ড সোভিয়েত আর চৈনিক কমিউনিস্ট সরকার আর জাপানের বিশ্বযুদ্ধে নিহতের সংখ্যানুপাতের চাইতে অনেক বেশী।   (Rummel, Death By Government, p. 331.) 

এডাম জোন্স এক হিসেবে দেখিয়েছেন মৃতদের ৮০% হচ্ছে পুরুষ (৩ মিলিয়ন শহীদ ও ৪ লাখ নারী নির্যাতিত হয়েছে ধরে) – সেই হিসেবে এটি গত অর্ধ সহস্রাব্দর অন্যতম সেরা গণহত্যাই শুধু নয়, জেন্ডার-সাইডও বটে।

৪. বাংলাদেশে ১৯৭১ এর গণহত্যার জন্যে দায়ী কে? 

“মাসের পর মাস ধরে চলা এই হত্যাকাণ্ড চলে। এই হত্যা-লীলা কোন একদল উত্তেজিত যুবকের রাগের মাথায় ঘটানো কোন ঘটনা নয় – বরঞ্চ একদল সু-প্রশিক্ষিত আর পেশাদার আর্মি অফিসারের পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন। মুসলমান সৈন্যদের পাঠানো হয়েছে তাদের স্বধর্মের মানুষকে হত্যা করতে আর তারা যান্ত্রিক ভাবে সুচারু রূপে সেই আদেশ পালন করেছে।  যান্ত্রিক ভাবে এই হত্যাকাণ্ড চালাতে চালাতে তারা নিরস্ত্র মানুষ হত্যার নেশায় পড়ে গিয়েছিলো (সিগারেটের নেশার-মতো) …যা রাশিয়া দখলের পরে  হিটলারের বাহিনীর মধ্যে দেখা গেছে। (Payne, Massacre, p. 29.)

রবার্ট পাইনের মতে বাংলাদেশের গণহত্যা বর্তমান সময়ের গণহত্যাগুলোর মধ্যে একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড – একদল সামরিক কর্তার সুচিন্তিত পরিকল্পনার ফসল। যারা এই পরিকল্পনার প্রণেতা ছিল – তারা হল – 

১) প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান, 
২)জেনারেল টিক্কা খান, 
৩) চিফ অফ স্টাফ জেনারেল পীরজাদা, 
৪) নিরাপত্তা প্রধান জেনারেল উমর খান ও 
৫) ইন্টেলিজেন্স চিফ আকবর খান। 

(ম্যাসাকার পৃ. ১০২)।

এই গণহত্যা ও জেন্ডার ভিত্তিক আক্রোশ নিচু ব্যাংকের মিলিটারিদের মধ্যেও ছিল – যারা স্পন্দিত হয়ে এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছে। যার মধ্যে বাঙালী জাতির প্রতি ঘৃণা (রেসিজম)ও একটা কারণ। অধিকাংশ পাকিস্তানী সৈন্য মনে করতো – “বাঙালীরা বানর আর মুরগীর সাথে তুলনীয়।“

 ইস্টার্ন কমান্ডার জেনারেল নিয়াজি মনে করতো – “বাঙ্গালিরা নিচু জায়গায় থাকা নিচু জাতের মানুষ।“ তার অধস্তনরাও একই মতবাদে বিশ্বাসী ছিল। 

সাংবাদিক ড্যান কগিন (Dan Coggin) জানান, “ এক পাঞ্জাবি ক্যাপ্টেন তাঁকে বলে যে আমরা যাকে খুশি হত্যা করতে পারি, কোন জবাবদিহিতা করতে হবে না।!” (মেল, ডেথ বাই গভার্নমেন্ট, পৃ. ৩৩৫)

৪.১ গণহত্যার সমাপ্তি – 

এই হত্যা-লীলা চলার সময় প্রাণ বাঁচানোর লক্ষ্যে এক কোটি বাঙালী প্রতিবেশী ভারতে আশ্রয় নেয়। কূটনৈতিক আর পরোক্ষ সহায়তার পর ভারত ৩রা ডিসেম্বর সরাসরি যুদ্ধে বাংলাদেশকে সহায়তা দিতে শুরু করে। ফলশ্রুতিতে ১৬ই ডিসেম্বর ৯০ হাজার সৈন্যসহ পাকিস্তানীরা আত্মসমর্পণ করে আর বাংলাদেশে পাকিস্তানীদের গণহত্যার সমাপ্তি ঘটে। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতা দেশে ফিরে আসেন। পরবর্তী ঘটনাবলীর সাথে বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ঘটনা তুলনীয়। আত্নসমর্পনকারী পাকিস্তানীদের নিরাপত্তা দেয় ভারত । ("Genocide in Bangladesh," p. 298; emphasis added.)

আন্তর্জাতিক কুটনৈতিক মারপ্যাঁচে পাকিস্তানী জেনারেলরা বিচারের কাঠগড়ায় ডয়নই। তারপরও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যুদ্ধাপরাধীর বিচার বিষয়টি নিয়ে নানান উদ্বেগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র হিসাবে পাকিস্তান সেই অপরাধীদের রক্ষার সকল ব্যবস্থা নিয়েছে। 

এই হত্যাকাণ্ড আর বিচার না হওয়ার সুদূরপ্রসারী ফল হিসাবে বাংলাদেশেও পরবর্তীতে সামরিক ক্যু হয়েছে – কোন কোন টা ছিল ভয়াবহ ((Death By Government, p. 334.) 

৫. শেষ কথা:

পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর সহযোগী হিসাবে কাজ করা আধা সামরিক বাহিনী (যেমন রাজাকার আলবদর) সমান ভাবে যুদ্ধাপরাধী। তাদের নেতারা এখন রাজনৈতিক নেতা হিসাবে ভিন্ন ভাবে হাজির হয়ে জনতার মধ্যে মিশে যেতে চাচ্ছে। 

পাকিস্তানী জেনারেলদের বিচার করা বা তাদের আদালতে হাজির করা বর্তমানের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্যে কঠিন। এই কাজটা করার জন্যে পাকিস্তানের বিবেকবান মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে। তাদের বুঝতে হবে – কেন তারা একদল গণহত্যাকারীর দায়িত্ব নেবে। তার কিছু আভাসও পাওয়া যাচ্ছে। গতবছর পাকিস্তানের নারী অধিকার আন্দোলনের নেত্রী আসমা জাহাঙ্গীর সিবিসির সাথে এক সাক্ষাৎকারে সুস্পষ্ট ভাবে বাংলাদেশে গণহত্যার জন্যে দায়ী জেনারেলদের বিচারে দাবী করেছে। পাকিস্তানের মুক্তবুদ্ধির মানুষরা একদিন এই দাবীকে গণদাবীতে রূপান্তরিত করে যুদ্ধাপরাধী জেনারেলদের বিচারে মাধ্যমে জাতি হিসাবে তাদেরকে গণহত্যার দায় থেকে মুক্ত করবে। এই আশাই করি। 

আর এই দিকে দেশের ভিতরে ধর্মের আর রাজনীতির আড়ালে লুকিয়ে থাকা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবী আবারো জোরালো হচ্ছে। এই কথা সত্য যে, ৩৭ বছরের রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ, প্রতিবিপ্লবীদের কর্মকাণ্ড আর পেট্রোডলারের প্রভাবে যুদ্ধাপরাধীদের অবস্থান আপাত দৃষ্টিতে বেশ সুরক্ষিত মনে হচ্ছে। কিন্তু সরকারের যুদ্ধাপরাধ প্রতি পক্ষপাতিত্বের অবস্থান থেকে নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণের পরই আসলে বুঝা যাবে – তাদের আশ্রয়স্থলটি আসরে কি তাসের ঘর না লখিন্দরের লোহার বাসর। আশার কথা জনতা জেগে উঠছে। সরকারের উচিত মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ফোরামের দাবীগুলো মেনে দ্রুত যুদ্ধাপরাধীর বিচারের ট্রাইব্যুনাল গঠন করা। 

একটা স্বাধীন দেশে প্রগতিশীল আর আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় গণহত্যাকারী আর যুদ্ধাপরাধীর কোন স্থান নেই।   

 

( লেখাটি জেন্ডাওসাইড নামক যুদ্ধের উপর গবেষনা প্রতিষ্ঠানের গবেষনা কর্মের সহায়তায় ২০০৮ সালে লিখিত) 

১০ comments

Skip to comment form

  1. 3
    মজলুম

    রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষককে জানি যে ৭১ এ পাকি আর্মী ও আল-বদরের ইসলামের নামে যে নির্যাতন তার উপর চালিয়েছে তারপর সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে নাস্তিক হয়ে যায়।
    এরকম অনেক উধাহারন পাওয়া যাবে।
    অনেক হিন্দুকে দেখবেন উগ্র ইসলাম বিদ্বেষী, আমি এরকম কয়েকজন কে জানি যাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, লুট করা হয়েছে ইসলামের নাম ব্যবহার করে রাজাকারেরা।কিশোর বয়সে দেখা সেই ঘটনায় এরা ইসলাম বা দাঁড়ি টুপির উপর প্রচন্ড বিদ্বেষ লালন করে। বিভিন্ন সময় এই দেশে বা এখন যে হিন্দুদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, এবং যেই সব হিন্দু বালক, কিশোরেরা এসব দেখছে কিভাবে তার খেলার জায়গা, তার থাকার স্হান সব ধুলিস্সাৎ করে দেওয়া হলো, লুট করা হলো। তার নিজের মা-বাবার কান্না দেখে মন বিষিয়ে হয়ে উঠা এই ছেলেটা বড় হলে কি করবে?
    সে ইসলাম বা দাঁড়ি টুপি দেখলে আতঁকে উঠবে, বিদ্বষ লালন করবে, প্রতিশোধ পরায়ন হবে।
    এটা মানুষের সহজাত প্রবনতা।  
    আর আমরা যারা সাধারন মুসলমান, আমরাও তাদের বুঝাতে ব্যার্থ যে ওরা যা করেছে তা ইসলাম নয়।
    এজন্যেই মহান আল্লাহ কোরানে বলেন, তোমরা বিধর্মীদের দেব দেবীকে গালি দিওনা তাহলে ওরা ভুল বুঝে আমাকেও গালি দিবে।

      

    1. 3.1
      মুনিম সিদ্দিকী

      মজলুম যথার্থ বলেছেন।  আমার অলিদের ইন্তেকাল হয়েছিলো ১৯৬৯ এর ২৭শে মার্চে। আয়ুব খানের পদত্যাগের মাত্র ২দিন পর। আব্বা উচ্চ শিক্ষা শেষ করতে করতে  উনার বয়স ৩৭ হয়ে গিয়েছিলো,। ১৯৪২ সালে দিল্লীর ফতেপুর মাদ্রাসা থেকে দেশে ফিরে ১৯৪৫ সালে বিয়ে করেন। তখন উনার বয়স ৪০ ছুয়েছিলো। আব্বা যখন প্যানকারাসে ক্যান্সারে ইন্তেকাল করেন তখন, আমরা ৮ ভাই বোন সকলে ছোট ছিলাম। গ্রামে যায়গা জমি ছাড়া আর কোন আয় ছিলোনা, যাতে করে আব্বার অবর্তমানে আমাদের সংসার চলে। আব্বা মারা যাবার সময় আম্মার বয়স মাত্র ৩৫ বছর ছিলো। আমাদের মানুষ করার দায় দায়িত্ব উনার উপর বর্তায়। আমাদের কৈশোর, তারুণ্য খুব কষ্টের মধ্যে অতিবাহিত হয়েছিলো।

      আমি এত কথা বলার কারণ এর জন্য যে, আমার আব্বা যদি ৬৯ ইন্তেকাল না করে ৭১ সালে পাকিস্তানী আর্মীদের হাতে ইন্তেকাল করতেন, তাহলে আমাদের পিতৃহীন করা এবং কৈশোর তারুণ্যে জীবনের দূঃখ দূর্দশার জন্য অবশ্য আমরাও পাকিস্তানীদেরকে দোষারূপ করতাম। আমাদের সকল কষ্টের কারণ তাদেরকে ভাবতাম এবং পিতা হত্যার হত্যাকারী হিসাবে তাদেরকে ঘৃণা করে যেতাম।

      যেহেতু তিনি পাকিস্তানী বাহিনী কতৃক বা অন্য কারো দ্বারা নিহত হননি তাই আমরা উনার মৃত্যুকে আল্লাহর হুকুম বলে মেনে নিয়েছি।

      তাহলে আমার প্রশ্ন যারা অন্যের হাতে ঘটনা বা পরিস্থিতির শিকার হয়ে নিহত হন সে সব হত্যাকে আল্লাহর হুকুম বলে মেনে নিতে পারিনা? জিঘাংসা, হত্যার প্রতিশোধে স্পৃহা বুকে লালন করে না করে ঐ অন্যায় হত্যাকে দেশ এবং দেশের মানুষের সুখ শান্তির জন্য ত্যাগ বলে মেনে নিতে পারিনা?

      1. 3.1.1
        মজলুম

        তাহলে আমার প্রশ্ন যারা অন্যের হাতে ঘটনা বা পরিস্থিতির শিকার হয়ে নিহত হন সে সব হত্যাকে আল্লাহর হুকুম বলে মেনে নিতে পারিনা? জিঘাংসা, হত্যার প্রতিশোধে স্পৃহা বুকে লালন করে না করে ঐ অন্যায় হত্যাকে দেশ এবং দেশের মানুষের সুখ শান্তির জন্য ত্যাগ বলে মেনে নিতে পারিনা?

        তাহলে আইন আদালত বিচার উকিল এসব কোন দেশেই রাখতো না আজ যে খুনি তাকে যদি বিচারের আওতায় না আনেন তাহলে আরো খুনির জন্ম হবে এবং বেশী মাত্রায় হিংস্র হবে কারন তাদের বিচার হয় না বলে।

        তার উপর এপনি এমন খুনিদের কথা বলছেন যারা তাদের অপরাধ স্বীকারই করেনা, কখনো এই অপরাধের জন্যে ক্ষমা চায় নি  এবং ক্ষমা চাওয়ার লক্ষন ও দেখিনা, এরা এমনই ঘাঁড় তেড়া।  

        প্রাকৃতিক দূর্যোগেও হাজার হাজার মানুষ মারা যায়, কিন্তু তাতে কোন মানুষের হাত নেই, তাই বিচার ও নয়। কিন্তু মানুষ কতৃক হত্যাকান্ডকে ও গনহত্যাকে অবশ্যই বিচারের আওতায় নিয়ে আসা উচিত নইলে এই পৃথিবীতে ন্যায় বিচার শব্দটা মুচে যাবে।

        জামাতের  মতো  পাকিস্তান সরকার এখনো অফিসিয়ালি স্বীকার করে ১৯৭১ সালে কয়েক হাজার লোক নিহত হয়েছে যাদের বেশীরভাগই বিহারী। এখনো পাকিদের অফিসিয়াল হিসেবে মুক্তিবাহিনী একটা সন্ত্রাসী সংগঠন। যারা এখনো ক্ষমা চায় নি বাংলাদেশের কাছে তাদের কৃতকর্মের জন্যে। এইরকম খুনিদের সবাই শুধু ঘৃনাই করবে।

        মক্কা বিজয়ের সময় রাসূল(সঃ)  সবাইকে ক্ষমা ঘোষনা করেছেন মাত্র ১৫ জন  মক্কাবাসী ছাড়া। রাসূল(সঃ)  সবাইকে ক্ষমা করলেও এই ১৫ জনকে ক্ষমা করেন নি ওদের ভয়ংকর হত্যাকান্ডের জন্যে। এই ১৫ জনের মধ্যে একজন ছিলেন ইবনে খাত্তাব,  লোকেরা এসে রাসূল(সঃ) কে বললো ইবনে খা্তাবতো কাবার গিলাপ ধরে আছে যেন তাকে না মারা হয়, রাসূল(সঃ) এর আদেশ ছিলো তাকে সেখানেই হত্যা করে দাও।
        ইসলামে এটাকে বলা হয় কিসাস।

  2. 2
    মজলুম

    পাকিস্তানি সৈন্যদের করা বেলুসিস্তান ও ফাটা-খাইবার পাখতুনখাতে  করা যুদ্ব গুলোকে অনেক অভজার্ব করেছি। আমরা যারা ৭১ এর যুদ্ব দেখেনি তারা খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারবে পাকি সৈন্যরা পোড়া মাটি নিতি গ্রহন করে সব সময়।  
    তবে সদালাফে এইগুলা লেখা অরন্যে রোদনের মতো।

    থাবা বাবা দেখিয়ে আপনাকে কাফির/মুনাফিক বানানোর চেষ্টা। এ নিয়ে একটা ঘটনা বলছি।

    শিয়ারা বরাবরই লানত দিতে এক নাম্বর, লানত দেওয়া ওদের কাছে ইবাদতের মতো। লানত কাকে দিবে? সাহাবীদের দিবে।
    যেমনঃ হযরত আবু বকর লানতউল্লাহ, হজরত ওমর লানতউল্লাহ (তার উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক)

    জাকির নায়িক ১৯৯১ সাল হতে বিভিন্ন লেকচার দেন, শিয়ারা ছিলো নিশ্চুপ। ২০০৭ সালে এক লেকচারে জাকির নায়িক ইয়াজিদের কথা বলতে গিয়ে বলেছে ইয়াজিদ (পিস বি আপন অন হিম) বলেছেন।
     ব্যস জাকির নায়িক আর যায় কোথায় হাজার হাজার ভিডিওতে যাকির নায়িক কাফির ঘোষনায় ভেসে গেলো ইউটিউব। জাকির নায়িকের রিপ্লাইটা দেখবেন আশা করি।
     

    1. 2.1
      আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

      ধন্যবাদ। 

       

      থাবা বাবা দেখিয়ে আপনাকে কাফির/মুনাফিক বানানোর চেষ্টা। এ নিয়ে একটা ঘটনা বলছি।

       

      -- প্রতিটি ঘটনাই আমাদের জন্যে একটা পরীক্ষা মাত্র। আমি আমার মতো করে কথা বলি। ভুল ত্রুটির উর্দ্ধে না অবশ্যই। সুযোগ সন্ধানীরা ইসলামের নাম নিয়ে বন্ধুর মতো ঢুকে পড়েছে সদালাপে। এরা যতটা সম্ভব নিজেদের এজেন্ডাগুলো প্রচার করছে। এই ক্ষেত্রে অন্যরা মানে যারা নিজেদের বিশুদ্ধ ইসলামের অনুসারী বিবেচনা করেন তাঁরাও ফাঁদে পড়ে গেছেন। আবেগ নির্ভর অনুকরন করার প্রবনতাই আমাদের জন্যে কাল হয়ে গেছে। 

       

      যাই্ হোক জাকির নায়েকের এজিদ বিষয়ক বিতর্কের কথাটা শুনেছি -- ভিডিওটা দেখা হয়নি। ইনশা আল্লাহ শীঘ্রই দেখবো। 

       

      (আমার বিভিন্ন পোস্টে করা আপনার কিছু কমেন্টের জবাব দেওয়াটা জরুরী বিবেচনা করেও সময়ের কারনে দিতে পারছি না। আশা করি সবগুলো এক করে একটা জবাব দেবো, ইনশাল্লাহ।)  

      1. 2.1.1
        মুনিম সিদ্দিকী

        জিয়াভাই, এই সদালাপে কিংবা ফেসবুকে আমার পরিচিতজন যাদের সাথে দীর্ঘদিন থেকে এন্টি ইসলামিদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে ভার্চুয়াল যুদ্ধ চালিয়ে আসছি, তাদের কাউকে তো আপনাকে কাফির মুনাফিক বলে গালী দিতে দেখিনি! আমার বিশ্বাস রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে আমাদের কারো সাথে আপনার মতদ্বৈততা রয়েছে বটে কিন্তু এই মত দ্বৈততা থাকা স্বত্ত্বেও আপনি সবার কাছে শ্রদ্ধার পাত্র হিসাবেই আছেন।

        কাজেই কেউ আপনাকে মুনাফিক বা কাফির বলার প্রশ্ন আসতে পারে না। আমাকে তো আপনি জামাত /রাজাকার কত ট্যাগ করেছেন তাতে আমার অন্তরে দূঃখ লাগলেও তা আমি ভুলে গিয়েছি এই ভেবে যে, এই লোকটির আপন জন ৭১ সালে নিহত হয়েছেন, আপনজনের অভাব তার  কৈশোর, তার তারুণ্যে তার যৌবনে খুব প্রতিভাত হয়েছে, যার কারণে পিতা হারানোর বেদনাগ্রস্থ একজন মানুষ যদি আমাকে কিছু কটু কথা বলে ফেলেন তো বলতে থাক।

        তবে জিয়াভাই, ৭১ এর স্বাধীনতার বেদিমূলে যদি ধন, মান আর জান ত্যাগকে যদি কুরবান, আত্মত্যাগ, শহীদান বলে অভিষিক্ত করেন তাহলে তাদের উত্তরসূরীদের কাছ থেকে হিংসা কিংবা প্রতিশোধ নেবার স্পৃহা আসা কি চেতনার বৈপরীত্য হয়ে যাচ্ছেনা?

        যদি প্রতিশোধ নিতে হয় বা তাদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হয়, তাহলে যে কারণে তারা তাদের ধন, মান, প্রাণ ত্যাগ করে গিয়েছিলেন, সেই আরাধ্য অসম্পূর্ণ কাজকে সম্পূর্ণ করেই তা করে দেখাতে পারি। ধন্যবাদ।

        1. 2.1.1.1
          Sam

          @মুনিম সিদ্দিকী:

          “…..এই লোকটির আপন জন ৭১ সালে নিহত হয়েছেন, আপনজনের অভাব তার  কৈশোর, তার তারুণ্যে তার যৌবনে খুব প্রতিভাত হয়েছে, যার কারণে পিতা হারানোর বেদনাগ্রস্থ একজন মানুষ যদি আমাকে কিছু কটু কথা বলে ফেলেন তো বলতে থাক।“ মুনিম সিদ্দিকী

          মুনিম সাহেব,

          একটা বিষয় পরিষ্কার হতে পারছি না। ৭১ এ জিয়া সাহেবের বাবা হারানোর ব্যাপারটা। সম্ভবত মোস্তফা কামালের লেখা থেকে জেনেছিলাম উনি বাবাকে হারিয়েছেন ৭১ এ। আবার জিয়া সাহেবের কোন এক কমেন্ট থেকে জেনেছিলাম ঊনি কয়েক মাস শিবিরের সাথে যুক্ত ছিলেন হাইস্কুলে পড়ার সময়- কিন্ত উনার বাবার ভয়ে গোপনে অংশ নিতেন শিবিরের কার্যক্রমে। কাজেই বিষয়টা আমার কাছে পরিষ্কার নয়। যাইহোক-উনার এবং উনার পরিবারের জন্য সহমর্মীতা এবং দোয়া।

      2. 2.1.2
        ফাতমী

        @আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন, 

        আপনাকে তো কেউ কিছু বলে নাই, আপনার অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। মানুষের সমালোচনা করার অধিকার আছে। মানুষ জগতে এমন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। 

  3. 1
    ফাতমী

    পুরাতন হলেও লেখাটা অসাধারণ। আমি নির্বাচিত কলামে এই লেখাটাও যুক্ত করার জন্য সদালাপ সম্পাদককে অনুরোধ করব। 

     

    1. 1.1
      আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

      অনেক ধন্যবাদ। সত্য বলতে কি -- আমি আশা করিনি কেউ এই লেখায় কমেন্ট করবে। তার কারন হলো -- লেখা হিসাবে এই ধরনের লেখায় কোন ফায়ার ওয়ার্কস নেই -- নেই কোন বিতর্কিত বিষয় আর আমি সাম্প্রতিক কালে ভিলেন হিসাবে চিহ্নিত হয়েছি। 

      লেখাটা পুরাতন হলেও বিষয়বস্তু কখনই পুরাতন হবে না। একটা ফাইল খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ লেখাটা পেয়ে গেলাম -- ভাবলাম যথেষ্ট তথ্য আছে লেখাটায় -- প্রিয় সদালাপে পোস্ট করেই রাখি। 

       

      আবারো ধন্যবাদ। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.