«

»

Jun ১৮

গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ইসলামী শাসন

অনেকদিন লেখালেখি করা হয় না – বিশেষ করে সদালাপে লিখছি না – কারন সদালাপে সময় দিতে পারি না। ফেইসবুকে লেখা সহজ – কারন মাথায় একটা কিছু এলেই লিখে ফেলা যায়। কিন্তু সদালাপের জন্যে লেখা সময় সাপেক্ষ এবং কঠিন। যাই হোক – কিছু দিন ধরে কয়েকটা লেখা পড়লাম – একটার কথা বলা দরকার – তা হলো ধর্ম নিরপেক্ষতা নীতি সম্পর্কিত। এই লেখাটা মুলত তারই কিছু বিষয়ের উপর আলোকপাত করার চেষ্টা করবো। 

বিশ্ব এখন শাসিত হচ্ছে গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে। সর্বত্র গনতন্ত্র চর্চা হচ্ছে – তেমনি বাংলাদেশও একটা গনতান্ত্রিক দেশ হিসাবে পরিচিত হয়েছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থ ক্ষমতার বদল ছাড়া গনতন্ত্রের আর কোন উপাদানাই সেখানে কার্যকর নাই। তার কারন গনতন্ত্র যে বিশাল একটা বিষয় তা উপলদ্ধি করার মতো সামাজিক এবং রাজনৈতিক বিকাশ এখনও হয়নি বাংলাদেশে। গনতন্ত্র হলো সংখ্যাগরিষ্টের শাসন – সংখ্যা লঘিষ্টের অধিকার রক্ষার জন্যে। কথাটা আরেকটু পরিষ্কার করে বললে বলা যায় – গনতন্ত্রে সকল মত পথে এবং সকল আদর্শ আর বিশ্বাসের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করতে হয়। সেখানে প্রথমত কোন সম্প্রদায়ের কথা আসে – তারপর ব্যক্তিগত অধিকারে কথা আসে। যদি উদাহরন হিসাবে কানাডার কথা ধরি – এখানে মুলত সম্প্রদায়ের কথা এখন আর গুরুত্ব পায় না – যেমন খৃস্টান সম্প্রদায়ের বিশ্বাসের সাথে যখন সমকামীদের বিরোধ হলো – কানাডার সুপ্রীম কোর্ট তখন সমকামীদের অধিকারের পক্ষে রায় দিলো। 

উপরের উদাহরনটা দিলাম একটা বিশেষ উদ্দেশ্যে – বাংলাদেশে ইসলাম  অনুসারীরাও গনতন্ত্রে বিশ্বাস করেন কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে হয়তো সমকামীদের অধিকারের বিষয়টি চলে আসবে – তখন গনতন্ত্রের কাঠামোর মধ্যে সমকামী বনাম ইসলাম এর বিরোধ অনিবার্য হয়ে উঠবে। একদিকে গনতন্ত্রের চর্চা অন্যদিকে ব্যখ্তিগত পছন্দ অপছন্দের স্বাধীনতা বিরোধীতা – এই দ্বন্দ্বের মাঝে পড়ে যাবেন ইসলাম নিয়ে রাজনীতি করা দলগুলো। 

আশা করা যায় বিষয়টা এখন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে – বাংলাদেশ যে মডেলের গনতন্ত্র চর্চা করছে – ইসলামপন্থী – বাম পন্থী এমন কি স্বৈরাচারপন্থীরাও – তা হলো পশ্চিমা মডেল। এই মডেলের কার্যকর প্রদর্শনী দেখছি গত বিশ বছর ধরে। যারা শুধু বিশ্বাস করেন গনতন্ত্রের চর্চা করে সরকার বদল করে ক্ষমতায় গিয়ে ইসলামী নীতি আদর্শ তথা শারিয়া আইন চালু করবেন – তাদের সামনে সবচেয়ে জ্বলন্ত উদাহরন হলো মিশর। আর বাংলাদেশের পাঁচই জানুয়ারীর নির্বাচনও এক ধরনের স্বপ্ন ভংগের কারন হতে পারে। সেখানে নির্বাচনের সকল নিয়ম নীতি ঠিক রেখেই একটা দল ক্ষমতা ধরে রাখার সুযোগ পেলো। 

আর পশ্চিমা গনতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংগ হলো ধর্ম নিপেক্ষতা। কথাটা আরো ভাল ভাবে বললে বলা যায় কোন সুনির্দিষ্ট আদর্শ অনুসরন করা পশ্চিমা গনতন্ত্রের জন্যে হারাম। এখানে যেমন কোন ধর্মীয় আদর্শের গুরুত্ব নেই – তেমনি নেই কোন মানবসৃষ্ট যেমন মার্কসবাদ লেলিন বাদ অথবা বুশবাদ ইত্যাদিও গুরুত্ব হীন। এখানে নীতি-আদর্শ প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হয়। মানুষের পছন্দ অপছন্দই মুলত এখানে মুল কথা – যতক্ষন না অন্যের ক্ষতি হচ্ছে ততক্ষন মানুষ তার পছন্দ মতো কাজ করতে পারে। সেখানে ধর্মীয় দৃষ্টিভংগীকে রক্ষনশীলতা এবং প্রাচীন চিন্তাভাবনার প্রতিফলন হিসাবেই বিবেচনা করা হয়। 

এই অবস্থায় বাংলাদেশের ধর্মীয় আদর্শ অনুসরন এবং বাস্তবায়নে রাজনীতি করা দলগুলোকে উপলদ্ধি করতে হবে – কাঁঠালের আম-সত্ত্ব হয় না। অনেকে হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন ভারতে হিন্তুত্ববাদী মোদি বিজেপিকে ক্ষমতায় নিয়ে এলো কিভাবে। মোদি হিন্দু ধর্মের জিগির তুলেছে মুলত সাধারনের ভোট টানার জন্যে কিন্তু গুজরাটে প্রকৃতপক্ষে পুঁজিবাদের বিকাশের একটা বিরাট সাফল্য দেখিয়ে বিশ্বের পুঁজির মালিক তথা কর্পোরেশনগুলোর আস্থায় নিতে পেরেছে। উদাহরন হিসাবে যদি টাটার কথাই ধরি – টাটা বাংলাদেশে এসে বিনিয়োগ করতে ব্যর্থ হলো – এমনকি পশ্চিমবংগেও বিনিয়োগ করতে ব্যর্থ হলো – কিন্তু মোদি গুজরাটে এতো দ্রুততার সাথে টাটাকে বিনিয়োগের সুযোগ করে দিয়েছে – ফলে সকল কর্পোরেশনই তাকে বিপুল ভাবে আর্থিক সহায়তাসহ সমর্থন দিয়েছে। যে সুবাদে মোদি তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে দলকে বিপুল ভাবে বাজারজাত করতে পেরেছে। 

মোদ্দা কথা হলো – গনতন্ত্র, পুঁজিবাদ আর ধর্ম নিরপেক্ষতা সবই একটা আরেকটার পরিপূরক। একটা বাদ দিয়ে আরেকটাকে গ্রহন করা হয়ে পশ্চিমা মডেল কাজ করবে না – অথবা বলা যায় করতে দেওয়া হবে না। যেমন দেওয়া হয়নি মিশরে অথবা প্যালেষ্টাইনে । তাই বাংলাদেশে বর্তমান গনতান্ত্রিক চর্চার ভিতর দিয়ে যেমন ইসলাম পন্থীদের ক্ষমতায় যাওয়ার নূন্যতম সম্ভাবনা নেই – তেমনি নেই বামপন্থীদেরও। তবে ইসলামপন্থীরা যেহেতু সংখ্যা গরিষ্ট এবং যদি তারা তাদের শক্তিপ্রদর্শন করতে পারে তবে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যে বিভিন্ন দলগুলো ইসলামকে ব্যবহার করবে সিড়ি হিসাবে – যা অতীতেও করা হয়েছে। ইসলামের আদর্শ অনুসরন না করে শুধু নামে মাত্র ইসলাম ( যেমন পোস্টারের বিসমিল্লাহ, আল্লাহু আকবর, বা সংবিধানে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম ইত্যাদি লিখে) ব্যবহার করে ইসলামী আন্দোলনে বিভ্রান্ত করা ছাড়া তেমন কোন কাজ হবে না। যেমন বাংলাদেশের ইতিহাসে দুই সামরিক স্বৈরশাসক সাফল্যের সাথে ইসলামকে ব্যবহার করেছেন। জিয়াউর রহমান সংবিধানে এক আল্লাহর উপর বিশ্বাসকে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্যে বাধ্যতামূলক করলেও আল্লাহ আদেশ নিষেধ বাস্তবায়নে সামান্যতম আগ্রহ দেখায়নি – যেমন মদ,জুয়া,ঘুষ, সুদ বন্ধ করার সামান্য চেষ্টাও করেননি বরং সেই শাসনামলে  বাংলাদেশের আনাচে কানাচে কৃষি প্রদর্শনীর নামে যাত্রা, হাউজির মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে জুয়া আর অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়েছিলো। আরেক স্বৈরশাসক এরশাদ সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসাবে সংযুক্ত করে নিজেকে ইসলামের সেবক হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করে একটা ভাওতাবাজী করলেও দেশ থেকে ইসলাম বিরোধী কোন কার্যক্রমই বন্ধ করেনি। এমন কি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার – যারা ইসলামের নাম ব্যবহার করে সব সময় – তাদের শাসনামলেও একটাও আইন পাশ হয়নি যা দিয়ে আল্লাহ সুষ্পষ্ট নিষেধাজ্ঞাগুলোর প্রতিফলন ঘটে – যেমন জামায়াতের নেতা সমাজকল্যান মন্ত্রী হিসাবে পাঁচ বছর শাসন করলেও তারই মন্ত্রনালয়ের অধীনে লাইসেন্সকৃত পতিতালয় বন্ধ করা বা পতিতাদে পূর্নবাসনে কোন পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে শুনা যায় নি। 

সুতরাং  গনতন্ত্র কথা বলে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে বাতিল করার কোন সুযোগ নেই। প্রকৃতপক্ষে যারা ইসলামী শাসন ব্যবস্থা তথা শরিয়া আইনের অধীনে দেশ বা একটা রাষ্ট্র দেখতে চান – তাদের জন্যে পশ্চিমা মডেলের গনতন্ত্র চর্চা করা আসলে স্ববিরোধীতা। এই ফাঁদে পা দিয়ে অনেক দেশের মুসলিমরাই সময় নষ্ট করেছে – বিভ্রান্ত হয়েছে – ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার জন্যে প্রথম কাজই হবে নিজস্ব গনতান্ত্রিক মডেল তৈরী – অথবা একটা ভিন্ন ধরনের শাসন ব্যবস্থা যাতে কোরান হবে মুল এবং সচেতন এবং শিক্ষিত মানুষদের মাঝ থেকে বাছাই করা প্রতিনিধিরাই শাসনব্যস্থা সম্পর্কে মতামত দিতে পারবে। পাইকারী হারে ভোটের মাধ্যমে সরকার তৈরী অথবা সরকার পরিবর্তন করে ইসলামী শাসন চালু করা বা বাস্তবায়ন  সম্ভব নয় – কারন ইসলাম সকল মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ মতো কাজ করবে না – অনেকেরই নানান বিষয়ে আপত্তি আসবে – সেখানে ভোটভোটিতে আল্লাহ আইন বনাম মানুষের পছন্দ মুখোমুখি হবে – যা কোন ভাবেই কাঙ্খিত নয়। 

ইসলাম আর ধর্মনিরপেক্ষমতা যে পরষ্পর বিরোধী না – বরঞ্চ ইসলামী শাসনের একটা অংশই রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতা – তা বোধ হয় মদিনা রাষ্ট্র থেকেই আমরা বুঝতে পরছি।  ইসলাম রাষ্ট্রগুলো ছিলো একসময় অন্য ধর্মের মানুষের জন্যে সবচেয়ে নিরাপদ আবাস – তারা সেখানে নিজের বিশ্বাসের চর্চাসহ বসবাস করতো অন্য নাগরিকদের মতোই – না হলে ভারতে আজ হয়তো সবাই মুসলিমই থাকতো – অথবা মিশরের কোন কেপটিক কৃষ্টান থাকতো না অথবা ইরাকে ইহুদীদের সিনাগগগুলো দাড়িয়ে থাকতো না। তাই ধর্মনিরপেক্ষমতাকে ইসলামের প্রতিপক্ষ না বানিয়ে গনতন্ত্র চর্চার বিষয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বরং গনতন্ত্র চর্চার নামে ইসলামী দলগুলোকে সময় নষ্ট না করে নিজেদের কর্মী এবং সাধারন মানুষকে সচেতন করে তোলা – কারন শরিয়া আইন বাস্তবায়নের পূর্ব শর্তই হলো সকলের আইন সম্পর্কে সুষ্পষ্ট জ্ঞান থাকা। বর্তমান চালু গনতন্ত্রের নামে কর্পোরেট গনতন্ত্র এবং মানুষের ইচ্ছাপুরনের ব্যবস্থা যে সঠিকভাবে কাজ করছে না ।  তার বিপরীতে ইসলাম একটা ন্যয় ভিত্তিক সুষম এবং জনকল্যানমূলক শাসন ব্যবস্থার কথা বলেছে তা সাধারনের বোধগম্য করার কাজটা আলেম সমাজকেই নিতে হবে। যখন বেশীর ভাগ মানুষ বুঝতে পারবে যে ইসলামই মানুষের দুনিয়া আর আখেরাতের মুক্তির একমাত্র পথ – তখন ইসলামী শাসনের জন্যে একটা পথ তারাই বের করে নেবে। 

১২ comments

Skip to comment form

  1. 5
    ফয়েজ

    ধন্যবাদ আপনার লেখা ভাল লাগল। 

    গনতন্ত্র (পুজিবাদ)

    কমিনিষ্ট

    ইসলাম

    এই তিনটি আদর্শ বর্তমান সমাজে আমরা দেখতে পাই। যার যার প্রতিষ্ঠার নিজশ্ব পদ্ধতি রয়েছে। আমাদের সমাজ তিনটি আদর্শ নিয়ে একটি জগাখিচুরি অবস্থায় রয়েছে। যার জন্য আমরা সব তাল গোল পাকিয়ে ফেলি। 

    নির্বাচন গনতন্ত্রের কোন অংশ নয়। নির্বাচন হচ্ছে একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে অনেক অপশনের মধ্যে একটি অপশন বেছে নেয়া যায়। নির্বাচন ইসলামেও থাকতে পারে কমিনিষ্টেও থাকতে পারে।

    ইসলাম প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি কি তা রাসুল (স:) এর জীবনী পড়লেই আমরা সহজেই বুঝতে পারব । মদিনাতে যেভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সেটাই ইসলাম প্রতিষ্ঠার সহি পদ্ধতি ।  অন্য কোন পদ্ধতিতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হতে পারে তাবে তা জায়েজ হবে না কারন নামাজ-রোজা যেভাবে রাসুল (স:) এর পদ্ধতি অনুসারেই করতে হবে সেভাবেই ইসলাম প্রতিষ্ঠাও রাসুল (স:) এর দেখানো পদ্ধতি অনুসারেই করতে হবে। 

     

    ধন্যবাদ

  2. 4
    আব্দুর রহমান আবিদ

    জিয়া ভাই,

    সময়োপযোগী এ লেখায় আপনার বিশ্লেষন ভাল লেগেছে। ইচ্ছে ছিল খুব লম্বা একখানা মন্তব্য দেবো। কিন্তু সময়াভাবে সেটা হয়ত সম্ভব হবেনা।

    পাঠকদের কেউ কেউ আপনার এ লেখায় স্ববিরোধিতা খুঁজে পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। কারন, আমার হিসেবে- আপনার এ লেখার বিষয়বস্তুটাই এমন যে, চেষ্টা করেও স্ববিরোধিতা এড়ানো আসলে কঠিন। কেননা মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে গণতন্ত্র পশ্চিমা দেশগুলোর মত এখনও ম্যাচিয়্যুর হয়নি এবং প্রকৃত গণতন্ত্রের সাথে ধর্মীয় অনুশাষনের যে অবধারিত সংঘাত (যেমনটা আমরা এখন আমেরিকা, কানাডা সহ অধিকাংশ পশ্চিমা দেশগুলোতে দেখতে পাচ্ছি), সেটার মুখোমুখি আমি-আপনি কিম্বা আমাদের জেনারেশন এখনও হইনি, যদিও ভবিষ্যতের মুসলিম জেনারেশন যে হবে, সেটা মোটামুটি ধারনা করা যায়। যে অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে আমি-আপনি ও আমাদের জেনারেশন এখনও পর্যন্ত যাইনি, সেটা সম্পর্কে প্রেডিকশন করতে গেলে ডেফিনেটিভ কোনো অভিমত দেওয়া স্বভাবতই কঠিন। সম্ভবত সেকারনেই প্রকৃত গণতন্ত্রের বিপরীতে আপনি কোনো সলিউশনের কথা বলেননি।

    যারা নর্থ আমেরিকায় বসবাস করেন, এবং 'লা-রিবা', 'গাইডেন্স', কিম্বা 'ডেভন ব্যাংক' নামক ইসলামিক ফাইনানশিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে এসব দেশে বাড়ী কিনেছেন, তারা সম্ভবত বুঝতে পারবেন যে, "আম ছাড়া আমসত্ত্ব বানানো"র অভিজ্ঞতা কী। যে কারনে অসংখ্য ওলামা এভাবে বাড়ী কেনার বিপক্ষে। অবশ্য পক্ষেও কেউ কেউ আছেন। বিষয় সেটা না। ব্যাপারটা হলো, শতভাগ সুদের উপর দাঁড়ানো যে নর্থ আমেরিকান ফাইনানশিয়াল সিস্টেম, তার ভেতরে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় থেকে ভোক্তাকে 'পিওর ইসলামিক ফাইন্যান্স' ডেলিভারি দেওয়া যেরকম "আম ছাড়া আমসত্ত্ব বানানো"র মত প্রায় অসম্ভব একটা বিষয়, সেরকম প্রকৃত গণতন্ত্র মেনে 'ইসলামিক শাষন' ডেলিভারি দেওয়া অনেকটা একই রকম বিষয়।

    তাহলে বাংলাদেশে জামাতে ইসলামীর কিম্বা মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুডের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় যাওয়ার বিপরীতে আফগানস্থানে তালেবানদের কিম্বা অতি সম্প্রতি ইরাকের কিছু কিছু দখলকৃত শহরে 'ইসলামিক স্টেট অব ইরাক এ্যান্ড সিরিয়া'র (ISIS) ক্ষমতা গ্রহন করে ইসলামী শাষনের নামে মানুষের ওপর জোর করে অপশাষন চাপিয়ে দেওয়া কী প্রকৃত উত্তর? যদি আমাকে এ প্রশ্নটা করেন, তবে আমি বলবো- এর সঠিক উত্তর আজকে অন্তত আমার জানা নেই। আমার হিসেবে, মনে মনে একটা 'cone' কিম্বা পিরামিড কল্পনা করলে, বিভিন্ন মতাদর্শের মুসলিম গ্রুপগুলো বর্তমান সময়ে এটার বেইজের কাছাকাছি অবস্থান করছে। পিরামিড বেঁয়ে ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসা ওপরের দিকে আমরা যত উঠতে থাকবো, আমদের পারষ্পরিক সংঘাত ততই বাড়বে এবং মৌলিক ইসলামিক শাষনের যুগোপযোগী বাস্তব প্রকৃতি সম্ভবত একইসাথে ততটাই পরিষ্কার হয়ে আসবে।

  3. 3
    ফাতমী

    তারমানে কি আপনি পড়ামর্শ দিচ্ছেন যে, একটা কাঠামোর ভিতর থেকে নিজেদের অধিকার চাওয়া কি মুসলিমদের উচিত নয়?

    1. 3.1
      আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

      যে কাঠামো নিশ্চিত ইসলামের সাথে সংঘাতপূর্ন -- তাকে রক্ষা করে -- অথবা তাকে রক্ষার পক্ষে কাজ করে তাকে রক্ষা করা আর তার মধ্যে থেকে অধিকার চাওয়া মানেই কি একটা সমঝোতায় যাওয়া। যেমন ইসলামে সমকামীতা হারাম -- গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সমকামীদের অধিকার না দেবার কোন যুক্তি নেই -- সুতরাং এখানে মুসলমানদের একটা সমঝোতায় আসতে হবে। প্রশ্নটা  হলো -- কার কাছে অধিকার চাইবে মুসলিমরা?

       

      1. 3.1.1
        ফাতমী

        @আবু সাঈদ জিয়াউদ্দীন,

        তাহলে, গনতান্ত্রীক ব্যাবস্থায় গাড়ির সিট ব্যাল্ট না-বাধলে শাস্তি দিবার বিধান হয় কি করে?

      2. 3.1.2
        mahfuz

        //গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সমকামীদের অধিকার না দেবার কোন যুক্তি নেই – সুতরাং এখানে মুসলমানদের একটা সমঝোতায় আসতে হবে। প্রশ্নটা  হলো – কার কাছে অধিকার চাইবে মুসলিমরা?//

        সুদ, ঘুষ, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি ইত্যাদির সাথে যেমন মুসলিমদের কোন সমঝোতা হতে পারেনা, তেমনি সমকামিদের সাথেও সমঝোতা করার কোন সুযোগ নেই। কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যদি কোন হারাম কাজকে সমর্থন দেয়া হয়- সেক্ষেত্রে যথাসম্ভব তা থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলা ছাড়া কোন ধরনের সমঝোতার কোন সুযোগ নেই।

        ইসলামে শিরক অর্থাৎ মহান স্রষ্টা ছাড়া অন্য কারো (মানব, দানব, দেব-দেবি, বৃক্ষ, পাহাড়, জী্ব-জন্তু, তারকারাজি ইত্যাদির) পূজা-অর্চনা করা সবচেয়ে বড় অপরাধ। কিন্তু তারপরও কোন ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাসরত অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বিবেচনা করে নিজস্ব পরিসরে তাদেরকে তাদের সেই ধর্মীয় রীতি মেনে চলার অধিকার দেয়া হয়। যদিও তা ইসলামের সাথে সম্পূর্ণরূপে সাংঘর্ষিক। অন্যন্য ধর্মীয় জনগোষ্ঠীদের সাথে সমঝোতা হলে শুধুমাত্র তাদের বেলায় এটাই হলো ইসলামের অসাম্প্রদায়িক নীতি। আর তারা সমঝোতায় না এসে যুদ্ধে লিপ্ত হলে, একে অপরকে যুদ্ধবন্দি কিংবা হত্যা করা ছাড়া অন্য কোন অপশন নেই।

        কিন্তু সামাজিক দুরাচার যেমন চুরি, ডাকাতি, খুন, রাহাজানি, ব্যভিচার, সমকামিতা, ঘুষ, সুদ ইত্যাদি থেকে সমাজকে মুক্ত রেখে একটি পরিচ্ছন্ন ইসলামি অর্থাৎ শান্তিময় সমাজ গঠনের জন্য এই ধরনের কুকর্মে লিপ্তদেরকে রাষ্ট্রীয় বিধান অনুসারেই শাস্তি ভোগ করতে হবে। তারা যে ধর্মেরই মানুষ হোক না কেন, প্রতিষ্ঠিত ইসলামি সমাজ ব্যবস্থায় এই ধরনের দুষ্কৃতিকারীদের সাথে সমঝোতায় আসার কোন সুযোগ নেই, সবার জন্য একই শাস্তি প্রয়োগ করতে হবে। তবে এর আগে কোন্ কোন্ ধরনের কুকর্মের জন্য সেই রাষ্ট্রে মাঝে কিরূপ শাস্তির বিধান আছে সে সম্পর্কে ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাসরত সকল ধর্মের মানুষকে সে ব্যাপারে ওয়াকিবহাল করানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
        ধন্যবাদ-

  4. 2
    মুনিম সিদ্দিকী

    হ্যা অনেক ভাবনার খোরাক আছে আপনার এই ব্লগে, তবে আমার কাছেও বেশ কয়েক যায়গায় বক্তব্যকে স্ববিরোধীতাময় মনে হয়েছে। আর হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, আমরা সবাই দুই বিপরীতধর্মী জীবনাচারের মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করে চলছি। ধন্যবাদ।

    1. 2.1
      আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

      ধন্যবাদ মুনিম ভাই। 

       

      স্ববিরোধীতাগুলো বাদ দিলে যদি আমার বক্তব্যের মুল বিষয়টা বুঝতে পারেন তবেই আমি স্বার্থক। আমার বক্তব্য যদি এক কথায় বলি তাহলে এভাবে বলা যায় -- পশ্চিমা মডেলের গনতন্ত্রের আলেয়ার পিছনে ছুটে ইসলামী শাসন কায়েমের চিন্তা করা ভুল -- কারন সেখানে ব্যক্তির অভিলাশকেই প্রাধান্য দেওয়া হয় -- মুল নীতি হলো ভোগেই সাফল্য -- আর ইসলামে ভোগের সাথে পরকালের সাফল্যও একটা বিরাট বিষয়। 

       

      সুতরাং শুধু পশ্চিমা মডেলের গনতন্ত্রের একটা উপাদান ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধীতা না করে পুরো প্যাকেজটাকেই বজর্ন করতে হবে। 

       

      ধন্যবাদ। 

      1. 2.1.1
        মুনিম সিদ্দিকী

                                      মনের মধ্যে যা আছে সেটাই মুখে বলবে– ৩:১৬৭।

        জিয়াভাই, আপনি আপনাদের মত জ্ঞানীগুনী নই! তাই আমার অভিমত হয়তো অর্বাচিনের অভিমত হয়ে যাবে। আমি যেটি বুঝি ইসলাম যেহেতু সর্ব যুগের উপযোগী জীবন ব্যবস্থা তাই ইসলামের ধারণ ক্ষমতা অপরিসীম! যদি এই গুণ ইসলামে না থাকতো তাহলে বিগত ১৪শত বছরে ইসলাম রাষ্ট্র শক্তি হিসাবে প্রসারিত হতে পারতোনা। ইসলামের মৌলিক বিষয়ে ছাড় না দিয়েও ইসলাম অন্যান্য মতবাদ/ ধর্মীয় আচারীত রীতিনীতির সাথে সহঅবস্থান করে চলতে পারে। ইসলাম কুপ বা বদ্ধ পুকুরের পানির ন্যায় নয় ইসলাম সদা প্রবাহমান নদীর পানির মত।

        ধর্মের ইতিহাস পড়ুন আর ভিন্ন মতবাদের ইতিহাস পড়ুন দেখবেন অকস্মাৎ নতুন কোন ইজম রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসেনি বা জনগণের কাছে গ্রহনীয় হয়ে উঠেনি।

        মুসা আঃ শরীয়ত প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই সে যুগ ছিলো যাদুবিদ্যার যোগ, যাদুবিদ্যা ছিলো সমাজ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার হাতিয়ার। তাই সে যুগে মুসা আঃ কেরামত আর মাযেযা দিয়েই তাদেরকে মোকাবেলা করে বিজয়ী হতে হয়েছিলো, বিজয়ী হয়েই যাদু বিদ্যার প্রসার আর প্রচারকে সমাজ এবং রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া হয়েছিলো।

        তেমন করে মুহাম্মদ সাঃ এর যুগ ছিলো কবিতা আর কবিদের যুগ। রাসুল সাঃ ও তাদেরকে প্রতিহত করেছিলেন আলকোরানের সুর আর কথা দিয়ে।

        ঠিক এখন আমাদের পৃথিবী গণতান্ত্রিক মতবাদের যুগ, এই যুগে সমাজ, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে অবশ্যই গণতন্ত্রকে ব্যবহার করেই ক্ষমতায় আসতে হবে। এই যুগে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার আর কোন পথ কারো কাছে গ্রহনীয় হবেনা।

        বেশী দূর যেতে হবেনা হিটলারের ইতিহাস দেখুন সে কিন্তু গণতান্ত্রিক ভাবেই ক্ষমতায় এসেছিলো, আমাদের দেশের ইতিহাস দেখুন শেখ মুজিবুর রহমানও গণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতায় এসেছিলেন। হিটলার, মুজিব জনগণের অনুমোদন নিয়েই ক্ষমতায় এসেছিলেন। তারা তাদের মিশন পূর্ণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলেই আজ তাদেরকে নেতিবাচক ভাবে মূল্যায়ন করা হয় কিন্তু এরা যদি সফল হতেন তাহলে তাদের ইতিহাস বীরপুরুষের ইতিহাস হিসাবেই লেখা হতো।

        যেমন করে রাম বিজয়ী হয়েছিলেন বলেই কবিরা রামায়ণ লিখেছিলেন,যদি রাম বিজয়ী না হয়ে রাবণ বিজয়ী হতো তাহলে এই কবিরা রাবাণায়ণ লিখতেন।

        মূলকথা; গণতান্ত্রিক উপায়ে ইসলাম যদি পৃথিবীতে আবার বিজয়ী হতে পারে তখন সারা বিশ্বই ইসলামী শরিয়াহ বিরুধী সকল কাজকে বেআইনি বলেই মেনে নিতে দ্বিধা করবেনা। শক্তিমানরাই ন্যায় অন্যায়ের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে থাকেন। ধন্যবাদ।

         

  5. 1
    মাহফুজ

    জিয়াউদ্দিন ভাই,
    আপনার পোষ্টটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে খুবই ইমপর্টেন্ট একটি বিষয়। তবে কিছু বক্তব্য নিয়ে মত বিনিময় করতে চাই।
    আপনি একদিকে বললেন বললেন-
    //গণতন্ত্রের কথা বলে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে বাতিল করার কোন সুযোগ নেই।//
    আবার বললেন-
    //ইসলাম আর ধর্মনিরপেক্ষমতা যে পরষ্পর বিরোধী না – বরঞ্চ ইসলামী শাসনের একটা অংশই রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতা – তা বোধ হয় মদিনা রাষ্ট্র থেকেই আমরা বুঝতে পরছি।//

    আমার মনে হয় আপনি যদি বলতেন- "ইসলাম আর অসাম্প্রদায়িকতা যে পরষ্পর বিরোধী না – বরঞ্চ ইসলামী শাসনের একটা অংশই রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িকতা – তা বোধ হয় মদিনা রাষ্ট্র থেকেই আমরা বুঝতে পরছি।"

    তাহলে দুটি বক্তব্যের মাঝে পরস্পর বিরোধীতা থাকত না।
    আশাকরি আমার বক্তব্যটি বুঝতে চেষ্টা করবেন-
    ধন্যবাদ-

    1. 1.1
      আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

      ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্যে। 

       

      অবশ্যই শাব্দিক অর্থের বিবেচনায় কথাটা স্ববিরোধীই মনে হচ্ছে। তবে যদি আপনি কথাটা এভাবে দেখেন -"রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরেপক্ষতা" তাহলে হয়তো কথাটা ভিন্ন অর্থ হবে। গনতন্ত্রের প্রেক্ষাপটে ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ আর ইসলামী শাসন ব্যবস্থার প্রেক্ষিতে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র সম্পূর্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে। যা দেখা যায় ইসলামী শাসন ব্যবস্থায়। ভারতের মুসলিম শাসকগন থেকে শুরু করে অটমান সবাই রাষ্ট্রকে ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ থেকে বিরত রেখেছে -- যার ফলে ভারতে প্রাচীন মন্দির থেকে শুরু করে ইরাকে প্রাচীন সিনাগগ সবই বহাল আছে -- শুধু তাই নয় -- ইহুদীরা যখন খৃষ্টানদের হাতে নানান দেশে নিগৃত হচ্ছিলো -- তখন তারা মুসলিম শাসকদের শাসনের অধীনে নিরাপদে বসবাস করেছে শুধুই না -- নিজেদের ধর্মও পালন করেছে নির্ভিঘ্নে। 

       

      ধন্যবাদ। 

      1. 1.1.1
        sotto

        যারা ধর্মনিরপেক্ষতার গান গেয়ে ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েমের জিগির তোলে, তারা কখনই ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়না ও পারেনা। কারণ তাদের দৃষ্টিভঙ্গিই হলো লোকদেখানো ইসলামের গান গেয়ে সব সময় ইসলামের মৌলিক নীতিকে এড়িয়ে চলা।
        ধন্যবাদ-

Leave a Reply

Your email address will not be published.