«

»

Aug ০৭

ফেইসবুকের দুই স্ট্যাটাস (বিষয়ঃ বাংলাদেশের রাজনীতি)

সাধারনভাবে আওয়ামীলিগের সমালোচনা করিনি গত পাঁচ বছর। তার কারন হলো – সুশীল হওয়ার ইচ্ছা নেই একদমই। আর আওয়ামীলিগ আমার প্রানের দাবী বাস্তবায়ন করছিলো। তার মানে এই না যে আওয়ামীলিগ দুধে ধোঁয়া তুলশী পাতা। আওয়ামীলীগ নীতি আদর্শের ক্ষেত্রে চরম হিপোক্রেসীতে আক্রান্ত। বঙ্গবন্ধু বামদের পরামর্শে ঢালাও ভাবে ডানপন্থী রাজনীতি নির্বাসনে পাঠিয়েছিলো – ফলে সবাই বামদিকে গাদাগাদি করে ছিলো ৭৫ সাল পর্যন্ত আর বঙ্গবন্ধুর উপর চরম আঘাতটাও আসে বামদিক থেকেই। ওরা ছিলো আবার "বৈজ্ঞানিক বাম"। যারা ৭৫ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর চরম শত্রু ছিলো যেই বামরা এখন প্রায়শ্চিত্ত করছে শেখ হাসিনাকে সেবা দিয়ে (ইনু, মেনন আর দিলীপ বড়ুয়া) আর সেই সময়ে যারা আওয়ামীলগের মগজে বসে আওয়ামীলিগ নিয়ন্ত্রন করতো তারা এখন আওয়ামীলীগ বিরোধীতায় জামায়াতের মিত্র হয়ে গেছে (যেমন সিপিবি)। কিভাবে এইটা সম্ভব হলো। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিতে চলার দল আওয়ামীলীগের ব্যানারে লেখা থাকে "আল্লাহ সর্বশক্তিমান" – সেই ব্যানারের পিছনে সাড়ি সাড়ি ভিন্নধর্মী, বাম, নাস্তিক সবাই জিন্দাবাদ দেয়। ভোটের জন্যে ধর্মকে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আওয়ামীলিগ অন্যদের পিছনে ফেলে দিয়েছে। 

যাই হোক – আওয়ামীলীগ দেশের রাজনীতিকে নিয়ণ্ত্রন নিতে গিয়ে পর্দার আড়ালে অনেক সমঝোতা করছে যা অনেকটা প্রকাশ্যেও চলে আসে – যেমন হেফাযতকে নিয়ণ্ত্রন করতে তারা কোন পথে হেঁটেছে তা আমরা জানি না – কিন্তু জানি যে হেফাযত আপাতত সরকারকে বিরক্ত করবে না বলেই মনে হচ্ছে – এমন কি গাজার গনহত্যা নিয়ে ওরা একটা বিক্ষোভও করেনি – যদিও আমেরিকায় কোরান পোড়ানো অজুহাতে ঢাকায় তান্ডব চালিয়েছে এই হেফাযতের সমর্থকরাও। হেফাযত এতো বড় গনহত্যার বিষয়টি "ইসরায়েলের দূতাবাস ঘেরাও" ধরনের একটা হাস্যকর বিবৃতি দিয়ে নিজেদের বাস্তবতা বিবর্জিত জ্ঞানে প্রদর্শন করা ছাড়া কিছু্ই করেনি। 

আওয়ামীলিগের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো দূর্নীতি বিরোধী অবস্থান নিতে দূর্বলতা। শুধু একজনের কথাই্ বলি -সাবেক যুব ইউনিয়ন নেতা আব্দুল মান্নান এবং উনার ভাই ব্রাদার দোহার – নবাবগঞ্জ এলাকায় যা করেছে তার উপযুক্ত জবাব দিয়েছে এলাকাবাসী একজন জাতীয়পার্টির প্রার্থীকে নির্বাচিত করে। এলাকায় গেলেই জানা যাবে কি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছে এই লোক। কিন্তু তারপরও তাকে সংবাদ সন্মেলনের নামে আওয়ামীলিগের প্রথম সাড়িতেই দেখা যায়। দল হিসাবে আওয়ামীলিগ চিহ্নিত এই লুটেরাকে শাস্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছে – মানেই দূর্নীতিবাজদের আশ্রয়- প্রশ্রয় দিচ্ছে‌ই দিচ্ছে আওয়ামীলিগ। আর কালো বিড়ালের কথা না হয় নাই বা বললাম। 

আওয়ামীলীগ এক হিসাবে ভাল সময় পার করছে – কারন একটা দূর্বল প্রতিপক্ষকে তাদের সামাল দিতে হচ্ছে। এই অবস্থা হয়তো বেশীদিন থাকবে না। বাংলাদেশের মানুষ হয়তো এক সময় নিজেই দায়িত্ব নিয়ে নেবে দূর্নীতি আর অপশাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের। 

আওয়ামীলিগের সাফল্য অনেক যা আমরা জানি – কিন্তু ব্যর্থতাগুলো তেমন জানি না কারন বাংলাদেশে মিডিয়ার অধিকাংশ রাজনৈতিক অথবা ব্যবসায়িক কারনে সরকারের সমালোচনা এড়িয়ে চলে। (এই ক্ষেত্রে অবশ্য বাংলাদেশকে রাজনীতিশূন্য করে সুশীলদের মাধ্যমে অগ্রতান্ত্রিক শাসন চালানোর এজেন্ডাধারী এবং বিশেষ মহলের সাহায্যপুষ্ট মিডিয়া যেমন প্রথম আলো, ডেইলি স্টার বা নয়াদিগন্তের বিষয়ে ভিন্ন ভাবে ভাবতে হবে।) তার মানে এই না যে সাধারন মানুষ জানে না। উদাহরন হিসাবে বিমান এবং ঢাকা ওয়াসার কথা বলা যায় – সেখানে সরকার বিপুল লুটপাট বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার – অথবা বলা যায় করতে চায়নি। সেখান থেকে বিপুল পরিমান অর্থ সরকারী উচ্চমহলে চলে আসছে। বছরে বার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয় ঢাকা ওয়াসায় – তার ভাগ সচিব পর্যন্ত পৌছায় – কিন্তু যেহেতু গন্যমান্য ব্যক্তি (তারমধ্যে সরকারী বেসকারী উচ্চপদে আসীন ব্যক্তি বর্গ, সাংবাদিক, কর বিভাগ, দূর্নিতীদমন বিভাগে ইত্যাদি)সহ বিরোধী নেতাদের পানি বিল নিয়ে কৌশলগত কারনে ওয়াসার কর্মচারীরা বিরক্ত করে না – তাই এই বিষয়ে তেমন কথা শুনা যায় না। সবচেয়ে বড় কথা হলো ওয়াসার দায়িত্বে আছে যিনি – উনি প্রকৃতপক্ষে একজন ঘুমন্তমন্ত্রী ( সাধারনত কোন বিষয়ে খুব দরকার না হলে কথা বলেন না) – তার অদক্ষতা অথবা অযোগ্যতায় বাংলাদেশের সাধারন মানুষের ১২ হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে একদল মানুষ বিত্তবান হচ্ছে। 

বিমানের কথা আর কি বলবো – সরকারের ভিতরে লুটেরা শ্রেনী আর সরকারদলের শ্রমিক সংগঠন মিলে এইটাকে একটা ফানেল বানিয়ে রেখেছে – হেনরী কিসিঞ্জার "বটমলেস বাসকেট" বোধ হয় বিমানে কথা বলতে গিয়ে ভুলে বাংলাদেশের নাম বলে ফেলেছিলো। সরকার এখানে বিরাট ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে – যে দেশের কোটির উপরে নাগরিক প্রবাসী – তাদের দেশে যাওয়ার জন্যে বিমানকে ব্যবহার করলেই বিমান একটা উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্টান হিসাবে বিশ্বের কাছে পরিচিত হতো। এখানে মুলত সরকার দূর্নীতিবাজদের সাথে সমঝোতা করেছে। 

তাই শুরুর দিকে বলছিলাম নীতিগত ভাবে আওয়ামীলীগ হিপোক্রেসীতে ভুগছে – ডান থেকে বাম সবার সাথে সমঝোতার নীতির সাথে দূর্নীতিবাজ এবং লুটেরাদের সাথে সমঝোতা করে একটা জটিল অবস্থা তৈরী করে ফেলেছে – এক কথায় বলা যায় আওয়ামীলিগ এখন পোলাও থেকে ভর্তা – সব জায়গায় বিরাজমান। এই কাজটা অবশ্য কার্যকরী ভাবে সুফল দিচ্ছে ক্ষমতায় টিকে থাকার বিষয়ে – কিন্তু ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্যে নীতিহীনতার ফলাফল কত ভয়াবহ হতে পারে তা অনুমান করা কঠিন।

শেষ কথাট বলি আজকের মতো। আওয়ামীগের ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে একটা বড় মাছ বড়শীতে গেঁথে ফেলার আনন্দে বাজার করতে শুরু করেছে। কিন্তু অনেক বড় শিকারীও জানে যে মাছ পানি থেকে না উঠানো পর্যন্ত তা নিজের না। কথাটা বলছি যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসংগে। এই ইস্যুতে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল হিসাবে এবং নির্বাচনী ওয়াদার কারনে মানুষ তাদের বিশ্বাস করছে। কিন্তু (আমার যেন ভুল হয়) সাম্প্রতিক কর্মকান্ডে মনে হচ্ছে আওয়ামীলীগের মাঝে এই ইস্যুতে একটা খেলার লক্ষন দেখা যাচ্ছে। এই বিষয়ে খুবই সাবধান হওয়া জরুরী। কারন এই দাবী বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের প্রানের দাবী – যদি বিএনপি (যদিও আপাতত অসম্ভব মনে হচ্ছে) এই দাবীর প্রতি সমর্থন এবং সক্রিয়ভাবে কাজ করে – তাহলে আওয়ামীলীগের কপালে হয়তো সংসদে ত্রিশ আসনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। কথাটা ভেবে দেখা উচিত – যদি জামায়াতের বিষয়ে বিএনপি বিরহকাতর হয় এবং প্রতিশোধ নিতে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে তাদের ওয়াদায়ভুক্ত করে – তবে সম্ভবত গনজাগরমঞ্চ প্রথমই বিএনপিকে স্বাগত জানাবে এবং গনেশ উল্টে যাওয়া একটা সম্ভাবনা তৈরী হবে। 

কথায় আছে রাজনীতি সবই সহি – কিন্তু ৩০ লক্ষ মানুষের জীবন আর ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম কিন্তু অমূল্য উৎসর্গ – তাকে নিয়ে রাজনীতি করে গিয়ে যেন আগুনে পাখা না পুড়ে যায় – সেই বিষয়ে আওয়ামীলীগকে সতর্ক থাকা জরুরী বটে।

(২)

গত পাঁচ বছর অবিরাম বিএনপির সমালোচনা করেছি। কারন ছিলো মুলত দুইটা – প্রথমত বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতকে আইনী, রাজনৈতিক এবং শক্তি দিয়ে সহায়তা করছিলো এবং বিএনপির ভিতরেও যুদ্ধাপরাধীর আশ্রয় আছে – এমনকি বিচারাধীন আসামীও বহাল তবিয়তে আছে। আর দ্বিতীয়ত বিএনপি তাদের শাসনামলে যে সকল ভুল এবং অন্যায় করেছিলো – তার নিয়ে সামান্য দুঃখিততো হয়নি বরঞ্চ তাদের দুর্ণীতিগ্রস্ত নেতাদের পুর্নবাসন করতে গিয়ে নিজের দলকেও দূর্বল করেছে – যা মুলত সরকারকে আরো বেপোরোয়া হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। 

আর আমাদের মতো অনেকেই যুদ্ধাপরাধী ইস্যুতে বিএনপি জামায়াতের বিরুদ্ধে সরব থাকার সুবিধাটাও পেয়েছে আওয়ামীলীগ – যা অনেকটা বাধ্য হয়েই আমাদের করতে হয়েছে – কারন বিএনপি জামায়াতকে নিয়ে রাজনৈতিক ভাবে একটা অন্ধকার কানাগলিতে ঢুকে পড়েছে। রাজনীতি জনগনের সহায়তার কথা ভুলে এরা সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছে – মাত্র তিন মাসে দেশের ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ ধ্বংস করেছে এরা আন্দোলনের নামে। বিএনপির মুল দাবী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুটিকে বারবার পিছনে ঠেলে দিয়েছে বিএনপির মিত্র জামায়াত তাদের যুদ্ধাপরাধী নেতাদের রক্ষার নামে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের আড়ালে। বিএনপির এই জামায়াত নির্ভরতাকে পুঁজি করেছে আওয়ামীলীগ। 

অন্যদিকে আবেগ সর্বস্ব মাদ্রাসার শিক্ষকদের আবগকে উসকে দিয়ে বিএনপি-জামায়াত একটা কিছু করার চেষ্টা করেছে – যা সরকারের জন্যে শাপে বর হয়েছে। সরকার মৌলবাদী জুজুর ভয় সাফল্যজনক ভাবে বিক্রি করতে পেড়েছে দেশের বাইরে এবং দেশের ভিতরে। জনসমর্থন না থাকলেও সরকারের প্রতি বহি:বিশ্বের বিশেষ করে ভারত-চীন-রাশিয়ার একছত্র সমর্থনের পিছনে হেফাযতের উত্থান এবং বিএনপির হেফাযতের প্রতি সমর্থন একটা মুল কারন। 

প্রকৃতপক্ষে যখন সরকার সকল পক্ষকে খুশী রেখে ( বিশেষ করে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, সেনাবাহিনী আর বিদেশী বিশেষ করে ভারত আর রাশিয়া) তাদের নীতি নির্ধারন করছিলো তখন বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতার যাওয়ার লক্ষ্য তাড়াহুড়া করে তাদের নীতিগত অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছিলো – যেমন ভারতের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি বলা যায় – খালেদা জিয়া গুরুত্বের সাথে ভারত সফর করে ভারতের সাথে একটা সম্পর্ক তৈরী চেষ্টার পর ভারতের প্রেসিডেন্টের প্রতি অকূঠনৈতিকসুলভ আচরন করে তা নষ্ট করেছে। তেমনি আমেরিকার সাথেও বিএনপির সম্পর্ক নেমে আসে শাহবাগের গনজাগরন এবং হেফাযতের উত্থান বিষয়ে – যেখানে আমেরিকা শাহবাগের প্রতি পূর্ন সমর্থন এবং হেফাযতের উত্থানে সতর্কভাবে দেখছিলো – বিএনপি ঠিক তার উল্টো নীতি গ্রহন করেছে। 

এইতো গেলো পুরানো কাসুন্দি। এখন কি? 

বিএনপি (জামায়াতের রহস্যজনক নিরবতার মাঝে) আন্দোলনের হুমকী দিচ্ছে। বাস্তবতা হলো – বিএনপির এই হুমকী একটা বায়বীয় হুমকী হিসাবেই দেখা ভাল। কারন হলো – বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা। বাংলাদেশে প্রতিবার যাই – দেখি সাধারন মানুষের পরিবর্তন। এখন প্রায় পুঁজিবাদী সমাজে উত্তীর্ন হয়ে গেছে বাংলাদেশ। সেখানে সবার মাঝে আছে স্বপ্ন। হতাশা নেইই বললেই চলে। তাই ৫২, ৬৭, ৬৯ অথবা ৯০ এর মতো আন্দোলনে সাধারন মানুষের আগ্রহ থাকার কথা না – কারন সময় মানেই টাকা। সময় নষ্ট করে নেতা-নেত্রী বত্তৃতা শুনা আর রাস্তা গিয়ে পুলিশের নির্যাতন সহ্য করে একটা আন্দোলন করার মতো সময় সাধারন মানুষের নেই বলেই মনে করছি। তবে ডাইহার্ট সমর্থক আর পেইড কর্মীদের কথা আলাদা। সেখানে আছে অর্থকড়ির বিষয়। খোড়া ঘোড়ায় বাজি ধরার মতো মানুষ কম – তাই প্রচুর অর্থ খরচ করে কিছু করা্র মতো সরবরাহও পাওয়া সম্ভাবনা নেই। দ্বিতীয় যে কারনে বিএনপি আন্দোলন সুবিধা করতে পারবে না তা হলো – দলের সাংগঠনিক দূর্বলতা। দীর্ঘদিন ধরে একটা মহাসচিব নিয়োগ দিকে ব্যর্থ হয়েছে বিএনপি। বয়সের ভারে নূজ্যমান দলের প্রধানের ঘাটতি পুরন করতে পারতো একজন দক্ষ মহাসচিব। কিন্তু তার পক্ষে কাজ করাও কঠিন হতো – কারন বিএনপির দ্বৈত নেতৃত্ব। একজন লন্ডন থেকে ফোনে নির্দেশ দিচ্ছে আরেকজন ঢাকায় বসে দলের কাজ করছেন গভীর রাতে – ফলে নেতাকর্মীরা প্রকৃতপক্ষে বিভ্রান্ত এবং দিশাহারা। 

মজার বিষয় হলো – আওয়ামীলীগও জানে যে বিএনপির আন্দোলনের চাবি এখন তাদের হাতে। কিন্তু আওয়ামীলীগের নেতাদের কর্মকান্ডে মনে হচ্ছে তারাই চাইছে বিএনপি আন্দোলনের নামুক – রাস্তায় বাস পুড়ুক – টিভির পর্দায় জ্বলত্ব বাসের ছবিতে ভরপুর হয়ে যাক – ফলে তাদের দূর্বলতা গুলো ঢাকা পড়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে বিএনপি নির্বাচনের আগে আওয়ামীলীগের ফাঁদে পা দিয়েছিলো – খেলেছে আওয়ামীলীগ আর বিএনপি দৃশ্যমান ভুমিকায় ভিলেন হয়ে গেছে। এবারও তাই হবে। 

এখান একটা কথা না বললেই নয় – তা হলো বিএনপি বায়বীয় কিছু ইস্যুতে আন্দোলন করার চেস্টা করছে যার প্রকৃত কোন মূল্য নেই বাস্তবে। জনগনের ভোটের অধিকার মানেই কি একদল ক্ষমতায় পাঠানো বা সরানো? ধরা যাক – বিএনপি গত নির্বাচনে ১৪৯ সিট পেলো – কিন্তু তারা কি সে্ ইনির্বাচন মেনে নিতো – আমরা আগেও দেখেছি – বিরোধীদল কোন ভাবেই সংসদীয় প্রক্রিয়াকে সহায়তা করে না। বিএনপি গত পাঁচ বছরে বিরোধীদল হিসাবে ইতিহাসের সবচেয়ে নির্লজ্জ ভূমিকায় ছিলো। তাই মানুষের কাছে সংসদের বিরোধী থাকা না থাকার বিষয়টা সমান। তাইলে মানুষে চায় কি? মৌলিক চাহিদাগুলোর বিষয়ে নিশ্চয়তা, অর্থনীতিতে অগ্রগতি, বিদ্যুৎ আর জ্বালানির নিশ্চয়তা তথা দেশের উন্নতি। তা তো হচ্ছে – তাইলে মানুষের কাছে ভোটের অধিকারের বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ন হবে?

প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের যে ইস্যুতে বিরোধীদল সবচেয়ে সরব হতে পারতো তা হলো দূর্নীতি এবং সুশাসন। বিশেষ করে দূর্নীতি ইস্যুতে বিরোধীদল সবচেয়ে সুবিধা করতে পারতো। গত ছয় বছরে কি বিপুল পরিমান সম্পদ দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে তার কিছু ধারনা পাওয়া যাবে যদি কেউ টরন্টোর বাইরে রিচমন্ডহিল শহরে বাংলাদেশীদের মিলিয়ন ডলারের বাড়ি কেনার হিড়িক দেখে্ই অনুমান করা যায় – যাদের মধ্যে সরকারী দলের অনেকেই আছেন। 

দুঃখজনক হলেও সত্য – এই ইস্যুতে বিএনপি দূর্বল। কারন তাদের নিজেদের ঘরেই দূর্নীতির আখড়া। কানাডায় বাড়ি কেনায় যেভাবে আওয়ামীলীগের নেতার আছেন – তেমনি আছেন বিএনপির নেতারাও। বিএনপির ঢাকা মহানগরের নতুন কমিটির নেতাদের অনেকেরই পরিবারের অর্ধকে টরন্টোতে বাস করেন – সচিব এবং আহ্বায়কের পরিবার থাকে টরন্টোয় – দেশ থেকে ডলার আসে – কিভাবে আসে তা না হয নাই বললাম। মুল কথা হলো – এদের পক্ষে সরকারের বিরুদ্ধে জেহাদ করা সম্ভব নয়। কারন এরা ক্ষমতায় থেকে যে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছিলো তা রক্ষা করাই এদের প্রধান কাজ হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো – লন্ডনে বসে ফিনফিনে শার্ট পড়ে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত হল ঘরে সরকার বিরোধী জ্বালাময়ী বত্তৃতা দেওয়া আর পল্টনের উত্তপ্ত পীচের রাস্তায় নেমে জনগনকে আন্দোলনের ডাকা কখনই সমান না – মানুষও এইটা বুঝে। 

তাই পরামর্শ দিচ্ছি বিএনপির উচিত নয় আওয়ামীলীগের ফাঁদে পা না দিয়ে প্রথমত নিজেদের ঘর গুছানো। সেই কাজে প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে তারেক রহমানকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া, খালেদা জিয়াকে উপদেষ্টা করে একটা কার্যকরী সভাপতিমন্ডলী তৈরী করে প্রতিটি জেলা/থানায় সন্মেলন করে দলের কাঠামো নির্মান করা এবং মেধাবী এবং দক্ষদের নেতৃত্বে আনা। তার সাথে সাথে ধান্ধাবাজ টকশো জীবিদের পরামর্শ গ্রহন থেকে বিরত থাকা (বিশেষ করে মান্না, মুজাহিদুল ইসলাম, আসিফ নজরুল, পিয়াস করিম,ইত্যাদি, কারন গত পাঁচ বছর ওদের পরামর্শ শুনেই বিএনপি ভীষন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে)। দ্বিতীয়ত রাজনীতির বিষয়ে বায়বীয় ইস্যুকে (বিসমিল্লাহ শেষ হবে, ভারত দেশ নিয়ে যাবে, ভোটের অধিকার ইত্যাদি) বাদ দিয়ে অর্থনীতিকে প্রাধান্য দিয়ে দূর্নীতিকে কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা। 

এই জন্যে দরকার ধৈর্য্য। ৫ই জানুয়ারী নির্বাচনের পর সরকারকে পরোক্ষভাবে মেনে নিয়েছে বিএনপি-জামায়াত জোট – তাই হয়তো তারা আন্দোলন বন্ধ করে রেখেছে – অথবা বলা যায় তারা আন্দোলনে পরাজিত হয়েছে। সেখান থেকে আবার একটা আন্দোলনে যাওয়ার জন্যে যথেষ্ঠ সময় আর প্রচেষ্টা দরকার। তার আগে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটা মিমাংসা করে নিজেদের অবস্থান সুস্পষ্ট করা জরুরী বটে। যুদ্ধাপরাধের বিচার, জামায়াতের সাথে সম্পর্ক, খালেদা জিয়া জন্মদিন, স্বাধীনতার ঘোষক ইত্যাদি ইস্যতে সত্যকে মেনে নেওয়ার মাধ্যমে উদারতার পরিচয় দেওয়া। সবচেয়ে বড় কথা হলো – আগামী দশ বছর পর বাংলাদেশকে কেমন দেখতে চায় বিএনপি তার একটা রূপরেখা তৈরী করে জনগনের কাছে সুষ্পষ্ট ভাবে পৌছানো – যাতে সেই স্বপ্নটা সাধারনের স্বপ্নের সাথে মিশে যায় – তা হলে আর বিদেশী শক্তি আর দেশীয় কুচক্রিদের উপর নির্ভর করতে হবে না – সাধারনের সমর্থনেই বিএনপি ক্ষমতায় যেতে পারবে।

 

(৩)

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু বায়বীয় ইস্যু আছে যা দুই দলই ব্যবহার করে ভোটের জন্যে জনগনের মাঝে বিভাজন তৈরী করতে। যেমন মুক্তিযুদ্ধে ইতিহাস, যুদ্ধাপরাধের বিচার, ৭৫ এর হত্যাকান্ডের বিচার, জিয়া, মঞ্জুর, খালেদ মোশাররফ হত্যার বিচার, বাংলাদেশী/বাঙ্গালী পরিচয় ইত্যাদি। এই বিষয়ে দুইটা গোষ্ঠীকে একটা পরিষ্কার মিমাংসায় আসতে হবে। শুরু হতে পারে ১৫ আগস্টের খালেদা জিয়া জন্মদিন পালন বাদ দিয়ে – এইটুকু উদারতা দেখানো কি একটা বড় দলের জন্যে অসম্ভব! বাংলাদেশের জন্মের নেতৃত্বদানকারী একজন প্রেসিডেন্টের হত্যার বিষয়টিকে উদারতার সাথে বিবেচনা করে খালেদা জিয়া জন্মদিন না পালনের ঘোষনা দেওয়া কি খুবই কঠিন! এতে সাধারন মানুষের বিএনপির প্রতি শ্রদ্ধা বাড়বে বই কমে না। এরপর বল চলে যাবে শেখ হাসিনার কোর্টে – তাকেও তখন জিয়াউর রহমান সম্পর্কে কটুক্তির বিষয়ে কিছুটা ছাড় অবশ্যই দিতে হবে। আর যদি এইটুকু উদারতা দেখাতে ব্যর্থ হয় – তবে একটা দলকে পরাজিত হতে হবে পুরোপুরি। অপেক্ষা থাকলাম ইতিহাসের নুতন অধ্যায় দেখার জন্যে। 

 

 

১ comment

  1. 1
    মুনিম সিদ্দিকী

    দুঃখজনক হলেও সত্য – এই ইস্যুতে বিএনপি দূর্বল। কারন তাদের নিজেদের ঘরেই দূর্নীতির আখড়া। কানাডায় বাড়ি কেনায় যেভাবে আওয়ামীলীগের নেতার আছেন – তেমনি আছেন বিএনপির নেতারাও। বিএনপির ঢাকা মহানগরের নতুন কমিটির নেতাদের অনেকেরই পরিবারের অর্ধকে টরন্টোতে বাস করেন – সচিব এবং আহ্বায়কের পরিবার থাকে টরন্টোয় – দেশ থেকে ডলার আসে – কিভাবে আসে তা না হয নাই বললাম। মুল কথা হলো – এদের পক্ষে সরকারের বিরুদ্ধে জেহাদ করা সম্ভব নয়। কারন এরা ক্ষমতায় থেকে যে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছিলো তা রক্ষা করাই এদের প্রধান কাজ হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো – লন্ডনে বসে ফিনফিনে শার্ট পড়ে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত হল ঘরে সরকার বিরোধী জ্বালাময়ী বত্তৃতা দেওয়া আর পল্টনের উত্তপ্ত পীচের রাস্তায় নেমে জনগনকে আন্দোলনের ডাকা কখনই সমান না – মানুষও এইটা বুঝে। 

     

    ঠিক বলেছেন।  দুর্নীতে নিমজ্জিত নেতাকর্মী দিয়ে দুর্নীতির ইস্যুতে আন্দোলন করা সম্ভব হবেন। তা ছাড়া সরকার পক্ষ "তুমিও খাও আমিও খাই" আর তাতে না হলে "জেল আর মামলা" ফর্মুলা চালু রাখলে কোন ফর্মুলা কাজে আসবেনা।

    আর বিদেশী সাহায্য বিএনপি পাবেনা কারণ আমাদের গ্রামে গঞ্জে যেমন মিয়াবাড়ির লোকজন মুসলিমলীগ করে তাই চৌধুরীবাড়ির লোকজন আওয়ামীলীগ করতে হবে। এই কালচারে বিএনপি যে ঘরানার ভোটের জোরে রাজনীতি করে, সে ঘরানার এখন ভিনদেশী রাজনৈতিক স্বার্থে প্রতিকূলে। তাছাড়া বিএনপি পারবে না দেশে কৃত্রিম খাদ্য সংকট শুরু করতে। কারণ এইটি করতে হলে প্রতিবেশী দেশের হস্তক্ষেপ দরকার। কাজেই এই দেশে কোন আন্দোলন করে বড় ধরণের পরিবর্তনের আশা নেই।  তাই আমি সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেছি- যাকে দিয়ে দেশ আর জনগণের কাজ হবে তাকে সমর্থন দিয়ে যাওয়া। ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.