«

»

Dec ১০

ট্রাম্পের জেরুজালেম বিষয়ক খেলা আর আমাদের অবস্থা

ট্রাম্প ঘোষনা দিয়েছে – আমেরিকা জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। বিষয়টা রাজনৈতিক ভাবে যতটা গুরুত্ব রাখে – তার চেয়ে ধর্মীয় গুরুত্ব অনেক বেশী। এই ঘোষনায় প্রকৃত অবস্থার তেমন ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না – কারন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো অবস্থা আর কারো নেই। এমন কি আমেরিকা প্রকৃত অর্থে ইসরায়েরের পাপেট রাষ্ট্র হয়ে গেছে। সবচেয়ে লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো আমেরিকার ক্ষয়িস্খু অবস্থা ষ্পষ্ট হয়ে গেছে বেশ কিছু দিন ধরেই। যেমন ধরা যাক বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি আর অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের কথা – সেখানে আমেরিকা প্রকাশ্যে এবং আড়ালে প্রভাব বিস্তার করেছিলো ৭৫ সালের পর থেকেই। সরকারী কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি বা কোন প্রকল্পে কনসালটেন্ট কে হবে তা বিশ্বব্যাংক তথা আমেরিকা নির্ধারন করে দিতো। স্যুট টাই পড়া অর্থমন্ত্রীগন আমেরিকার মাউথপিস হিসাবে কাজ করতো। পদ্মা সেতু আর রূপপুরে পরামানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আমেরিকার উপনিবেশিক অবস্থা থেকে মুক্তির মাইলষ্টোন বটে। আমেরিকা পোষাক আমদানীর উপর বিশেষ সুবিধা বাতিলসহ নানান বিষয়ে চাপ সৃষ্টি করেও বাংলাদেশকে বাগে আনতে পারেনি। আগেকার অবস্থা হলো হয়তো একট সামরিক অভূর্থ্যান হতো – কিন্তু আমেরিকার সেই ক্ষমতা নেই। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে আমেরিকান প্রভাবকে রাশিয়া লাগাম লাগিয়ে দিয়েছে – সিরিয়ায় মাসল দেখিয়ে আমেরিকার সামরিক শক্তির সামর্থ্যকে সুষ্পষ্ট করেছে তারা। আর চীনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থায় আমেরিকার প্রকৃতপক্ষে অসহায়। সেই অবস্থায় আমেরিকার কোন পররাষ্ট্র নীতির কোন প্রভাব এখন বিশ্বকে প্রভাবিত করে না। জেরুজালেমের ঘটনাও তাই – প্রকৃতপক্ষে আমেরিকার ঘোষনায় জেরুজালেম রাজধানী হবে শুধুমাত্র কাগুজে সিদ্ধান্ত – বাস্তবতা হবে ভিন্ন।

(২)

মুসলিম বিশ্বে আবেগের একটা ধাক্কা লেগেছে বটে। প্রতিদিন টুইটারের ট্রাস্পের উস্কানীমুলক সমালোচনায় অভ্যস্থ হয়ে উঠছে মুসলমানরা – সেখানে এই ঘোষনা তার মাত্রা একটু বেড়েছে – কিন্তু বাস্তবে এর প্রতিক্রিয়া খুব একটা হবে বলে মনে হচ্ছে না। কারন ট্রাম্পের এই বালসুলভ আচরনকে খোদ আমেরিকারাই খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু যদিও বাস্তবতা এর তেমন প্রভাব নেই – কিন্তু ধর্মীয় এবং ঐতিহাসিক ভাবে এই ঘোষনার একটা ব্যপক প্রভাব রয়েছে। জেরুজালেম আক্ষরিক অর্থেই মুসলমানদের হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এমন ধারনা পোষন করা অবাস্তব নয়। এক সময় জেরুজালেম থেকে মুসলিম সম্প্রদায়কে তাড়িয়ে দেওয়া হবে। এইটা একটা বড় পরিকল্পনার অংশ। খৃষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা অংশ আছে যারা বিশ্বাস করে জেরুজালেম পুরোপুরি ইহুদীদের অবস্থান না হলে সেখানে জিসাস ক্রাইস্ট আসবেন না। সেই অনুসারে এরা ইসরায়েল নামক ইহুদী রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে – তারা প্রকৃতঅর্থেই অর্থ এবং ক্ষমতায় এগিয়ে আছে – তাদের মতাদর্শ জায়ানিজম হিসাবে পরিচিত। লক্ষ্যনীয় ইহুদীদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ জায়ানিজমের বিশ্বাস করে না। এরা ইসরায়েলের নাগরিকত্ব নেয় না। এই খৃষ্টান-জায়ানিষ্টদের চক্রের কাজ হলো ইসরায়েলের রাজধানী হিসাবে জেরুজালেমের ঘোষনা।

(৩)

লক্ষ্যনীয় যে বিশ্বের ক্ষমতার খেলোয়ারা একটা জায়গায় একমত – তা হলো মুসলিম নিপীড়ন – চীনের উইগুর মুসলিমরা সবচেয়ে নিরীহ সম্প্রদায় হিসাবে পরিচিত – তাদের নিগ্রহ করতেও চীন বাদ রাখছে না – রাশিয়ে আফগানকে ধ্বংশ করেছে – তার তাদের চেচেন মুসলিমদের উপর নির্যাতন থেকে রাশিয়ায় আইএস দমনের নামে নির্বিচারে মুসলিম সম্প্রদায়কে ধ্বংস করা তো আমাদের কাছে সুষ্পষ্ট। তালেবান ধ্বংসের নামে ইউরোপের প্রায় সবাই হাত লাগিয়েছে মুসলিম নিপীড়নে – এমন কি শান্তিপ্রিয় দেশ কানাডাও আফগানিস্তান আর লিবিয়াতে নির্বিচার বোমা নিক্ষেপ করে তাদের মুসলিম হত্যার শেয়ার নিয়েছে। আর আমেরিকার ইরাক, আফগানিস্থানের ঘটনাতো সাম্প্রতিক স্মৃতি বটে। এমন কি আঞ্চলিক শক্তি ভারতের কাশ্মিরের নির্যাতন আর চীনের পোষা রাষ্ট্র বার্মার রোহিংগাদের জাতিগত ভাবে নিশ্চিহ্ন করার যে প্রক্রিয়া তা বিশ্ব সমাজের সামান্যই মাথা ব্যাথা সৃষ্ট করেছে মাত্র।
এই যে সারা বিশ্বের আনাচে কানাচে মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন অনাচার আর ধ্বংস চলছে – তার কারন কি?

(৪)

একজন মুসলমান মাত্রই জানেন – আল্লাহই সকল ক্ষমতার মালিক। আল্লাহ মানুষের উপর নানান ধরনের বিপর্যয় পাঠান – যা হয় তাদের জন্যে শাস্তি অথবা তাদের জন্যে পরীক্ষা। মুসলমানদের জন্যে তাদের মুল জ্ঞানের পুস্তক আল কোরানে সুষ্পষ্ট ভাবে এই বিষয়গুলো বর্ননা করা হয়েছে। আমাদের সকলের সেই বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত থাকার কথা। জেরুজালেম রাজধানী হিসাবে আমেরিকার স্বীকৃতিতে যেমন আমরা ব্যথিত হবো – প্রতিবাদ করবো – সাথে সাথে আমাদের কাছে আমানত আল কোরান আর রসুল (সঃ) এর দিকনির্দেশনা থেকে এর কারন অনুসন্ধান করবো। সেই অনুসারে আমাদের পথের দিশা সংস্কার করবো। আমাদের দিকনির্দেশনার জন্যে মহান আল্লাহর নির্দেশিত পথই একমাত্র পথ। তাই দিনে কমপক্ষে ১৭ বার আমরা আনুষ্টানিক ভাবে শপথ নিচ্ছি – “আমরা একমাত্র তোমরাই আনুগত্য করি – একমাত্র তোমারই সাহায্য চাই।”।

শুক্রবারে জুমার পর রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করে যদি মনে করি এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে – সেইটা যে ভুল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বরঞ্চ যেমন আমরা নিশ্চিত করি আল্লাহর প্রতিটি নির্দেশ এবং নিষেধ মান্য করতে পারি। এমন একটা অবস্থা সৃষ্টি করতে পারি যেমন মুসলিম দেশের মসজিদের জুতা একজনে পায়ে লেগে সরে গেলে তা যথাস্থানে রেখে দিয়ে ক্ষমা চাইতে পারি – মসজিদগুলোতে জুতা রাখার জন্যে সেজদাহ জায়গাগুলোকে নোংরা না করতে হয় – এইটা হলো একটা প্রতীকি বিষয়। প্রতিটি মসলিম যখন তাদের সালাতগুলো হেফাযত করবে – আমানত সংরক্ষনের বিষয়ে মনোযোগী হবে – মিথ্যা থেকে দুরে থাকবে – সকলকাজে আল্লাহ এবং রসুলের নির্দেশনাকে প্রধান্য দেবে – যথন হয়তো আমরা দেখবো – আল্লাহ আমাদের উপর থেকে এই আযাব অথবা ফেতনা দুরীভত করবেন। সকল মানব জাতির উপর সন্মান দিয়ে যে সম্প্রদায় সৃষ্টি হয়েছে – যাদের বিশ্বের সকল সৃষ্টির জন্যে রহমত মুহাম্মদ (সঃ) এর অনুসারী হিসাবে সন্মানিত করা হয়েছে – তারা কেন আজ বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত এবং উপেক্ষার পাত্র হয়েছে – এই প্রশ্নের উত্তরের জন্যে আলেম সমাজের বেশী মনোযোগী হওয়ার চাইতে প্রচলিত এবং সাম্প্রতিক উস্কানীর ফাঁদে পা দিয়ে শুধুমাত্র তারা মুসলিম সমাজের দুর্ভোগকে আরা বাড়াচ্ছেন – কারন সাধারন মানুষ তাদের অনুসরন করে অথবা করতে অভ্যস্থ করা হয়েছে। নিজেদের কাজের সৃষ্ট দুর্ভোগের জন্যে অন্যকে দোষারোপ করা – তাদের ষড়যন্ত্র নিয়ে গবেষনা করে তার ফলাফল নিয়ে বিতর্ক করা – বরঞ্চ আমাদের ইমানের দূর্বলতারই প্রকাশ। কারন আল্লাহ সবচেয়ে বড় পরিকল্পনাকারী – আল্লাহ মোকাবেলায় কারো পরিকল্পনাই কাজে আসে না। আমরা এতে নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি আমরা আল্লাহর রহমত থেকে সরে গেছি। আল্লাহর নির্দেশিত পথ থেকে সরে গিয়ে শুধুমাত্র বিভ্রান্তদের মতো ছোটাছুটি করছি আর পরষ্পরকে দোষারোপ করছি।

আল্লাহ আমাদের জ্ঞানের মাঝে বৃদ্ধি করুন এবং সকল ফেতনা আর আযাব থেকে মুক্তি দিন।

২ comments

  1. 2
    চমকপ্রদ

    জেরুজালেম আক্ষরিক অর্থেই মুসলমানদের হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে।

    তার মানে এখনো যাচ্ছে! মানে হাতছাড়া হবার বাকি আছে?

    তবে লেখাটি সামগ্রিকভাবে মূল্যবান ও উপদেশব্যঞ্জক। বাস্তবতাকে তুলে ধরা হয়েছে সুন্দরভাবে।

  2. 1
    সবাক নির্বাক

    আমেরিকার ব্যর্থতার মিছিল শুধুই দীর্ঘ হচ্ছে!

    ১। তেল আভিভে দূতাবাস রেখে অ্যামেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে ব্যর্থ হয়েছে৷
    ২। আমেরিকা তুর্কিতে ক্যূ করতে চেয়ে ব্যর্থ হয়ে কন্সটেন্টিনপোলে তার প্রভাব রাশিয়ার কাছে হারিয়েছে। 
    ৩। আমেরিকা ইরাকে সাধারণ গেরিলা মিলিট্যান্টদের কাছে পরাজিত হয়ে সৈন্য সরিয়েছে। 
    ৪। আমেরিকা তার তথাকথিত আরব মিত্র (সৌদি, দুবাই, কাতার সহ) সিরিয়ায় রাশিয়ার কাছে পরাজিত হয়েছে। 
    ৫। আম্রিকা কোরীয় উপদ্বীপে নাজুক অবস্থায় আছে। 
    ৬। আম্রিকা ভারতীয় উপমাহাদেশের প্রভাব ভারতের কাছে হারিয়েছে। 
    ৭। আমেরিকা একদিকে বৈশ্বিক ব্যবসায়িক আধিপত্য চায়নার কাছে হয়ারিয়েছে। অন্যদিকে অবিরত পেট্রো কারেন্সি ছাপিয়ে এর প্রতিবর্তী অর্থনৈতিক ক্রিয়ায় নিজের অভ্যন্তরীণ সম্পদেই চায়নার স্টেইককে পর্বতসম করেছে। 
    ৮। আমেরিকা জলবায়ু দায়বদ্ধতা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে মানবের বাসযোগ্য ধরণীর প্রতি কমিট্মেন্ট রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। 
    ৯। আমেরিকা যুগে যুগে পৃথিবীর দেশে দেশে দুর্নিতিবাজ শাসক নিযুক্ত করে, লুটপাটকে উৎসাহিত করে, নির্বাচনের নামে প্রহসন করে সর্বপরি নিজ দেশেই স্বচ্ছ নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়ে একজন মদ-জুয়া-প্রস্টিটিউট ব্যবসার দালালের কাছে নিজের ঐতিয্যবাহী ও গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্সিয়াল স্বত্বা হারিয়েছে। 
    ১০। আমেরিকা বিশ্বের দেশে দেশে কুটনৈতিক ব্যবসায়ীক ও সামরিক দুর্বিত্তপনার দলিল গোপনীয় করে রাখতে সর্বস্ব চেষ্টা করেও ব্যক্তি জুলিয়ান আসাঞ্জ এর কাছে পরাজিত হয়েছে।

    দশ দিগন্তে আমেরিকার পরাজয় সর্বত্রই, 
    আমেরিকা ও তার গোপন ও প্রকাশ্য মিত্রদের পরজয় অবশ্যম্ভাবী!

    আজকের আমেরিকা দেশে দেশে জঙ্গি তৈরি করে, 
    সামরিক ভয় দেখিয়ে দুর্বল ও দুর্নীতিবাজ সরকার গুলো থেকে ফান্ড নিয়ে, নিজের তৈরি অস্র বিক্রি করে দেশে দেশে যুদ্ধ বাঁধিয়ে পৃথিবীতে সর্বময় অস্থিরতা তৈরি করেছে।

    একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল, কর্মসংস্থান্মূখী ও ধরণীর প্রতি দায়িত্বশীল দেশের অবস্থান থেকে আমেরিকার পতন হয়েছে। ফলে তার বিশ্ব নেতা থাকার কোনই লেজেটিমেসি রইলো না।

    আমেরিকার নৈতিক পরাজয় হয়ে গেছে। ব্যবসায়িক পতন আসন্ন যা তার সামরিক পরাজয়কেও চূড়ান্ত মুহূর্তের জন্য অপেক্ষামান করে রাখবে! আগামীর দিনের আমেরিকা চেহারায় হবে ক্লান্ত শ্রান্ত ও ভ্রান্ত!

    বিশ্ব নতুন নেতৃত্বের জন্য কায়মনবাক্যে দিন গুণবে, যে নেত্রিত্ব মানবের একমাত্র বাসযোগ্য ধরণীর জনপদ ও জনপথ গুলোতে শান্তি আনবে, পৃথিবীকে জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি থেকে রক্ষায় উদ্যোগী হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.