«

»

Dec ২৭

দূর্নীতি – সমস্যা আসলে কোথায়?

বাংলাদেশের মন্ত্রী – সাবেক বাম আধুনা আওয়ামীলীগার – জনাব নুরুল ইসলাম নাহিদের দূর্নীতি করো রয়ে সয়ে মন্তব্যে দেশে ঝড় উঠেছে। আমার বিশ্বাস কিছু মানুষ হতাশ হয়েছেন এই ভেবে মন্ত্রীও অসহায় – অনেকটা সেই অসহায় বাবার মতো কথা শুনে – যিনি ধর্ষকদের অনুরোধ করছিলেন – “বাবারা, আমার মেয়েটা ছোট তোমরা একজন একজন করে এসো, মরে যাবে।” আজ মনে হচ্ছে পুরো দেশ দূর্নীতির ধর্ষনের শিকার – অসহায় মন্ত্রী কিছুটা স্বস্তি চাচ্ছেন। আসলে কি তাই – শুধু কি উনারা অসহায়? নাকি কি ব্যর্থ?

বস্তুত নুরুল ইসলাম নাহিদ একজন ক্লিন ইমেজের লোক – অন্তত মিডিয়াতে তাই দেখি। দীর্ঘ আট বছর মন্ত্রী পদে আকড়ে রেখেছে – কিন্তু উনি কি আসলে দূর্নীতির বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করেছেন? কোন কার্যকরী পরিকল্পনার মাধ্যমে দূর্নীতিকে নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করেছেন? মনে হয় না। অন্তত আমরা জানি না।

বাংলাদেশের অনেক মানুষ এমন আচরন করছেন যেন উনারা জানেন না যে বাংলাদেশের শিক্ষা বিভাগ দূর্নীতির একটা আবাস। সেখানে শিক্ষক থেকে শুরু করে কর্মকর্তা সবাই ব্যপক ভাবে দূর্নীতিতে নিমজ্জিত। এমন কি মাদ্রাসা শিক্ষাও এর বাইরে না। তাহলে কি দূর্নীতি মানুষের গা সহা হয়ে যায়নি?

(২)

দূর্নীতি একটা রোগ – এইটা শুরু হয় এপোলজ্যিক্যাল এথিক দিয়ে – সংসার চলে না ভাই – কি করবো। অথবা এই দেশের কে না দূর্নীতি করে – আমি কেন করবো না। অথবা দেখি পুরো সমাজই দূর্নীতিকে সন্মানিত এবং পুরষ্কৃত করছে। মেয়ে বিয়ে দেওয়ার সময় একজন প্রকৌশলী ছেলেকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া মানেই দূর্নীতিকে সন্মানিত করা। আর মসজিদ-মাদ্রাসার চেয়ারম্যান বানানোর সময় পাড়ার সবচেেয়ে দূর্নীতিগ্রস্ত অবসরপ্রাপ্ত একজন সরকারী কর্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ঙে মুলত দূর্নীতিকে সমাজের সর্বোচ্চ সন্মানিত স্থানে পৌছুতে সবাই মিলে কাজ করছেন। এই রোগ ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে সমাজ এবং রাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়েছে – প্রকৃতপক্ষে এইটা একটা ক্যান্সারে রূপ নিয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন হলো – এইটা কি নিরাময় অযোগ্য পর্যায়ে পৌছেছে?

(৩)

একটা ছোট্ট উদাহরন দিলে বুঝা যাবে – দূর্নীতি নিরাময় যোগ্য একটা রোগ – শুধু প্রয়োজন সদিচ্ছা। মনে হয় না বর্তমান সরকার দূর্নীতি বিরোধী কোন কঠিন অবস্থান নিতে আগ্রহী – কারন সরকাররে রাজনৈতিক অংশ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলোতে দূর্নীতি ব্যাপক ভাবে চর্চা – এমন কি ছাত্রসংগঠনগুলোও এখন লোভনীয় পদ-পদবী বিক্রিবাট্টা হয় – যাতে দূর্নীতির মাধ্যমে দ্রুত বিত্তশালী হওয়া যায়। যাই হোক – উদাহরনটা দেই তাহলে। ৯০ দশক পর্যন্ত দূর্নীতিতে কুখ্যাত ছিলো টিএন্ডটি – একটা লাইনম্যান তার টানার জন্যে ১০,০০০ টাকা নিতো (বর্তমানের ১ লক্ষ টাকার সমতুল্য) – কিন্তু বেসরকারী টেলিযোগাযোগের কারনে সেই সংস্থা এখন নিরব – ভাল মানুষের কাজের জায়গা। কিন্তু এই অবস্থা ততক্ষন তৈরী হয়নি যতক্ষন পর্যন্ত সরকারের সদিচ্ছা হয়েছে বেসরকারী খাতে টেলিফোন উন্মুক্ত করা। শুধুমাত্র সেলফোন টেকনোলজি যথেষ্ট ছিলো না – দেখেছি দীর্ঘ পাঁচবছর একজন মন্ত্রী কাম ব্যাবসায়ীর কোম্পানী সিটিসেল একচেটিয়া ব্যবসা করেছে সেলফোনের – যা ছিলো উচ্চপর্যায়ে দূর্নীতি।

তাই সরকারী সংস্থাগুলোকে ছোট করে আনা একট দরকারি কাজ। দেখলাম বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সেবা থেকে তৃতীয় এবয চতুর্থ শ্রেনী পদ বিলুপ্ত করা হবে – এই পদক্ষেপ স্বাস্থ্য খাতে দূর্নীতি কমাবে এবং সেবার মান বাড়াবে। বস্তুত সকল সরকারী দফতর থেকে চতুর্থ -তৃতীয় শ্রেনীর পদ বিলুপ্ত করা গেলে ইউনিয়নের মাধ্যমে দূর্নীতির কাছে সংস্থাকে জিম্মি করার পথ বন্ধ হবে। সেইটা একটা বিশাল পদক্ষেপ হবে।

(৪)

সমস্যা হলো রাজনীতির ক্ষেত্রে নীতি হীনতা দূর্নীতিগ্রস্থদের জন্যে আশির্বাদ। যেমন ঢাকার সকল বড় অফিসগুলোর কর্মচারীরা এখন মুজিব-কোট পড়ে – এরা আওয়ামীলীগের চেয়েও বড় আওয়ামীলীগ – ১৬ই ডিসেম্বরে ধানমন্ডিতে গিয়ে নেতা ছবিতে ফুল দেয় – এরাই বিএনপির সময় বিএনপির সমর্থনের চন্দ্রিমা উদ্যানে গিয়ে ধাক্কাধাক্কি করেছে কে আগে টিভিতে মুখ দেখাবে। বস্তুত রাজনৈতিক দলগুলো নীতিহীনতা আর অনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের জন্যে এরা লাঠিয়াল হিসাবে মূল্যায়িত হয় – তাই এদের কদর কখনই কমে না। এই চক্র থেকে বের হতে হলে সরকারী দফতরগুলোতে উপনিবেশিক ব্যবস্থাপনা বাতিল করে আধুনিক ব্যবস্থাপনা আনতে হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারী বিষয়গুলো উপনিবেশিক ব্যবস্থা – সেখানে শুধুমাত্র একটা শ্রেনীই থাকবে – তা হলো ওয়ার্কার বা কর্মী। সচিবালয়ের লালফিতার কারন হলো এই উপনিবেশিক চিন্তা – সেখানে ক্যাডার পদ্ধতি বাতিল করে সোজা দক্ষতার ভিত্তিতে কর্মী নিয়োগ দেওয়ার পদ্ধতি চালু করা জরুরী। শুধুমাত্র কিছু প্রশ্ন মুখস্ত করে বিসিএস দিয়ে রাষ্ট্রের হর্তাকর্তা বনে যাওয়ার পদ্ধতির কারনে একটা দূর্নীতি করেও ধরা ছোয়ার বাইরে থাকে।

(৫)
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন হলো – নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা। মানুষ কখনই মানুষের তৈরী আইনের প্রতি ভীত হবে না – চতুর হবে – আইন অমান্য করার পথ আবিষ্কার করবে – যতক্ষন না তাদের আইন মানার মতো নৈতিক ভিত্তির উপর রাখা হবে। বাংলাদেশের মানুষের মাঝে প্রচলিত আছে যে – পশ্চিমা দেশগুলোর নৈতিকতা নাই – শুধুমাত্র আইনের ভিত্তিতে ওরা সভ্য। কথাটা ভুল – জুডিয়-ক্রীসচিয়ানিটি (ইহুদী খৃষ্টানদের ওল্ড এবং নিউ টেস্টামেন্টের) উপর ভিত্তি করে পশ্চিমা সমাজ সৃষ্টি হয়েছে – যেমনটা ছিলো মুসলিম শাসনামল। ইংরেজ উপনিবেশিকতা তাদের শাসনকে পাকাপোক্ত করার নিমিত্তে প্রথমই ভারতবর্ষ থেকে ইসলামী মূল্যবোধ এবং নৈতিকতাকে অপসারন করে – যার ফলে বাংলাদেশের সমাজ মুলত জুডিও-খৃষ্টশ্চিয়ানিটির প্রভাব আছে – কিন্তু তাকে শাসনের জন্যে কাটছাট করা হয়েছে। পরবর্তীতে সকল আইনই সেই উপনিবেশিকতার উপর প্রলেপ তৈরী হয়েছে। এখানে পুরোপুরি ইসলামী নৈতিকতা এবং মূল্যবোধকে প্রধান্য দিতে হবে। একজন আল্লাহভীরু মানুষ কখনই অনৈতিক কাজ করবে না – তার জন্যে সর্বনিম্ন আইন দরকার – আর যদি সমাজে আল্লাহভীরু মানুষের সংখ্যা নগন্য হয় – তবে তাদের জন্যে প্রচুর আইন দরকার – বিস্তারিত আইন আর সেই আইন প্রয়োগের জন্যে রাষ্ট্রকে প্রচুর সম্পদ বিনিয়োগ করতে হয়। তাই শিক্ষার মুল ভিত্তি হওয়া উচিত একেশ্বরবাদ এবং তাকওয়া – যা শুনতে হয়তো অসম্ভব মনে হবে – কিন্তু বাংলাদেশকে রক্ষার জন্যে এর বিকল্প নেই।

(৬)

শেষ কথা হলো – যেহেতু শিক্ষমন্ত্রী সবেক বাম – তাই প্রচলিত ধারনায় উনি উন্নত নৈতিক চরিত্রের মানুষ এবং সৎ। এই ধারনা যে ভুল – তা সমাজের বামদের প্রতি তাকালেই দেখা যাবে – যারা প্রকৃতপক্ষে যা বলে তা বিশ্বাস করে না এবং এরা ক্ষেত্রবিশেষ সবচেয়ে বড় দূর্নীতিবাজ হয়ে থাকে। যেহেতু মন্ত্রী নিজেই নিজেকে দূর্নীতিবাজ হিসাবে স্বীকার করেছেন – তাই মোরালিটির সর্বোচ্চ মান ধরে রাখার জন্যে উনার আর সরকারে থাকার নৈতিক ভিত্তি নেই – উনাকে পদত্যাগ বা বরখাস্তের মুখে পড়া উচিত। কিন্তু আমার ধারনা দূর্নীতিগ্রস্ত জনগোষ্টীর নেতা হিসাবে উনার ইমেজ রক্ষায় একদল এগিয়ে আসবে এবং মিডিয়াগুলো – যারা বিশেষ করে বামপন্থী ধারাকে ধারন করে তারা তার রক্ষকের ভূমিকায় নামবে। তবে দেশের ভবিষ্যতে কথা বিবেচনায় উনার পদ থেকে সরে যাওয়ার বিকল্প নেই।

৩ comments

  1. 2
  2. 1
    সানজিদ সরকার

    লেখটা দেখে প্রথমে ভেবেছিলাম শিক্ষামন্ত্রীর পক্ষে যাবে। কিন্তু আপনার দূরদুর্শীতা দেখে ভালো লাগলো। অনেকেই শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যকে Justify করার চেষ্টা করছে। কিন্তু তাদের Hypocrisy আজ শিক্ষামন্ত্রীর দ্বারাই প্রকাশ পেলো যখন তিনি বেশ অযৌক্তিকভাবে তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন https://goo.gl/RKzjv7

    1. 1.1
      আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

      ধন্যবাদ, আপনার মন্তব্যে স্বস্তি পেলাম। আপনার দেওয়া লিংকটা কাজ করছে না। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.