«

»

Jan ২৮

বিএনপির রাজনীতি নিয়ে আবারো কিছু কথা…

১/১১ এর পর রাজনীতি নিয়ে নিয়মিত লিখতাম – কারন বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে কয়টা টার্নিং পয়েন্ট ছিলো তার মধ্যে ১/১১ অন্যতম। সেই কঠিন সময়ে রাজনীতিকদের পরীক্ষা দিতে হয়েছে নৈতিকতা আর কৌশলের – অনেকে সঠিক ভাবে অবস্থান নিতে পেরেছে – অনেকে ভুল করেছে এবং ভুলের মাসুল দিয়েছে। আমাদের মনে আছে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়াকে প্রায় একই সময় জেলে নেওয়া হয়েছিলো। তৃতীয় শক্তির উত্থানের রাস্তা পরিষ্কার করার জন্যে কোন ওয়ারেন্ট ছাড়াই শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো – যদিও খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা নিয়ম অনুসরন করা হয়েছিলো – কার্যত তাদের দুইজনকে রাজনীতি থেকে বিতারনের জন্যেই সামরিক বাহিনীর সহায়তায় সুশীল শ্রেনী রাজনীতিকে একটা নতুন ধারা তৈরী করতে চেষ্টা করেছে। বলাই বাহুল্য – তাদের মুল শক্তি ছিলো দূর্নীতিবিরোধী শ্লোগান। যেহেতু বিএনপি মাত্র ক্ষমতা ভোগ করেছে – তাদের দূর্নীতির বিষয়গুলো ছিলো প্রকট – অন্যদিকে আওয়ামীলীগের নেতাদের দূর্নীতির বিষয়গুলো টেনে আনতে হয়েছিলো নানান কৌশল করে। মুলত ১/১১ সরকারের কৌশলগত ভুল ছিলো দুইদলকে সমানভাবে মূল্যায়ন করা। একদিকে জিল্লুর রহমানের মতো বর্ষীয়ন নেতা – সৈয়দ আশরাফুল হকের মতো ক্লীন ইমেজের নেতাদের শেখ হাসিনা পক্ষে কঠিন অবস্থান – অন্যদিকে খন্দকার দেলোয়ার হোসেনে মতো একনিষ্ট রাজনীতিবিদের খালেদা জিয়ার পক্ষে অবস্থানের বিএনপির সয়ফুর রহমান – মান্নান ভুইয়ার বিপরীত মুখী অবস্থানের কারনে বিএনপি কঠিন অবস্থায় পড়ে গিয়েছিলো। অবশেষে সরকারকে সুশীল এজেন্ডা থেকে বের হতে হয়েছিলো – যদিও আওয়ামীলীগ সেই এজেন্ডা বাস্তবায়নের পক্ষেই অবস্থান গ্রহন করেছিলো বলেই ড. ইউনুসের আর প্রয়োজ হয়নি। শেখ হাসিনা বাহ্যিকভাবে একটা দৃঢ় অবস্থান দেখালেও কার্যত ১/১১ এর এজেন্ডা বাস্তবায়নের পক্ষেই কাজ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

এখানে লক্ষ্য করা যাবে – বিএনপি শুরু থেকেই সিদ্ধান্তহীনতায় ভূগেছে – তাদের রাজনীতি কার্যত প্রতিক্রিয়ার মাঝেই সীমাবন্ধ থেকেছে। বলা দরকার – রাজনীতিতে মিত্র বলতে কেউই নেই। আজ যারা মিত্র – কাল তারা শত্রু। আর রাজনীতিতে ভুল করার সুযোগ খুবই কম – কারন প্রতিপক্ষ সব সময় ভুলের সুযোগ নিতে বসে আছে।

বিএনপির আরেকটা সংকট কাল শুরু হতে যাচ্ছে – তাদের রাজনীতির মুল শক্তি জিয়াউর রহমানের সততার ইমেজের বিপরীতি খালেদা জিয়ার এতিমখানার মামলা একটা বড় কালিমা লেপনের জন্যে যথেষ্ট – বিশেষ করে আওয়ামীলীগ বাই ডিফল্ড বাম-অধিষ্ঠিত মিডিয়ার কারনে এই বিষয়ে যথেষ্ট প্রচারনার সুযোগ পাবে। খালেদা জিয়াকে দূর্নীতিবাজ আর ইতোমধ্যে তারেকের দূর্নীতির কাহিনীগুলো রূপকথার মতো হয়ে উঠার কারনে বিএনপিকে একট আবড় সংকটে পড়তে হবে। ফলে বিএনপি যাদের মিত্র হিসাবে পেয়েছিলো – তাদের হারাতে হবে। আমরা দেখেছি বিএনপির পরম মিত্র কওমী ভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো বিএনপি জোট ছেড়ে দিয়েছে। এরা ধারনা করছে বিএনপির বিপরীতি তারাই দ্বিতীয় বা তৃতীয় শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হবে – যার আভাস পেয়েছি তাদের ৩০০ আসনে প্রার্থীতার ঘোষনায়। ফলে ২০১৩ সালের একপক্ষীয় নির্বাচনের চেয়ে আরো বেশী দলে অংশ গ্রহনের বিষয়টা দেখা যেতে পারে। অন্যদিকে বিএনপির আরেক মিত্র জামায়াত তাদের কার্যক্রম বন্ধ করেছে বলে ভুল ধারনা করার সুযোগ নেই – বরঞ্চ তারাও রাজনীতিতে একটা বড় রোল-প্লে করবে বলে আমার বিশ্বাস। যার নমুনা হলো আওয়ামীলীগ সকল দাবী উপেক্ষা করে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা থেকে বিরত রয়েছে – প্রয়োজনে বিএনপির বিরুদ্ধে জোট তৈরীতে জামায়াতের সাথে সমঝোতা করতে পারে। বলার অপেক্ষা রাখে না – রাজনীতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে সকল নীতিই এক নীতিতে পরিনত হয় – বড় শত্রুকে ঘায়েল করতে ছোট শত্রুগুলোকে এক করো এবং তাদের মিত্র বানাও। যার কারনে জাসদ-ওয়ার্কাস পার্টির মতো চরম আওয়ামী বিরোধীরা এখন ক্ষমতার ভাগ পাচ্ছে – তেমনি আগামীতে জামায়াতকে সেই ভুমিকায় দেখলে বেশী অবাক হবো না – আর জামায়াতের মুক্তিযুদ্ধে বিষয়ে একটা বিবৃতিই আওয়ামীরীগের মিত্রতার জন্যে যথেষ্ট হয়ে যাবে বলেই আমার ধারনা।

অন্যদিকে বিএনপির দ্বৈত নেতৃত্ব কার্যত খালেদা জিয়াকে অক্ষম করে রেখেছে। তারেক রহমানের প্রভাবে শীর্ষ নেতারা মুলত স্থবির হয়ে গেছে। তাদের ডাকা হলে মিটিং এ গিয়ে শুনে আসে কি করতে হবে। আর অত্যুসাহী গয়েশ্বর রায় কিংবা রিজভীর বৈপ্লবিক বক্তব্যগুলোর সাথে পরষ্পর বিরোধীতার কারনে মহাসচিব মির্যা ফকরুল ইসলামের বক্তব্য ম্লান হয়ে যায়। ফলে কর্মীরা তাদের কর্মকান্ড নিয়ে বিভ্রান্তিকে ভুগে। বিপরীতে সরকার প্রবল দমন নীতির কারনে তারা স্বদৌগে কোন কর্মসুচী দেওয়ার চেয়ে ফেইসবুকে ছবি আপলোড করে শীর্ষনেতাদের দৃষ্ট আকর্সের মাধ্যমে তাদের অস্বিত্ব জানান দেওয়ার মধ্যমে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ করে রাখতে বাধ্য।

এই অবস্থায় দল হিসাবে বিএনপির অবস্থা মুসলিম লীগের ভাগ্য বরনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে বলে ধারনা করতে পারি। যদিও অনেক দেরী হয়ে গেছে – তারপরও বিএনপি কিছু পদক্ষেপ নিলে তাদের অস্বিত্ব রক্ষা হবে বলে মনে করছি – শুধু অস্তিত্বই নয় – কার্যত ক্ষমতায় যাওয়ার পক্ষে একটা শক্তি অর্জন করবে। তাদের অতিদ্রুত নিজরে দলকে গুছানো দরকার।

১) জামায়াতের সংগ ত্যাগের ঘোষনা দেওয়া – কারন আজ হোক কাল হোক জামায়াতই সেই ঘোষনা দেবে – তা হবে বিএনপির জন্যে মৃত্যু পরোয়ানা।
২) তারেক রহমানের ভুমিকাকে আড়াল করা – কারন তারেক খালেদা জিয়ার সমান্তরালে একটা বিএনপি তৈরী করেছে – কার্যত যা সিনিয়র নেতাদের অবজ্ঞা করার একটা বাহানা মাত্র। কেন্দ্র থেকে তৃনমূল পর্যণ্ত এই ধারায় বিএনপি বিভক্ত।
৩) সব বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে দৃশ্যমান উন্নয়নকে অস্বীকার করার ধারা বন্ধ করা। কারন অনেক উন্নয়ন দৃশ্যমান – বিশেষ করে বিদ্যুৎ এবং অবকাঠামোগুলোর সুবিধা মানুষ ভোগ করছে – তা অস্বীকার করে নিজেদের বাস্তবতা বিবর্জিত হিসাবে প্রমান করা হয়।
৪) সুশীল সমাজের – বিশেষ করে সুবিধাভোগী টকশোজীবি আর ফেইসবুক নির্ভর আলোচনাগুলো এড়িয়ে যাওয়া – কারন এর পিছনে সত্যে থেকে মিথ্যই বেশী কাজ করে – একটা দায়িত্বশীল রাজনীতিক দলের জন্যে অনুমান নির্ভর মিথ্যার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার ফলাফল তাদের বিশ্বাস যোগ্যতা হারানোর জন্যে যথেষ্ট। যেমন পদ্ম সেতুর বিষয়ে বিএনপি আর বাস্তবসন্মত অবস্থান নিতে পারতো – বিশেষ করে তাদের অনেক নেতা বিশ্বব্যাংকের অবস্থান সম্পর্কে জানে – একটা দেশের সরকারকে দূর্বল করে কিভাবে বিশ্বব্যাংক তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। এই বিষয়ে বিএনপি বিশ্বব্যাংকের দালাল সুশীলদের ফাঁদে পা দিয়ে বিরাট ভুল করেছিলো – বিপরীতে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়নের মধ্যে শেখ হাসিনা নিজেকে একটা উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছে। আরেকটা বিষয় বলা যায় – রাজনীতির বিষয়ে অরাজনৈতিক সুশীল-টকশো জীবিদের উপর অতিরির্ভরতা বিএনপির জন্যে অনেক ক্ষতির কারন হয়েছে – যার উদাহরন ফরহাদ মজহারের গুমের নাটক। বিএনপির সরকার বিরোধীতার জন্যে খড়কূটো খুঁজার দরকার ছিলো না – ক্ষমতাশীনদের দূর্নীতি এবং ছাত্রলীগের বাড়াবাড়িই তাদের জন্যে যথেষ্ট ছিলো। কিন্তু তাদের পেট্রোল বোমার বিষয়গুলো থেকে যে ছবি সংগ্রহ করেছে সরকার এবং আওয়ামীলীগ – তা বহুদিন ব্যবহার করতে পারবে।
৫) সকল সন্ত্রাসকে নিন্দা জানানো জরুরী – বিএনপি একদিকে বিশ্বজিতের ঘটনায় হৈ চৈ করেছে – কিন্তু গাজীপুরের মনিররে পোড়ানোর ঘটনায় নীরব থেকেছে। কার্যত জামায়াত শিবিরের সীমাহীন সন্ত্রাস – বিশেষ করে আইনশৃংখলা রক্ষা বাহিনীর উপর আক্রমনের বিষয়ে বিএনপির নীরব ভূমিকা তাদের জন্যে বিরাট ক্ষতির কারন হয়েছে। একটা জাতীয় রাজনৈতিক দল হিসাবে শিবিরে রাষ্ট্রদ্রোহী কাজগুলোর দায় থেকে নিজেদের মুক্ত রাখলে ভাল করতো। আমরা দেখবো – জামায়াত হয়তো আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহনের জন্যে বিএনপি ত্যাগ করবে – তাদের বিরুদ্ধে প্রচারগুলো বন্ধ হয়ে যাবে – আর সকল দায় বিএনপিকে নিতে হবে – যদিনা তারা এখনও সেই পেট্রল বোমা আর সন্ত্রাসী কাজগুলো নিন্দা না করে।

মুলত ৮ ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশের রাজনীতিক নতুন একটা টার্নিং পয়েন্ট হবে – বিএনপির শেষ সুযোগ হিসাবে দেখা যাবে সেই দিনটাকে – তারা সুচিন্তিত কোন কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে তাদের বিপর্যয় কাঁটাতে কতটা স্বক্ষম হবে – অথবা তারা একটা হরতাল দিয়ে দায় সেরে বাড়ি গিয়ে তাদের বিলুপ্তির জন্যে অপেক্ষা করবে। আর সেই সুযোগ হয়তো ইসলামের নামে রাজনীতি করা দলগুলো অথবা বামরা (যাদের সম্ভাবনা সবচেয়ে কম) অথবা জামায়াত তাদের জায়গা দখল করবে। বিচারের বিষয়ে সবচেয়ে কম উৎসাহী এবং বিচারকে এড়িয়ে যাওয়ার যে ট্রেডিশন বিএনপি এতোদিন অনুসর করেছে – একটা দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়াই আজ তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারন করছে – এইটা হলো সবচেয়ে বড় আইরনী – দল বড় বড় আইনজীবি না নিয়ে প্রাজ্ঞ রাজনীতিকদের উপর নির্ভর করলে হয়তো আজ এই বিপর্যয় হতো না – ভবিষ্যত দেখার আশায় এখানেই শেষ করছি।

৩ comments

  1. 2
    সত্য সন্ধানী

    সালাম জিয়া ভাই, লেখাটা ভাল লেগেছে, কিন্তু একটা হিসাবই মেলে নাই আর সেটা হল কিভাবে আওয়ামী লীগ জামাত জোট হতে পারে বি এন পির বিরুদ্ধে?

    হলে জামায়াত নেতাদের ফাঁসীর ব্যাপার টার ব্যাখা কিভাবে দেবে আওয়ামী  লীগ? 

    আর রাজনীতি  তে ৩য় শক্তির উত্থান সম্পর্কে কি ধারনা করেনন আপনি?

     

    1. 2.1
      আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

      ফমূলাটা হলো -- রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নাই। ১৯৮২ সাল থেকে ৯০ পর্যন্ত তিন জোটের আন্দোলন হয়েছে -- জামায়াত আর আওয়ামীলীগ সমান্তরাল পথ হেঁটেছে। আমরা বিচারে কথা বলেছি -- তখন আওয়ামীলীগের সেই কথা শুনার সময় ছিলো না। পরে ১৯৯২ থেকে ৯৬ বিএনপি বিরোধী আন্দোলন করেছে আওয়ামীলীগ -- জামায়াত সহযোগীতা করেছে। আবারো হয়তো আমরা সেই দৃশ্য দেখবো। 

      দেখুন জাসদের অবস্থা -- জন্ম হয়েছিলো আওয়ামীলীগের বিরোধীতা করে -- এখন আওয়ামীলীগের মিত্র। 

      সুতরাং সম্ভাবনাটা বাতিল করা সঠিক হবে না। 

  2. 1
    Munir

    আপনি দেখি হাসিনার চাইতেও বেশি আওয়ামিলিগার! আপনি যা বিশ্বাস করেন- হাসিনা তা বিশ্বাস করলে-বিশেষ করে বিএনপির অবস্থা মুসলিম লীগের মত হতে চলেছে- হাসিনা অনেক আগেই একটা নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতেন। আজীবন ক্ষমতার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করতেন না। করতে হত না হাসিনাকে এত ছলচাতুরী। আর কত বিএনপি জামাত নিয়ে লিখবেন? এবার একটু আওয়ামিলিগ নিয়ে লিখুন। বর্তমানে দেশে আওয়ামী সন্ত্রাসীতে ছেয়ে গেছে। আমার কাছে আপানকেও আওয়ামী সন্ত্রাসী মনে হয়। আওয়ামী কলম সন্ত্রাসী। আপনি বিতর্কিত তো বটেই। আপনার লিখার পাঠক মন্তব্যগুলো দেখলেই বুঝা যাই আপনি কতটা বিতর্কিত। আপনি জেনেশুনে বিতর্ক তৈরি করেন- সবার মনোযোগ কাড়ার জন্য! এটা একটা রোগ। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.